সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাকযুদ্ধে জড়িয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।
হামলার ঘটনার পর রাতেই যুক্তরাজ্যে সংবাদ সম্মেলন করে আনোয়ারুজ্জামান অভিযোগ করেন, কয়েস লোদীর প্রকাশ্য মদদে এটি ঘটেছে। পরে আজ বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) বেলা ৪টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে ‘বরখাস্তকৃত সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর ভিত্তিহীন ও কাণ্ডজ্ঞানহীন অভিযোগ প্রসঙ্গে’ শিরোনামে পোস্টে এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘তিনি (আনোয়ারুজ্জামান) নাকি শুনেছেন ২ এপ্রিলের ঘটনায় সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সরাসরি মদদ দিয়েছেন। কোনোরূপ তথ্য প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে এরকম ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আমাকে বিস্মিত করেছে।
’
গত বুধবার সকালের দিকে নগরের ধোপাদীঘিরপাড় এলাকায় মিছিল ও লিফলেট বিতরণ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ কর্মীরা। ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিলটি বের করে। মিছিলের ব্যানারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের ছবি ছিল এবং তার নামে স্লোগানও দিতে শোনা যায় মিছিলকারীদের। মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনা শুরু হয়।
ভিডিওটি আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড পেজেও আপলোড করা হয়েছে। এ ঘটনায় আলোচনায় আসার পর থেকেই নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করে পুলিশ।
আরো পড়ুন
কিশোরগঞ্জে গণ অধিকার পরিষদের নেতা আবু হানিফের নির্বাচনী প্রচারণা
এদিকে এ ঘটনার পর সন্ধ্যায় সিলেটে সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের বাসাসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের চার নেতার বাসায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
এসব হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর যুক্তরাজ্যে সংবাদ সম্মেলন করেন সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট একটি দুর্বৃত্ত চক্র তার বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছিল। ৮ মাস পর বুধবার ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা প্রায় ২০০ মোটরসাইকেল নিয়ে এসে হামলা চালিয়েছে। এতে প্রকাশ্য মদদ দেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি কিংবা বিরোধীদলীয় কোনো নেতা-কর্মীর বাড়িতে কখনো হামলা-লুটপাট হয়নি উল্লেখ করে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ‘বিএনপি-ছাত্রদলের এমন হামলা-ভাঙচুর সিলেটের রাজনৈতিক সম্প্রীতিকে কলুষিত করেছে।’
আরো পড়ুন
দেড় যুগ পর গৌরনদী কেন্দ্রীয় ঈদের জামাতে সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপন
দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলনের পর বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে ফেসবুকে এ নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট দেন বিএনপি সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।
সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের বিগত ১৭ বছরের নানা নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা, মামলা, গুম, পুলিশি ভোগান্তিসহ নানা ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন। সিনিয়র নেতাদের কোমরে দড়ি বেঁধে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে সেসব ঘটনা তুলে ধরেন।
তিনি লিখেছেন, ‘বিগত সরকারের নানামুখি নির্যাতন, জেল জুলুম, গুমের রাজনীতি সারা দেশের মতো সিলেটেও অব্যাহত ছিল। আমাদের সবার মনে থাকার কথা, রেজিস্ট্রি মাঠে এসআই তারেক কীভাবে মাথা ফাটিয়েছিল প্রবীণ নেতা মরহুম এম এ হকের, কীভাবে কোমরে রশি বেঁধে টেনে নেওয়া হয়েছিল সাবেক এমপি মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমকে। সেদিন আমার পিঠেও লাঠির প্রচন্ড আঘাত করেছিল আওয়ামী এসআই তারেক। এখনো আমার পিঠে সেই কালো দাগ আছে।’
দলের নেতাদের গুমের কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘জননেতা এম ইলিয়াস আলী, ইফতেখার আহমদ দিনার, জুনেদ ও আনছারকে গুমের মাধ্যমে সিলেটের পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে কালিমা লেপন করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। এমসি কলেজের ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দেওয়া, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেকের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া এবং গুলি ছোঁড়া, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসা ভাঙচুর, বিএনপি নেতা বদরুজ্জামান সেলিমের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘তারু মিয়া স্টোর’ বারবার ভাঙচুর করেছিল স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগ। সিলেট নগরের ৭ ন নম্বর ওয়ার্ডে একাধিক বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সিলেটে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাংচুর করে আওয়ামীলীগ নিজেদের ফ্যাসিবাদী চেহারা প্রকাশ করেছে বিগত ১৬ বছর।’
আরো পড়ুন
লিবিয়ায় জিম্মি থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরলেন পিরোজপুরের লোকমান
তাকে অভিযুক্ত করায় বিস্মিয় প্রকাশ করে কয়েস লোদী লেখেন, ‘আমি মিডিয়ায় দেখেছি, লন্ডনে বসে সিলেট সিটি করপোরেশনের বরখাস্ত সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন—তিনি নাকি শুনেছেন ২ এপ্রিলের ঘটনায় সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সরাসরি মদদ দিয়েছেন। কোনোরূপ তথ্য প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে এরকম ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য আমাকে বিস্মিত করেছে।’
তিনি আরো লিখেছেন, ‘জনাব আনোয়ারুজ্জান চৌধুরী পদচ্যুত হওয়ার পর থেকেই এরকম লাগামহীন অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। সিলেটের রাজনীতিতে নোংরা কালিমা লেপনের চূড়ান্ত আঁচড় দিয়ে সুযোগ বুঝে তিনি পালিয়ে গেছেন।’
আরো পড়ুন
ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক আগামীকাল
আনোয়ারুজ্জামানের দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে কয়েস লোদী লেখেন, ‘মাত্র ৮ মাসের মেয়াদে তিনি সিটি করপোরেশনে দলীয় নেতাকর্মীদের অবৈধ নিয়োগ, টেন্ডারবাজি করে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। মেয়র কার্যালয়কে অস্ত্রের স্টোররুমে পরিণত করেছিলেন, যার তদন্ত চলমান আছে। একসময় কর্তৃপক্ষ তা জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন বলে বিশ্বাস করি।’