নবদম্পতির প্রথম রাতটি বাসররাত হিসেবে সুপরিচিত। নারী-পুরুষ সবার জীবনে এ রাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের অনেক বসন্ত পেরিয়ে যায় এর প্রতীক্ষায়। এই রাতে দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে
বাসরঘরে নবদম্পতির করণীয় ও বর্জনীয়
শরিফ আহমাদ

পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই রাতের আচার-আচরণ এবং আদর্শের ব্যাপারে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। এগুলো নবদম্পতিকে তাদের নতুন জীবনে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা
বাসররাতে স্বামীর মুস্তাহাব আমল হলো স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা।
মাথায় হাত রেখে দোয়া করা
বাসররাতে বা তার আগে স্বামী স্ত্রীর মাথার সম্মুখভাগে হাত রেখে আল্লাহর নাম নিতে হয়। অতঃপর বরকতের দোয়া করতে হয়। আমর ইবনে শুয়াইব (রহ.) তাঁর পিতা থেকে দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোনো রমণীকে বিবাহ করে অথবা কোনো দাস খরিদ করে, তখন সে যেন বলে—(বাংলা উচ্চারণ) : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খইরহা, ওয়া খইরমা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা, ওয়া শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।’
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এর উত্তম স্বভাব ও সৎ চরিত্রের জন্য দোয়া করছি এবং এর মন্দ স্বভাব ও অনিষ্টতা থেকে তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আর যখন কেউ কোনো উট খরিদ করে তখন সে যেন এর ঝুঁটি স্পর্শ করে এরূপ বলে। (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৫৭)
নবদম্পতির একত্রে নামাজ পড়া
বাসররাতে নবদম্পতির অন্যতম একটি আমল হলো একত্রে নামাজ আদায় করা। এটা মুস্তাহাব। সাহাবা ও তাবেঈ থেকে এ আমল প্রমাণিত। এ সম্পর্কে দুটি হাদিস আছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদিস : ১৭১৫৬; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ১০৪৬১)
সহবাস করার নিয়ম
জৈবিক চাহিদা প্রত্যেক মাখলুকের মধ্যে আছে। সবাই সবার নির্ধারিত পদ্ধতিতে সেটা পূরণ করে থাকে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত হওয়ায় তাদের জৈবিক চাহিদার পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র হওয়া বাঞ্ছনীয়। সহবাসের সময় স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধামতো পদ্ধতি নির্বাচন করার অনুমতি আছে। কারণ আল্লাহ তাআলা স্ত্রীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কোনো নিয়ম-নীতি বেঁধে দেননি। শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, কাত হয়ে যতক্ষণ সহবাস স্ত্রীর যৌনাঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে। যৌনাঙ্গ ছাড়া অন্যান্য অঙ্গ যেমন—পায়ুপথ ও মুখে সংগম করা জায়েজ নেই। এটি বিকৃত মানসিকতার ফল। আগে ইহুদিদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল সহবাসের ভঙ্গি সন্তানের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রভাব ফেলে। মহান আল্লাহ তাদের ভ্রান্ত মতবাদের অসারতা প্রমাণ করে দিয়েছেন। মুহাম্মদ ইবনে আল মুনকাদির (রহ.) বলেন, আমি জাবের (রা.)-কে বলতে শুনেছি যে ইহুদিরা বলত যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর সঙ্গে পশ্চাৎ দিক থেকে তার যৌনাঙ্গে সহবাস করে তখন যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে তা টেরা হয়। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন—‘তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। কাজেই তোমরা তোমাদের ক্ষেত্রে যেরূপে ইচ্ছা সে রূপে গিয়ে ফসল উৎপাদন করো।’ (সুরা : বাকারাহ,
আয়াত : ২২৩, আবু দাউদ, হাদিস : ২১৬০)
প্রতিবার সহবাসের সময় এ দোয়া পাঠ করতে হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের আগে যদি বলে—‘(বাংলা উচ্চারণ) : ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইত্বান, ওয়া জান্নিবিশ শাইত্বানা মা রাজাকতানা।’
অর্থ : শুরু করছি আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ! আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং আমাদের যা রিজিক দেবে (সন্তান) তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখো। তারপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের ভাগ্যে কোনো সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
(বুখারি, হাদিস : ১৪১; আবু দাউদ, হাদিস : ২১৫৮)
সহবাস সম্পর্কিত বিধি-নিষেধ
সপ্তাহের যেকোনো দিন যেকোনো সময় স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস বৈধ। রমজান মাসে দিনের বেলায় স্ত্রী-সহবাস, হজ কিংবা ওমরাহর ইহরাম অবস্থায় এবং নারী হায়েজ বা নিফাস অবস্থায় থাকলে সহবাস করা হারাম। এ ছাড়া যখন সুযোগ হয় তখনই করা যায়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে—‘আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েজ সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। তখন পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন
উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন গমন করো তাদের কাছে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদের হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদের পছন্দ করেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)
স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম হওয়ার পাশাপাশি একটি নিকৃষ্ট ও ঘৃণ্য কাজ। রুচি বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কঠিন সব হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করে অথবা জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে; সে অবশ্যই মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত জিনিসকে (আল্লাহর কিতাবকে) অস্বীকার করল। (ইবনে মাজাহ,
হাদিস : ৬৩৯; দারেমি, হাদিস : ১১৭৬)
সহবাসের মধ্যে অজু ও গোসল
একবার স্ত্রী সহবাসের পর আবার স্ত্রী সহবাসের আগে অজু করা উত্তম। আম্মার ইবনে ইয়াসির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) অপবিত্র অবস্থায় পানাহার ও ঘুমানোর আগে অজু করা বা না করার স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। আলী ইবনে আবু তালেব (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আমর ও আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, অপবিত্র অবস্থায় কেউ কিছু আহার করতে চাইলে অজু করে নেবে।
(আবু দাউদ, হাদিস : ২২৫)
আর সহবাসজনিত অপবিত্রতার গোসল দ্রুত করা উত্তম। এটি অধিক পবিত্রতার বড় মাধ্যম। আত্মিক প্রশান্তি লাভের বড় উপকরণ। কোনো কারণে বিলম্বে গোসল করা জায়েজ। গুদাইফ ইবনে হারিস (রহ.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করি যে রাসুল (সা.) অপবিত্র হওয়ার পর রাতের প্রথমাংশে গোসল করতেন, নাকি শেষাংশে? তিনি বলেন, তিনি কখনো রাতের প্রথমাংশে এবং কখনো শেষাংশে গোসল করতেন। তখন আমি খুশিতে বলি, আল্লাহ মহান, সব প্রশংসা তাঁরই, যিনি এ কাজের জন্য প্রচুর সুযোগ রেখেছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২২৬)
একান্ত বিষয়গুলো গোপন রাখা
ইসলামে মানুষের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে বিব্রত অবস্থায় ফেলা নিষিদ্ধ। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত বিষয়ে অন্যের কাছে প্রকাশ করা অন্যায় কাজ। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম মানুষ হবে ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৪৩৪)
উল্লেখ্য যে দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা দেখা দিলে বিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি এবং ইসলামের বিধি-বিধান জানার জন্য বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারস্থ হওয়া নবদম্পতিদের জন্য একান্ত করণীয়।
লেখক : খতিব ও মাদরাসা শিক্ষক
রায়পুর, লক্ষ্মীপুর
সম্পর্কিত খবর

কোরআন থেকে শিক্ষা
- পর্ব, ৭৩৮

আয়াতের অর্থ : ‘হে মুমিনরা! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ...তারাও যেন অনুমতি গ্রহণ করে যেমন অনুমতি গ্রহণ করে থাকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ৫৮-৫৯)
আয়াতদ্বয়ে বিশ্রামের সময় ঘরে প্রবেশের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষের বিশ্রামের সময় তথা এশারের পর, ফজরের আগে ও জোহরের পর গৃহকর্মী, দাসী ও পরিবারের বুঝমান শিশুরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করবে না।
২. উল্লিখিত ব্যক্তিদের জন্য বিশ্রামের সময় অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তবে সন্তান সাবালক হয়ে গেলে তার জন্য এ সময়গুলোতে অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব।
৩. যে শিশু অবুঝ, যে নারীদেহ ও লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তার জন্য বিশ্রামের সময়ও অবাধে চলাচল করার অবকাশ আছে।
৪. গৃহকর্মী, দাসী ও শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে, মাহরাম হোক বা গাইরে মাহরাম, বিশ্রামের সময় সবাইকে অনুমতি নিতে হবে।
৫. আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, শিশুরা বুঝমান হয়ে উঠলে তাদের আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া পরিবারের দায়িত্ব। (তাফসিরে মুনির : ৯/৬৩৪)

রমজান-পরবর্তী সময়ে মুমিনের করণীয়
জাকি মো. হামদান

রমজান শুধু একটি মাস নয়, বরং এটি সারা জীবনের পথচলার দিকনির্দেশনা, যা হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়, আত্মাকে প্রশিক্ষিত করে এবং ইবাদতের আলোয় আলোকিত করে তোলে। এক মাসের এই প্রশিক্ষণ মুমিনের জীবনে যে পরিবর্তন এনে দেয়, তা যেন সারা জীবনের জন্য একটি দিশারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
এখানে রমজান-পরবর্তী কয়েকটি করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো—
১. নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা : মাহে রমজানের আগমন ঘটলে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তির বায়ু প্রবাহিত হয়, যা প্রত্যেককে নেক আমলে উৎসাহিত করে। আর নেক আমল গুনাহের মাধ্যমে আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে।
তাই রমজানের পরও আমাদের আমল অব্যাহত রাখা একান্ত জরুরি।
২. হেদায়েতবিহীন পথ এড়িয়ে চলা : প্রাপ্ত হেদায়েত হারিয়ে ফেলা ভ্রষ্টতার পথ গ্রহণেরই নামান্তর।
৩. নাফরমানি থেকে দূরে থাকা : নাফরমানির মূলহোতা শয়তান। শয়তান মানুষের চিরশত্রু এবং তাকে শত্রুরূপেই গণ্য করতে বলা হয়েছে।
৪. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া : সালাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। মাহে রমজানে সবারই সালাতের প্রতি কমবেশি ঝোঁক থাকে। আর সেই প্রবণতাকে অন্য মাসেও কার্যকর করা আমাদের একান্ত জরুরি।
৫. পরোপকারী মনোভাব বজায় রাখা : পরোপকার মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ।
সাধারণভাবে মানুষ রমজানে দান-সদকা বেশি করে থাকে, যা অন্যান্য মাসেও করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই বান্দার সহায় হন, যে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (মুসলিম)
মনে রাখতে হবে যে পরোপকার শুধু দান-সদকায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সদ্ব্যবহার, সহানুভূতি, পরামর্শ ও সহমর্মিতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।
৬. পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সমাধানে সচেষ্ট থাকা : মাহে রমজানের একটি বড় শিক্ষা হলো যে যখন কারো মাঝে ঝগড়া লাগবে অথবা কেউ কাউকে গালি দেবে তখন বলবে যে ‘আমি রোজাদার।’
অর্থাৎ মীমাংসাপূর্ণ মানসিকতা দরকার। এমনকি হাদিস শরিফে পারস্পরিক মীমাংসা করাকে রোজা থেকেও উত্তম বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত, সদাকাহ্র চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বলেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯)
৭. শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা : রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের এই ছয়টি নফল রোজা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে এই কয়েকটি রোজা রাখলেই বাকি ১১ মাস রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের সিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, তাকে সারা বছর সাওম পালন করার সওয়াব দেওয়া হবে!’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৮)
পরিশেষে মাহে রমজান আমাদের জীবনে একটি প্রশিক্ষণকাল, যা কেবল এক মাসের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা বাস্তব জীবনে অনুসরণ করি, তবে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সুন্দর হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমিন।

মুমিন যেভাবে আল্লাহর প্রিয় হয়
মুফতি আতাউর রহমান

আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা। প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহও তাঁর বান্দাকে ভালোবাসবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে।’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৪)
আল্লাহর ভালোবাসার গুরুত্ব
শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) এক ফাতাওয়ায় বলেছেন, ‘মুমিনের জন্য হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা ওয়াজিব।
১. আল্লাহর ভালোবাসা ঈমানের দাবি : মুমিনের ঈমানের দাবি হলো আল্লাহকে ভালোবাসা। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা পেয়ে যায় : ১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সব কিছু অপেক্ষা বেশি প্রিয় হবে।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৮৭)
২. আল্লাহর ভালোবাসা মুমিনের
বৈশিষ্ট্য : আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা লালন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মুমিন তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)
৩. ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে লেখেন, ‘আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তরের শক্তি, আত্মার খোরাক ও চোখের প্রশান্তি। সেটা এমন জীবনীশক্তি, যা থেকে যে বঞ্চিত হয় সে যেন প্রকৃতার্থেই মৃত। আল্লাহর ভালোবাসাই ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা।’ (মাদারিজুস সালিকিন : ৩/৮)
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়গুলো বর্ণনা করা হলো—
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য : মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো।
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)
২. ভালো কাজ করা : মহান আল্লাহ সেসব মানুষকে ভালোবাসেন, যারা সৎকর্মপরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সৎ কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)
৩. দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জন করা : যারা পূতঃপবিত্র থেকে ভালোবাসে এবং যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। দেহের পবিত্রতা হলো বাহ্যিক নাপাকি থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)
৪. আল্লাহভীতি অর্জন করা : যাপিত জীবনে আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৬)
৫. আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : আল্লাহর ওপর আস্থাশীল বান্দাদের আল্লাহ ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
৬. নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভে সাহায্য করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৩)
৭. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)
৮. ন্যায়বিচার করা : আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)
আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

মহানবী (সা.)-এর কাছে নারী সাহাবিদের বায়াত
আলেমা হাবিবা আক্তার

মহানবী (সা.) সাহাবিদের থেকে আনুগত্য ও যুদ্ধের বায়াত গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায়াত ছিল ‘প্রথম আকাবার শপথ’। নবুয়তের দশম বছর হজের সময় মদিনার ছয় ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে ঈমান ও আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। নবুয়তের ১৩তম বছর মদিনার ৭৫ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবী (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন।
(আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-১৫৮ ও ১৬১)
কোরআনে নারীদের বায়াত
মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) সাফা পর্বতের ওপর অবস্থান করছিলেন।
হাদিসে নারীদের বায়াত
পবিত্র কোরআনের মতো হাদিসেও নারীদের বায়াত গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। উমাইমা বিনতে রুকাইকা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি কয়েকজন আনসারি নারীর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হই।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪১৮১)
যেভাবে নারীদের বায়াত করান
পুরুষরা মহানবী (সা.)-এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করত। যেমনটি পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা তোমার হাতে বায়াত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়াত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১০)
কিন্তু মহানবী (সা.) নারী সাহাবিদের বায়াত করাতেন মুখে মুখে, তিনি কখনো তাদের হাত স্পর্শ করতেন না। সুনানে নাসায়ির উল্লিখিত হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘(নারীদের) এই বায়াত কেবল কথাবার্তার মাধ্যমে হয়েছে। হাতের ওপর হাত রেখে বায়াত হয়নি, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে হতো। বস্তুত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত কখনো কোনো গাইরে মাহরাম নারীর হাতকে স্পর্শ করেনি।’ (মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)
যেসব বিষয়ে বায়াত নেন
মহানবী (সা.) নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ে নারীদের থেকে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। তা হলো—১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, ২. চুরি না করা, ৩. ব্যভিচার না করা, ৪. সন্তান হত্যা না করা, ৫. অপবাদ না দেওয়া, ৬. মহানবী (সা.)-এর অবাধ্য না হওয়া।
তবে কোরআনে ছয়টি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, জাহেলি যুগের নারীরা উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ে বেশি লিপ্ত ছিল। তাই মহানবী (সা.) এসব বিষয়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন, যেন তারা তাদের অতীত অভ্যাসে ফিরে না যায়। উল্লিখিত আলোচনা ও বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তাসাউফের শায়খ ও আলেমরা চাইলে ইসলামের শর্ত মেনে বায়াত গ্রহণ করতে পারবে।
(মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)
আল্লাহ সবাইকে সঠিকভাবে দ্বিন মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।