• ই-পেপার

আধুনিক প্রযুক্তির প্রিপেইড মিটারে ভোগান্তির সুরাহা কি হবে না?

সংবিধানের আলোকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও পাহাড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা

এ এইচ এম ফারুক
সংবিধানের আলোকে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও পাহাড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা
সংগৃহীত ছবি

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একাংশের সশস্ত্র নেতা সন্তু লারমার সঙ্গে চরম গোপনীয়তায় সই হয়েছিল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’। দীর্ঘ ২৮ বছর পেরিয়ে ২৯ বছরে পদার্পণ করা এই চুক্তিটি আজকের দিনে পাহাড়ের আপামর জনগণের জন্য টেকসই কোনো শান্তির বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। বরং আইনি ও সামাজিক বাস্তবতায় এটি একটি ‘বৈষম্য দলিল’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। যে লক্ষ্য নিয়ে এই চুক্তি করা হয়েছিল, তা আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ। কারণ, এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাংশের সঙ্গে রাষ্ট্রের একপেশে ও চরম একচেটিয়া বোঝাপড়া। 

পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য ডজনখানেক অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মতামত ও অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই অসম চুক্তি প্রণীত হয়েছিল। একটি সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভিত্তি না থাকার ফলেই আজ পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে। দেশের অখণ্ডতা রক্ষা, সংবিধানের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠত্ব সমুন্নত রাখা এবং পাহাড়ে বসবাসকারী সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে এই পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা আজ কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়, বরং একটি অনিবার্য রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক কর্তব্য।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ১ম অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে—‘বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র।’ এই এক এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মূল নির্যাস হলো, দেশে কোনো পৃথক আইনগত স্বায়ত্তশাসন, আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক দ্বৈত শাসনের সুযোগ থাকবে না। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে গঠিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ’ এবং এর অধীনস্থ ৩টি জেলা পরিষদের আইনি কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, এটি দেশের মূল প্রশাসনিক ধারার বাইরে গিয়ে একটি সমান্তরাল উপ-রাষ্ট্রীয় বা সমান্তরাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত তাত্ত্বিক ও আইনি বিশ্লেষণে এই সংকটকে ‘একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো’ হিসেবে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দ্বৈত কাঠামোর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ‘জাতীয় সংসদ’-এর সার্বভৌমত্ব ও একছত্র ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ যদি সমগ্র দেশের জন্য বা পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করতে চায়, তবে আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পূর্বাহ্নে পরামর্শ ও অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি কোনো আইন পাস হওয়ার পর জেলা পরিষদ যদি সেটিকে ‘আপত্তিকর’ বা ‘কষ্টকর’ মনে করে আপত্তি তোলে, তবে কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করতে বাধ্য থাকবে। জাতীয় সংসদের সম্মিলিত মেধার ওপর একটি আঞ্চলিক পরিষদের এই ভেটো প্রদানের আইনি ক্ষমতা কোনো স্বাধীন ও একক রাষ্ট্রে চলতে পারে না। এটি জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নিদারুণ অবমাননা।

পাশাপাশি, এই দ্বৈত কাঠামো মাঠ পর্যায়ের সাধারণ প্রশাসনের প্রচলিত চেইন অব কমান্ডকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলেছে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে জেলা প্রশাসক (ডিসি) কিংবা বিভাগীয় কমিশনার সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন এবং রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখেন। কিন্তু চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনের মাধ্যমে সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এক দেশে দুটি ভিন্ন প্রশাসনিক মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, যা মাঠ প্রশাসনকে স্থবির এবং দেশের অখণ্ড শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে মারাত্মক দুর্বল করে তুলছে।

পার্বত্য চুক্তির কারণে সবচেয়ে বড় মানবিক ও আইনি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে পাহাড়ের বিশাল বাংলাভাষী (বাঙালি) জনগোষ্ঠী। সংবিধানে দেশের সব নাগরিকের জন্য সমান নাগরিক অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তি ও আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বাঙালিরা আজ নিজ দেশেই এক অদৃশ্য বর্ণবাদের শিকার হয়ে ‘দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে’ পরিণত হয়েছেন। পার্বত্য নিউজে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈষম্যের স্বরূপ ও উত্তরণ’ নিবন্ধে এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের চোখে সমতা), অনুচ্ছেদ ২৮ (ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্যহীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ২৯ (প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে সুযোগের সমতা)—এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে পুরোপুরি পদদলিত করা হয়েছে।

ভোটাধিকার ও স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত : সংবিধানে বাংলাদেশের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটার হওয়ার স্পষ্ট অধিকার থাকলেও, পাহাড়ে ভোটার হতে হলে ‘পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা’ হওয়ার অতিরিক্ত শর্ত চাপানো হয়েছে। আর একজন বাঙালির ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার অন্যতম শর্ত হলো—তাকে ওই অঞ্চলে জমির মালিক হতে হবে।

জমির মালিকানা ও স্বাধীন চলাচলের অধিকার হরণ : সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সর্বত্র অবাধ চলাচল, বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং ৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের যেকোনো জেলার উপজাতীয় নাগরিক ঢাকা, চট্টগ্রাম বা দেশের যেকোনো প্রান্তে জমি কিনে স্বাধীনভাবে বসবাস ও ব্যবসা করতে পারলেও, দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের সাধারণ বাঙালি নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামে জমি কিনতে বা স্বাধীনভাবে বসতি স্থাপন করতে পারেন না।

চাকরিতে চরম বৈষম্য : আইন করে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্থানীয় চাকরিতে উপজাতীয়রা একচেটিয়া অগ্রাধিকার পাবে। এর ফলে যুগ যুগ ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি পরিবারের শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।

পার্বত্য অঞ্চলের তিনটি জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের শীর্ষতম পদ বা ‘চেয়ারম্যান’ পদগুলোসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ আইন করে শুধুমাত্র উপজাতীয়দের জন্য চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত করা হয়েছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর পদটিও উপজাতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আইনি বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির একছত্র সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপের শামিল। যা সংবিধান লঙ্ঘনই।

বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলায় বাংলাভাষী বাঙালিরা এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি। অথচ এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলো তাদের নিজস্ব অঞ্চলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, আইনের এমন নির্লজ্জ ও জঘন্য বর্ণবৈষম্যমূলক ধারা রয়েছে যে, কোনো পরিষদের সভায় উপজাতীয় চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকলে, উপস্থিত সব বাঙালি সদস্য একমত হলেও কোনো বাঙালি সদস্য ওই সভায় সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। এই ধরনের শাসনতান্ত্রিক বৈষম্য অতীতে দক্ষিণ আফ্রিকার অধুনালুপ্ত শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবৈষম্য কিংবা প্রাচীন রোমের দাস প্রথার নিষ্ঠুর সামাজিক বিভাজনের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বর্তমান সময়ের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। দৈনিক রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চুক্তি সংস্কার করা প্রয়োজন’ প্রবন্ধে এই নিরাপত্তা ও কৌশলগত ঝুঁকির বিষয়টি সুতীক্ষ্ণভাবে উঠে এসেছে। ভারত এবং মায়ানমারের সংলগ্ন তিন দেশীয় সীমান্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এই এলাকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত।

চুক্তির ১৭(ক) ধারা অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো (প্রায় আড়াইশ) পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের নির্দিষ্ট ৬টি স্থায়ী ব্যারাকে সীমাবদ্ধ রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড যেখানে প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর (যেমন- জেএসএস, ইউপিডিএফ, কেএনএফ, মগ লিবারেশন পার্টি) অবৈধ অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, গহিন অরণ্যে মাদকের আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক এবং ভূ-কৌশলগত ষড়যন্ত্রের শিকার, সেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম সুরক্ষাকারী সেনাবাহিনীর হাত-পা এভাবে বেঁধে দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক আত্মঘাতী নীতি। এই প্রত্যাহার নীতির কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতায় পাহাড়ে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও সমান্তরাল কর ব্যবস্থা চালু করার সুযোগ পেয়েছে। দেশের অখণ্ডতা এবং সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই আত্মঘাতী ক্যাম্প প্রত্যাহার নীতির আমূল সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনর্প্রতিষ্ঠা করা আজ সময়ের দাবি।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক শক্তি—বর্তমান দেশের সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলই দেশের সার্বভৌমত্ব এবং পাহাড়ের সুশাসন বজায় রাখতে পার্বত্য চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল।

বিএনপি তাদের অফিশিয়াল নির্বাচনী ইশতেহারের ২০২৬-এর পাহাড় ও সমতলের নৃগোষ্ঠী উপশিরোনামের অধীনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জাতির সামনে ঘোষণা করেছিল। জানিয়েছিল- সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

একই সঙ্গে তারা পাহাড়ে সক্রিয় সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর অবৈধ অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থান এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ‘সোশ্যাল রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম’ বা সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। 

জামায়াতে ইসলামীও তাদের নির্বাচনী বক্তব্যে পাহাড়ের সব নাগরিকের বৈষম্যহীন সাংবিধানিক অধিকার এবং ভূমি অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে এই চুক্তির একপেশে ধারাগুলোর সংশোধনের পক্ষে জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেছিল। 

দেশের দুই বৃহৎ দলই নির্বাচনের আগে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কারণ তারা বোঝে—পাহাড়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে এবং সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কখনো টেকসই ও প্রকৃত শান্তি আসতে পারে না। আজ তারা যথাক্রমে সরকারে এবং প্রধান বিরোধী দলে অধিষ্ঠিত। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে দেওয়া এই অঙ্গীকার পূরণ করার উপযুক্ত সময় এখনই।

আজকের সরকারি দল বিএনপি যখন ১৯৯৭ সালে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল ছিল, তখন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি এই কালো চুক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে এবং সংসদে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ১৯৯৮ সালের ১২ মে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে যে ঐতিহাসিক ভাষণ ও তথ্যবহুল দলিল পেশ করেছিলেন, তা আজ পার্বত্য চুক্তির সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও আইনি দলিল।

তৎকালীন সময়ে এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি সুনির্দিষ্ট ১৮টি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, যা আজও সমভাবে সত্য এবং প্রাসঙ্গিক। সেই ১৮ দফার মূল নির্যাসসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
সার্বভৌমত্ব বিসর্জন : এই চুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল হতে স্বাধীন সার্বভৌম এককেন্দ্রিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে এবং স্বাধীনতার সংকট সৃষ্টি করেছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবৃক্ষ : চুক্তির মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘বিষবৃক্ষ’ রোপিত হয়েছে, যা দেশের অখণ্ডতা খণ্ডবিখণ্ড করার দ্বার উন্মুক্ত করবে।

জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন : সামগ্রিক চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।
১ম ধারার পরিপন্থী : সংবিধানের ১নং ধারায় বাংলাদেশকে একটি একক রাষ্ট্র বলা হলেও চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের মাধ্যমে পৃথক আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা ১নং ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সমান্তরাল সরকার গঠন : সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রী নিয়োগ বা সমান্তরাল নির্বাহী পরিষদ গঠনের সুযোগ না থাকলেও চুক্তির মাধ্যমে একটি বিশেষ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বিপরীতে একটি ‘পাল্টা বা সমান্তরাল সরকার’ গঠন করা হয়েছে।

পাল্টা বৈষম্য সৃষ্টি : অনগ্রসর শ্রেণির উন্নয়নের নামে এই চুক্তি পাহাড়ে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর এক ধরনের ‘পাল্টা বৈষম্য’ চাপিয়ে দিয়েছে, যা সংবিধানের ২৯ নং ধারার পরিপন্থী।

সংসদের ক্ষমতা খর্ব : চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের ১৩ ধারার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ কর্তৃক আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা খর্ব করার সুস্পষ্ট চক্রান্ত করা হয়েছে।

চলাফেরার অধিকার হরণ : চুক্তির ‘গ’ অধ্যায়ের ২৬ নং পংক্তি সংবিধানে প্রদত্ত নাগরিকদের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা ও বসতি স্থাপনের মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩৬) লঙ্ঘন করেছে।

সম্পত্তির অধিকার খর্ব: সংবিধানের ৪২(১) ধারার অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন ও ধারণের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, চুক্তির ২৬ নং পঙক্তি তা খর্ব করেছে।

ভূমির ক্ষমতা সমর্পণ : ভূমি বন্দোবস্ত, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইজারা দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে আঞ্চলিক পরিষদের হাতে সমর্পণ করে সরকারের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সংকুচিত করা হয়েছে।

বাঙালিদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিককরণ : পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাভাষী নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার হরণ করে তাদের নিজ ভূখণ্ডে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে।

প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি : জেলা প্রশাসকের পদ বিলুপ্তি ও কমিশনারের ক্ষমতা সীমিত করে সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও পুলিশ বাহিনীকে সরকারের অধীনে না রেখে বস্তুত পার্বত্য পরিষদের অধীনে ন্যস্ত করায় এক দেশে দুটি ভিন্ন ও জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপর শর্ত : উপজাতীয় মন্ত্রী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ সংক্রান্ত একছত্র ক্ষমতার ওপর শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন : সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর চলাচল সীমিতকরণ এবং তাদেরকে পরোক্ষভাবে পার্বত্য পরিষদের অধীনস্থকরণের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও দায়িত্ব পালনের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
বনাঞ্চল ও সরকারি স্বার্থ ত্যাগ : এ অঞ্চলের প্রোটেকটেড বনাঞ্চলসহ বহু জমির ওপর সরকারের অধিকার প্রত্যাহার করে সমগ্র দেশের জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আয় সংকুচিতকরণ : নানা ধরনের ট্যাক্স, খাজনা, টোল আদায়ের ক্ষমতা এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনের লাভের কমিশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নিজস্ব অর্থনৈতিক অধিকার ও রাজকোষের আয় সংকুচিত করেছে।

সহিংসতাবাদীদের পুরস্কার বনাম নিরীহদের অবহেলা : সরকার শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী ও সহিংসতাবাদীদের নগদ অর্থ, জমি, ঋণ মওকুফ ও মামলা প্রত্যাহারের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছে; পক্ষান্তরে শান্তিবাহিনীর বর্বর হামলায় নিহত ২০ হাজার নিরীহ বাঙালির স্বজনদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি।

সরকারি ক্ষমতা সমর্পণ : পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার নিজস্ব ক্ষমতা একটি আঞ্চলিক পরিষদের কাছে সমর্পণ করেছে।

বেগম খালেদা জিয়া তার সেই ভাষণে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রজ্ঞার উদাহরণ টেনে বলেছিলেন, এরশাদ আমলে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে দেশের একক চরিত্র নষ্টকারী হাইকোর্ট বিভাজনের সংশোধনী (অষ্টম সংশোধনী) বাতিল করেছিল, ঠিক একই কারণে দেশের এককেন্দ্রিক চরিত্র ধ্বংসকারী এই আঞ্চলিক পরিষদ গঠনও সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক।

আজ ইতিহাসের এক মহাবর্তে দাঁড়িয়ে ১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক বিরোধী দল বিএনপি দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। দেশের তরুণ সমাজ, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান এবং জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ সমগ্র দেশবাসী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং পাহাড়ের আপামর শোষিত ও বঞ্চিত জনগণ বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জননেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী ও একপেশে চুক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর দল বিএনপি যে অটল, সাহসী এবং দেশপ্রেমিক অবস্থান নিয়েছিল—আজ ক্ষমতায় এসে বর্তমান সময়ের বিএনপি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই ঐতিহাসিক অবস্থান ধারণ করে এই কালো চুক্তির আমূল সংস্কার করবেন, নাকি পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক নীতিকেই নীরবে মেনে নেবেন?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং ফ্যাসিবাদের তৈরি করা সব প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পার্বত্য চুক্তি সংস্কারের বিষয়টিও ঠিক একইভাবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক সুগভীর পরীক্ষা। ১৯৯৮ সালের বিএনপির সেই ঐতিহাসিক ১৮ দফা অভিযোগ এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণের প্রতিটি শব্দ আজ বর্তমান সরকারের জন্য এক অবিকল্প গাইডলাইন।

তখনকার সময়ে বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছিল, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সেই অবস্থানে কেবল অটুট থাকলেই চলবে না, বরং নির্বাচনের আগে দেওয়া তাঁর দলের নিজস্ব ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে শান্তি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কার’ করার বাস্তবমুখী ও সাহসী পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

স্থায়ী শান্তি ও বৈষম্যহীন নতুন পাহাড়ের রূপরেখা :

একটি ঐতিহাসিক ভুলকে যুগ যুগ ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া কোনো দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক সরকারের কাজ হতে পারে না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিটি পাহাড়ের শান্তির নামে মূলত বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ বপন করেছিল, যা আজ প্রমাণিত। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীই বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাই সমাধান কোনো একপেশে নীতিতে নেই; সমাধান রয়েছে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের পূর্ণ প্রতিফলনে। পার্বত্য চুক্তিকে কোনো অপরিবর্তনীয় অলঙ্ঘনীয় ঐশি দলিল না ভেবে, দেশের অখণ্ডতা রক্ষার্থে অবিলম্বে এর বিতর্কিত ও অসাংবিধানিক ধারাগুলো সংস্কার করতে হবে। পাহাড়ের সব নাগরিকের জন্য সমান রাজনৈতিক অধিকার, সমান ভোটাধিকার, বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান এবং অবাধ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, জাতিগত সম্প্রীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সেই ঐতিহাসিক স্লোগানকে ধারণ করে আজ আমাদের আবারও বলতে হবে—জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ এবং পবিত্র সংবিধানের আলোকেই পাহাড়ের সুশাসন নিশ্চিত করো।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল : [email protected] 

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

জিল্লুর রহমান
শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

১. বিনিয়োগ আসে আশ্বাসে নয়, আস্থায়

বাংলাদেশ নিয়ে আজকাল একধরনের অদ্ভুত দ্বৈত ছবি দেখা যায়। একদিকে আমরা বলি- দেশে সম্ভাবনা আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে, ভৌগোলিক সুবিধা আছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন বাস্তবে আসতে চান, তখন তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে যায় অনুমোদনের জট, নীতির অনিশ্চয়তা, কর ও শুল্কের জটিলতা, ব্যাংকিং সমস্যার চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট, বন্দরের ধীরগতি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের ভরসাহীনতা।

বিনিয়োগকারীরা কবিতা শুনতে আসেন না; তাঁরা হিসাব দেখতে আসেন। তাঁরা রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান। তাঁরা সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তব সুবিধা চান। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে আর কত দিন চলবে?

আমরা অনেক সময় ভাবি, বিদেশি বিনিয়োগ মানে বিদেশিদের দয়া। আসলে তা নয়। বিনিয়োগ একটি প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন- সবাই একই বিনিয়োগকারীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যে দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, নীতি স্থির রাখতে পারে, দুর্নীতি কমাতে পারে, অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়; বাস্তবায়নের অভাব। এখানে বড় বড় ঘোষণা হয়, কিন্তু ছোট ছোট অনুমোদনে মাস কেটে যায়। এখানে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, কিন্তু বিনিয়োগকারীকে বহু দরজায় ঘুরতে হয়। এখানে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিবর্তন কম।

বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলো সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিনিয়োগকারী যখন বুঝবেন, নিয়ম হঠাৎ বদলাবে না, ফাইল অকারণে আটকে থাকবে না, ব্যাংকিং ব্যবস্থা কাজ করবে, মুনাফা পাঠানো যাবে, বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, আদালত বা সালিশে ন্যায়সংগত সমাধান মিলবে- তখন তিনি আসবেন।

দেশে এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে যদি অর্থনৈতিক সংস্কারকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যদি আমরা শুধু স্লোগান, সম্মেলন, ছবি তোলা এবং বক্তৃতার মধ্যে আটকে থাকি, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগও আমাদের মতো ধৈর্য হারাবে।

২. জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের উত্থান

বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আবার বসতে যাচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। চার দশক পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এই অর্জনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব আছে। বিশ্ব এখন এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজাসংকট, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, চীন-আমেরিকা প্রতিযোগিতা- সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা অস্থির। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মঞ্চ নয়; এটি ছোট ও মধ্যম শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য নৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির জায়গা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই সুযোগকে কীভাবে ব্যবহার করবে?

আমরা কি শুধু গর্ব করব যে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি সভাপতি হয়েছেন, নাকি এই মঞ্চকে ব্যবহার করে জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন অর্থায়ন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, ঋণসংকট এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নেতৃত্ব দেব?

বাংলাদেশের জন্য এটি সম্মানের পাশাপাশি পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে মর্যাদা পাওয়া সহজ নয়, ধরে রাখা আরও কঠিন। জাতিসংঘে সভাপতির আসন আমাদের সামনে একটি জানালা খুলে দিয়েছে। কিন্তু জানালা খোলা থাকলেই বাতাস ঢোকে না; ঘরের ভিতরও প্রস্তুতি থাকতে হয়।

বাংলাদেশকে এখন দেখাতে হবে, সে শুধু ভোট জিততে পারে না, ধারণাও দিতে পারে। শুধু কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না, বৈশ্বিক আলোচনায় অর্থবহ অবদানও রাখতে পারে।

৩. তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর : বার্তা কোথায়?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন। এটি শুধু একটি সফর নয়; এর মধ্যে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি বার্তা আছে।

অনেকে ভেবেছিলেন, প্রথম সফর হয়তো ভারত, চীন বা সৌদি আরবে হতে পারে। কিন্তু মালয়েশিয়া বেছে নেওয়া একটি কৌশলগত ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশ যেন সরাসরি কোনো শিবিরে দাঁড়ানোর বার্তা না দেয়, এই হিসাবও এখানে থাকতে পারে।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি। দ্বিতীয়ত মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রাষ্ট্র। তৃতীয়ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।

কিন্তু সফর সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে ছবি ও প্রটোকলের ওপর নয়; ফলাফলের ওপর।

প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি শ্রমবাজারের নিরাপত্তা, অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা, বিনিয়োগ সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়, হালাল শিল্প, পর্যটন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে এই সফর অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় হতে পারে না। এখন প্রতিটি সফরের অর্থনৈতিক হিসাব থাকতে হবে। কোন দেশে গেলাম, কাকে দেখলাম, কী ছবি তুললাম- এসবের বাইরে প্রশ্ন হবে : কী পেলাম? কত বিনিয়োগ এলো? কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো? কত দরজা খুলল?

৪. প্রতিক্রিয়া নয়, পুনর্গঠন

রাষ্ট্রেরও মানুষের মতো আবেগ থাকে। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্র সেই আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। প্রতিটি কথার জবাব দিতে হয় না, প্রতিটি সমালোচনার পাল্টা বিবৃতি দিতে হয় না, প্রতিটি বিরোধকে যুদ্ধ বানাতে হয় না।

পুনর্গঠন শুরু হয় তখনই, যখন প্রতিক্রিয়া শেষ হয়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে অভ্যস্ত। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা কথা। কেউ প্রশ্ন তুললে সন্দেহ। কেউ ভিন্নমত দিলে শত্রুতা। ফলে আমরা নীতি নিয়ে যতটা ভাবি, শব্দ নিয়ে তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করি।

কিন্তু আসল শক্তি কখনো খুব শব্দ করে না। আসল শক্তি গড়ে ওঠে সংযমে, শৃঙ্খলায়, প্রস্তুতিতে। ইটের পর ইট বসিয়ে যেমন ভবন তৈরি হয়, তেমনি সংস্কারও তৈরি হয় ধৈর্য, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতায়।

আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন হলো নিজের শক্তিকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা। সব বিতর্কে শক্তি খরচ করলে বিনিয়োগ সংস্কার হবে না। সব রাজনৈতিক শব্দে ডুবে গেলে জাতিসংঘের সুযোগ কাজে লাগবে না। সব প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতা বানালে পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্য হারাবে।

দূরত্ব সব সময় শীতলতা নয়; কখনো কখনো তা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। অপ্রয়োজনীয় শব্দ, বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও আত্মপ্রদর্শন থেকে দূরে সরে এসে যদি বাংলাদেশ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিণতি।

শেষ কথা

এই সপ্তাহের চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই সুতোয় বাঁধা। বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের বলে- আস্থা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। জাতিসংঘের মঞ্চ আমাদের বলে- মর্যাদা পেলে দায়িত্বও নিতে হয়। মালয়েশিয়া সফর আমাদের বলে- পররাষ্ট্রনীতি এখন অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। আর পুনর্গঠনের দর্শন আমাদের বলে- শব্দ কমিয়ে কাজ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার প্রতিক্রিয়ার পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি শৃঙ্খলিত পুনর্গঠনের পথে হাঁটব?

বিনিয়োগকারীকে আনতে হলে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেতৃত্ব দিতে হলে কথার সঙ্গে কাজ মিলতে হবে। বিদেশ সফরকে অর্থবহ করতে হলে ফলাফল আনতে হবে। আর রাজনৈতিক স্থিতি আনতে হলে আমাদের প্রতিক্রিয়া নয়, সংযম শিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত মর্যাদা আসে না উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা থেকে। মর্যাদা আসে ধারাবাহিকতা থেকে।  আস্থা আসে না প্রচারণা থেকে। আস্থা আসে অভিজ্ঞতা থেকে। আর শক্তি আসে না শব্দ থেকে। শক্তি আসে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থেকে।

বাংলাদেশ যদি এই মুহূর্তে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে পারে, তাহলে পতনও হতে পারে পুনরারম্ভের ভাষা, সংকটও হতে পারে সংস্কারের সুযোগ।

কারণ রাষ্ট্রেরও একদিন নিজের ভিতরে শান্তির প্রজাতন্ত্র গড়তে হয়। আর সেই প্রজাতন্ত্রের প্রথম আইন খুব সহজ : কম বলো, বেশি করো।

লেখক :  প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

সরকারের ১০০ দিন : প্রধানমন্ত্রীর অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা

ড. মো. মিজানুর রহমান
সরকারের ১০০ দিন : প্রধানমন্ত্রীর অর্জন ও জনগণের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : পিএমও

যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে কেবল একটি প্রশাসনিক সময়কাল হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের ধরন, রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার একটি প্রাথমিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে জনগণ সাধারণত নতুন নেতৃত্বের মধ্যে তাদের প্রত্যাশার প্রতিফলন খুঁজে পায় এবং মূল্যায়ন করে যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা চলে আসছে, সেখানে প্রথম ১০০ দিন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই সময়ের কর্মকাণ্ডে অনেকের কাছে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক বার্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদের ভিত্তি তৈরি করেছে।

এই ১০০ দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ব্যক্তিগত আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তুলনামূলক সংযম ও সরলতার প্রবণতা অনেকের নজর কেড়েছে। অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা প্রায়ই ব্যক্তিপূজা, অতিরিক্ত প্রচার, নিরাপত্তা প্রদর্শন এবং প্রটোকলনির্ভর শাসনের সঙ্গে জড়িত ছিল। সেই তুলনায় নতুন নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণার পরিবর্তে প্রশাসনিক কাজ, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও জনসম্পৃক্ততাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র যে জনগণের, সেই বার্তাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমানোর লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ জনগণের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, বিলাসবহুল সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ব্যয়সংকোচন, জবাবদিহিতা ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে অনেকেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই মানসিকতার পেছনে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তিনি এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যার ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ক্ষমতার পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাসন, মামলা-মোকদ্দমা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ফলে শৈশব থেকেই তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার উত্থান-পতন, রাজনৈতিক সংকট, জনআকাঙ্ক্ষা এবং নেতৃত্বের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

অনেকের মতে, পারিবারিক ট্র্যাজেডি, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, প্রবাসজীবন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নানা প্রতিকূল অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থান করে দীর্ঘ সময় দেশ ও রাজনীতিকে পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা সম্পর্কে আরও বাস্তববাদী ও সচেতন করে তুলেছে। সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্ষমতার বাহ্যিক চাকচিক্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারণা বা আনুষ্ঠানিক জাঁকজমকের চেয়ে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, জনকল্যাণ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে বেশি মনোযোগী করেছে। প্রথম ১০০ দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সেই অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রতিফলন দেখা গেছে বলেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও কর্মচাঞ্চল্য ও জবাবদিহি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা লক্ষ করা গেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদই জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহির প্রধান মঞ্চ। সেই বিবেচনায় সংসদীয় কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ, কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক কাজের সরাসরি তদারকি ইতিবাচকভাবে আলোচিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ধীরগতি, ফাইলজট, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনার মুখে ছিল। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রশাসনকে আরো কার্যকর ও কর্মমুখী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়ার ফলে প্রশাসনকে জনসেবামুখী করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে এগুলো কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তার ওপর, কারণ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের অগ্রগতি ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

মানবিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও কিছু উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দুর্ঘটনা, অপরাধ এবং সামাজিক ট্র্যাজেডির শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, তাদের কথা শোনা এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দেওয়ার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের মানবিক চেহারাকে সামনে এনেছে। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্র তাদের কষ্টকে স্বীকার করছে—এই অনুভূতি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সমবেদনা জানানো এবং বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও মামলার দীর্ঘসূত্রতার বাস্তবতায় এই প্রতিশ্রুতি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো রাষ্ট্র এককভাবে চলতে পারে না; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সহযোগিতাও জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগকে অনেকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তুরস্ক, পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক পরিবর্তনশীল বাস্তবতা বিবেচনায় আধুনিক ও সক্ষম সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা সময়ের দাবি। আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ভূমিকা শুধু প্রতিরক্ষায় নয়; দুর্যোগ মোকাবিলা, শান্তিরক্ষা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা ও উদ্যোগ জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা কেবল সূচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সাময়িক জনপ্রিয়তা নয়; বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জবাবদিহিতা, মানবিকতা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক নীতিই একটি দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাই এই ইতিবাচক বার্তাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তিতে রূপান্তরিত করতে পারলেই এই সময়কাল ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জনগণের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করে আসছে। প্রতিটি নতুন সরকারকে ঘিরে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকে যে দেশ আরও উন্নত, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। আগামী দিনের সরকারের প্রতিও জনগণের প্রত্যাশা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থ হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

জনগণ আশা করে যে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা এবং সততাকে প্রধান বিবেচনায় এনে এমন একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা অধিক গুরুত্ব পাবে। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ মেয়াদে আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

একই সঙ্গে জনগণ একটি কার্যকর ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, শক্তিশালী আইনের শাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রত্যাশা করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি পাবে। জনগণের প্রত্যাশা, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করবে না।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আগামী দিনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। জনগণ বিশ্বাস করে, একটি শক্তিশালী অর্থনীতিই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি রচনা করে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতিও জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আশা করে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হবে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বলতা কাটিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। এর ফলে বিনিয়োগ, সঞ্চয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট। তারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে নাগরিকরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবে, ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্নে পরিচালিত হবে এবং অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আরও আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে কৃত্রিম সংকট, অসাধু সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এমন প্রত্যাশাও জনগণের রয়েছে।

সংস্কারের প্রশ্নে জনগণ একটি সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী রোডম্যাপ দেখতে চায়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে যে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও কার্যকর, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা। জনগণ চায় সংস্কার যেন শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আসে।
জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নেও মানুষের প্রত্যাশা অত্যন্ত গভীর। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের বিতর্ককে কেন্দ্র করে জাতিকে বিভক্ত রাখার পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আজ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। একই সময়ে স্বাধীন হওয়া দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের জনগণও আশা করে যে অতীতের বিভেদ, বিরোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতি অতিক্রম করে জাতীয় ঐক্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে।

একই সঙ্গে জনগণ বিশ্বাস করে যে একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। বিরোধী দলকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলে গণতন্ত্র আরও পরিণত হবে। মতপার্থক্যকে সংঘাত হিসেবে না দেখে উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে বহুমাত্রিক চিন্তার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা গেলে রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে।

এককথায়, জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানই একটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে। তাই আগামী দিনের সরকারের প্রতি জনগণের আহ্বান—জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ঐক্য, গণতন্ত্র, সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, জনগণ আগামী দিনের সরকারের কাছে শুধু শাসন নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রত্যাশা করে। প্রথম দিকের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও সেই আশাকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে সংস্কার, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জনগণ বিশ্বাস করে, যদি সরকারদলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং সব নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গঠনে কাজ করে, তবে দেশ উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সমৃদ্ধির এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। সেই প্রত্যাশাই আজ বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং আগামী দিনের পথচলার প্রধান প্রেরণা।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন

মো. নুরে আলম
শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া জীবন
সংগৃহীত ছবি

গত ৯ মে শপথ নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। কথাগুলো খুব ছকে বাঁধা ছিল না, বরং ছিল উসকানিমূলক—‘অনুপ্রবেশকারীদের’ পুলিশ বা আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়ার বদলে সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মঞ্চের সেই হুংকারের প্রভাব পড়তে সময় লাগেনি। মে মাসের শেষ সপ্তাহ পেরোতেই আমরা দেখলাম, বিএসএফ নারী-শিশুসহ নানা বয়সের মানুষকে দল বেঁধে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘শূন্যরেখা’য় ঠেলে দিচ্ছে। রাতারাতি যেন শুরু হলো মানুষ খেদানো উৎসব।

বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, যশোর, মহেশপুর থেকে শুরু করে উত্তরের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় কিংবা লালমনিরহাটের সীমান্তগুলোতে এখন টানটান উত্তেজনা। তবে এবার একটা নতুন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিজিবি কেবল কড়া নজরদারিই করছে না, স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে অভেদ্য এক প্রতিরোধ। গত কয়েক দিনেই, বিশেষ করে জুনের প্রথম সপ্তাহে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি বড় ধরনের পুশ ইনের অপচেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি। শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে থাকা হতভাগ্য মানুষগুলোকে হয় বিএসএফ বাধ্য হয়ে ফিরিয়ে নিয়েছে, নয়তো বিজিবির ‘পুশ ব্যাক’-এর মুখে পড়েছে।

কিন্তু এই ‘পুশ ইন’ তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এ এক পুরোনো রাজনৈতিক ব্যাধির পুনরাবৃত্তি। ১৯৯৮ সালে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট যখন ক্ষমতায় এলো, তখন থেকেই এই অমানবিক খেলা শুরু। ২০০২-০৩ সালে সেটা রূপ নিয়েছিল চরম উন্মাদনায়, জন্ম হয়েছিল ‘পুশ ইন’ শব্দটির। সেবার রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শূন্যরেখায় পড়ে থাকা মানুষের ছবিগুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঝড় তুলেছিল। এরপর ২০০৪ সালে ইউপিএ জোট আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু ২০১৪ সালে এনডিএ এবং ২০১৬ সালে আসামে বিজেপি ক্ষমতায় ফেরার পর এই ছাইচাপা আগুন আবার জ্বলে ওঠে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে পুশ ইন শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন।

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে দেশের ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিলেন জন্মসূত্রে খাঁটি ভারতীয় নাগরিক!

ঘটনা শুধু সংখ্যায় আটকে নেই, মানুষের পরিচয়ের ধরনও পাল্টেছে। গত বছরের মে মাসে পুশ ইনের যে ‘নতুন মাত্রা’ দেখা গেল, তা রীতিমতো ভয়াবহ। আগে সাধারণত বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ঠেলে দেওয়া হতো। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা এবং খোদ ভারতের গুজরাট বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে আনা হতভাগ্য মানুষেরা।

এসব মানুষের পেছনের গল্পগুলো শুনলে সভ্যতার মাথা হেঁট হয়ে আসে। ওড়িশার ৭৩ বছর বয়সী হিন্দিভাষী শেখ আবদুর জব্বার। গত ২৫ ডিসেম্বর কনকনে শীতের রাতে পরিবারের ১৪ জন সদস্যসহ তাকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। একইভাবে গত বছর ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিকে স্বামী-সন্তানসহ রাতের আঁধারে পুশ ইন করা হয়। পরে খোদ ভারতীয় আদালতের নির্দেশে ৫ ডিসেম্বর তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় ভারত। আর আসামের নলবাড়ীর ৭০-ঊর্ধ্ব সাকিনা বিবির ঘটনা তো পুরো বিশ্বের সামনে ভারতের চরম অমানবিক রূপটা উন্মোচন করে দিয়েছে। থানায় ‘একটা সই’ করার কথা বলে তাকে তুলে নিয়ে গত সেপ্টেম্বরে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। এই ৪ জুন (২০২৬) ভারতের ‘স্ক্রোল’ পত্রিকাও প্রতিবেদন ছেপেছে—এক বছর পার হলেও সাকিনা বিবি এখনো ঢাকার কোনো এক বস্তিতে আটকে আছেন, নিজের ভিটামাটিতে ফিরতে পারেননি।

কী অদ্ভুত এক রাষ্ট্রযন্ত্র! নিজের দেশের নাগরিককে কেবল ধর্মীয় বা ভাষাগত পরিচয়ের কারণে রাতের অন্ধকারে অন্য দেশের ঘাড়ের ওপর ফেলে দিচ্ছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রাকৃতিকভাবে কোনো দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর দিয়ে বিভক্ত নয়। একই পরিবারের এক ভাইয়ের বাড়ি ভারতে, অন্য ভাইয়ের বাংলাদেশে—এমন জনপদ এখানে ভূরি ভূরি। সেখানে কেউ অবৈধ যাতায়াত করলে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বদলে রাষ্ট্র যখন নিজেই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে আইনি নয়, বরং ঘোরতর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।

ভারতের এই আচরণের কঠোর সমালোচনা করে খোদ তাদেরই স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘ফ্রন্টলাইন’ লিখেছে, ‘সীমান্ত নিয়ে বাগাড়ম্বর নির্বাচনে জয় এনে দিতে পারে এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপের জন্য জনদাবিকে তুষ্ট করতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশ নিছক প্রতিবেশী নয়। দেশের অভ্যন্তরে হাততালি কুড়ানোর জন্য প্রান্তজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির এই সীমান্তনীতি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষার ঝুঁকি তৈরি করে।’

কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্য। পুশ ইনের নামে ভারত আসলে দ্বিগুণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান অনুযায়ী, ‘কোনো মানুষকে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা বা সন্দেহবশত তার ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করে শূন্যরেখায় ফেলে রাখা চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ; রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার ও সম্মান কেড়ে নিতে পারে না।’

তাহলে সমাধান কোথায়? অতীত বলছে, কেবল সামরিক প্রতিরোধ দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমানের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, অর্থাৎ বিজিবির কড়া নজরদারি ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা—অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং এটি চালিয়ে যেতে হবে। তবে ভবিষ্যতের সুরক্ষার জন্য আমাদের কূটনৈতিক টেবিলে শক্তভাবে বসতে হবে।

আন্তর্জাতিক মহলকে তথ্য-প্রমাণসহ জানাতে হবে, ভারত কিভাবে দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। পুশ ইনের শিকার হওয়া প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বলি যেন বাংলাদেশকে হতে না হয়, সে জন্য ঢাকা-নয়াদিল্লির মধ্যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মানজনক, গায়ের জোরের নয়। রাতের অন্ধকারে নিরীহ নারী-শিশু আর বৃদ্ধদের সীমান্তে ঠেলে দিয়ে কেউ যদি ভাবে এটা বীরত্ব, তবে বলতে হয়, সেই রাষ্ট্র তার মানবতার শেষ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অমানবিক পুশ ইন অবিলম্বে বন্ধ হোক, সেটাই এখন ভূ-রাজনৈতিক এবং মানবিক—উভয় দিক থেকেই সময়ের দাবি।

লেখক : সাংবাদিক