ইরিনা হানদোনো ইন্দোনেশিয়ার সুপরিচিত নওমুসলিম। ১৯৮৩ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। বর্তমানে একজন ইসলাম প্রচারক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। নওমুসলিমদের জন্য ইরিনা সেন্টার নামে একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছেন এই নারী।
নওমুসলিমের কথা
সুরা ইখলাস পড়ে মুসলিম হই
—সিস্টার ইরিনা

আমি ইন্দোনেশিয়ার একটি ধার্মিক খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে উঠি। আমি প্রাচুর্যের ভেতরই বড় হয়েছি। আমার পরিবার ছিল ধনী। তারা আমার শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে সব করেছে।
খুব ছোট থেকে আমি ধর্মীয় অনুপ্রেরণা লাভ করি। আমি স্রষ্টার জন্য জীবন উৎসর্গ করার ইচ্ছা পোষণ করতাম। কিশোর বয়সে স্থানীয় চার্চের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতাম। একজন নান হওয়ার প্রবল স্বপ্ন ছিল আমার। একজন ক্যাথলিক হিসেবে জাগতিক জীবন চার্চে কাটাতে চাইতাম, যেখানে সবাই ভালো কাজ করে।
একজন শিক্ষানবিশ নান হিসেবে আমি কাজ শুরু করি। এ জন্য আমাকে কোনো বেগ পেতে হয়নি। তবে চার্চের বাইরে বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়েছিল। সেখানে ধর্ম-দর্শন বোঝার জন্য তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পড়ানো হয়। আমি এ সময় ইসলাম ধর্মের তাত্ত্বিক আলোচনায় মনোযোগী হলাম। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশে জন্মালেও এটিই ছিল ইসলাম সম্পর্কে আমার প্রথম জ্ঞানার্জন। চার্চের সেই প্রশিক্ষণে আমি ইসলাম সম্পর্কে কিছু কুসংস্কারের চর্চা দেখতে পাই, যা আমি খ্রিস্টসমাজে আগেও দেখেছিলাম। মুসলিমরা দরিদ্র, অশিক্ষিত, অসভ্য ইত্যাদি। অবশ্য আমার ২০ বছর বয়সে আমি এসব কুসংস্কার কখনো গ্রহণ করিনি, বরং নিজে বিচার-বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।
আমি অন্যান্য দেশ সম্পর্কে অধ্যয়ন শুরু করলাম। বিশেষত অমুসলিম দেশ সম্পর্কে। আমি দেখলাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দারিদ্র্যের শিকার আরো অনেক দেশ আছে। যেমন—ভারত, চীন, ফিলিপাইন, ইতালি (তখন) এবং দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ। আমি আমার শিক্ষকের কাছে ইসলাম সম্পর্কে পড়ার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। আমার অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের ত্রুটিবিচ্যুতি ও দুর্বলতা খুঁজে বের করা। আমার মিশন শুরু হলো। আমি কোরআন নিয়ে বসলাম এবং এমন সব বিষয় অনুসন্ধান শুরু করলাম, যা ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারব। আমি তখনো জানি না, কোরআন ডান দিক থেকে পড়তে হয়। অন্যান্য বইয়ের মতো বাঁ দিক থেকে পড়তে লাগলাম। প্রথমেই আমার চোখে পড়ল—‘বলুন! তিনি আল্লাহ। তিনি এক। তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কারো থেকে জন্ম নেননি। কেউ তাঁর সমকক্ষ নয়।’ (সুরা : ইখলাস)
কোরআনের এই সুরা পড়ে মুগ্ধ হলাম। আমার অন্তর সাক্ষ্য দিল আল্লাহ এক। স্রষ্টার কোনো সন্তান নেই। তিনি কারো সৃষ্টি নন। কোনো কিছুই তাঁর সমকক্ষ নয়। সুরা ইখলাস পাঠ করার পর একজন যাজকের কাছে স্রষ্টায় বিশ্বাসের মূলকথা কী জানতে চাইলাম। তাঁকে বললাম, আমি বুঝছি না একজন ঈশ্বর একই সময়ে একজন ও তিনজন কিভাবে হয়? তিনি বললেন, স্রষ্টা মূলত একজন। তবে তাঁর তিনটি প্রকাশ বা ব্যক্তিত্ব রয়েছে। ঈশ্বর যিনি পিতা, ঈশ্বর যিনি পুত্র, ঈশ্বর যিনি পবিত্র আত্মা। এটিকেই ত্রিত্ববাদ বলা হয়। তাঁর ব্যাখ্যা আমি গ্রহণ করলাম। কিন্তু রাতে সুরা ইখলাসের বক্তব্যগুলো আমার চিন্তায় উঁকি দিতে থাকে। স্রষ্টা একজন। তিনি কারো সৃষ্টি নন। কেউ তাঁর সন্তান নয়।
পরদিন সকালে আমি আবারও আমার শিক্ষকের কাছে গেলাম। তাঁকে বললাম, ত্রিত্ববাদের ধারণাটি আমার বুঝে আসছে না। তিনি আমাকে একটি বোর্ডের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ত্রিভুজ এঁকে বললেন, এখানে ত্রিভুজ একটি। কিন্তু তার দিক বা বাহু তিনটি। ত্রিত্ববাদের ধারণাটিও ঠিক তেমন। তাঁর বক্তব্যের পর আমি বললাম, তাহলে তো এটিও সম্ভব আমাদের প্রভুর চারটি দিক বা বাহু থাকবে। তিনি বললেন, তা সম্ভব নয়। আমি জানতে চাইলাম কেন? তিনি অধৈর্য হলেন। বারবার বলতে লাগলেন, সেটি সম্ভব নয়। অন্যদিকে আমি প্রশ্ন করেই গেলাম। একপর্যায়ে তিনি বললেন, ত্রিত্ববাদের এই ধারণা আমি গ্রহণ করেছি। তবে তা আমার বুঝে আসে না। তুমিও এটি মেনে নাও, হজম করো। বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা পাপ। কিন্তু আমি হজম করতে পারলাম না। রাতে আবারও কোরআনের কাছে ফিরে এলাম। সুরা ইখলাস পাঠ করলাম, যেন কিছু আমার অন্তরে প্রবেশ করল। আমার কোনো সংশয় রইল না আল্লাহ এক। আমার ব্যক্তিগত চিন্তা ও গবেষণা থেকে বুঝতে পারলাম ত্রিত্ববাদের ধারণা মানুষের তৈরি, যার উদ্ভব হয়েছে ৩২৫ খ্রিস্টাব্দের পর। আগে তা ছিল না। বিষয়টি আমার ক্যাথলিক পরিচয়কেই বোঝা করে তুলল।
এরপর মুসলিম হতে এবং নতুন ধর্মবিশ্বাসের প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে আমার ছয় বছর লেগেছিল। যখন আমি ইসলাম গ্রহণের আবেদন করলাম, ধর্মীয় পণ্ডিত জানতে চাইলেন আমি কি পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রস্তুত? তিনি বললেন, ইসলাম গ্রহণ করা সহজ। কিন্তু পরবর্তী জীবনে বহু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। আমি প্রস্তুত ছিলাম। নিজেকে রক্ষা করার, নিজের আত্মাকে রক্ষা করার অধিকার আমার ছিল। অমূলক কোনো মতবাদ নিয়ে পড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পর আমি আমার পরিবার ও সম্পদ হারাই। আমি একা হয়ে যাই। পরিস্থিতি খুব ভালো ছিল না। তবে আল্লাহ আমার সঙ্গে ছিলেন। তিনি ছিলেন আমার আশ্রয়, একমাত্র আশ্রয়।
একজন নতুন মুসলিম হিসেবে আমি আমার করণীয় সম্পর্কে সচেতন ছিলাম। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতাম, রমজানে রোজা রাখতাম এবং হিজাব পরতাম। আগেও আমার জীবন ছিল স্রষ্টার জন্য উৎসর্গিত। এখনো আমার জীবন আল্লাহর জন্য নিবেদিত। আলহামদুলিল্লাহ! আমার জীবন শুধু আল্লাহর জন্য।
ভাষান্তর : আবরার আবদুল্লাহ
সম্পর্কিত খবর

কোরআন থেকে শিক্ষা
- পর্ব, ৭৩৮

আয়াতের অর্থ : ‘হে মুমিনরা! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ...তারাও যেন অনুমতি গ্রহণ করে যেমন অনুমতি গ্রহণ করে থাকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ৫৮-৫৯)
আয়াতদ্বয়ে বিশ্রামের সময় ঘরে প্রবেশের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও বিধান
১. মানুষের বিশ্রামের সময় তথা এশারের পর, ফজরের আগে ও জোহরের পর গৃহকর্মী, দাসী ও পরিবারের বুঝমান শিশুরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করবে না।
২. উল্লিখিত ব্যক্তিদের জন্য বিশ্রামের সময় অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তবে সন্তান সাবালক হয়ে গেলে তার জন্য এ সময়গুলোতে অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব।
৩. যে শিশু অবুঝ, যে নারীদেহ ও লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তার জন্য বিশ্রামের সময়ও অবাধে চলাচল করার অবকাশ আছে।
৪. গৃহকর্মী, দাসী ও শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে, মাহরাম হোক বা গাইরে মাহরাম, বিশ্রামের সময় সবাইকে অনুমতি নিতে হবে।
৫. আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, শিশুরা বুঝমান হয়ে উঠলে তাদের আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া পরিবারের দায়িত্ব। (তাফসিরে মুনির : ৯/৬৩৪)

রমজান-পরবর্তী সময়ে মুমিনের করণীয়
জাকি মো. হামদান

রমজান শুধু একটি মাস নয়, বরং এটি সারা জীবনের পথচলার দিকনির্দেশনা, যা হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়, আত্মাকে প্রশিক্ষিত করে এবং ইবাদতের আলোয় আলোকিত করে তোলে। এক মাসের এই প্রশিক্ষণ মুমিনের জীবনে যে পরিবর্তন এনে দেয়, তা যেন সারা জীবনের জন্য একটি দিশারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
এখানে রমজান-পরবর্তী কয়েকটি করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো—
১. নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা : মাহে রমজানের আগমন ঘটলে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তির বায়ু প্রবাহিত হয়, যা প্রত্যেককে নেক আমলে উৎসাহিত করে। আর নেক আমল গুনাহের মাধ্যমে আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে।
তাই রমজানের পরও আমাদের আমল অব্যাহত রাখা একান্ত জরুরি।
২. হেদায়েতবিহীন পথ এড়িয়ে চলা : প্রাপ্ত হেদায়েত হারিয়ে ফেলা ভ্রষ্টতার পথ গ্রহণেরই নামান্তর।
৩. নাফরমানি থেকে দূরে থাকা : নাফরমানির মূলহোতা শয়তান। শয়তান মানুষের চিরশত্রু এবং তাকে শত্রুরূপেই গণ্য করতে বলা হয়েছে।
৪. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া : সালাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। মাহে রমজানে সবারই সালাতের প্রতি কমবেশি ঝোঁক থাকে। আর সেই প্রবণতাকে অন্য মাসেও কার্যকর করা আমাদের একান্ত জরুরি।
৫. পরোপকারী মনোভাব বজায় রাখা : পরোপকার মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ।
সাধারণভাবে মানুষ রমজানে দান-সদকা বেশি করে থাকে, যা অন্যান্য মাসেও করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই বান্দার সহায় হন, যে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (মুসলিম)
মনে রাখতে হবে যে পরোপকার শুধু দান-সদকায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সদ্ব্যবহার, সহানুভূতি, পরামর্শ ও সহমর্মিতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।
৬. পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সমাধানে সচেষ্ট থাকা : মাহে রমজানের একটি বড় শিক্ষা হলো যে যখন কারো মাঝে ঝগড়া লাগবে অথবা কেউ কাউকে গালি দেবে তখন বলবে যে ‘আমি রোজাদার।’
অর্থাৎ মীমাংসাপূর্ণ মানসিকতা দরকার। এমনকি হাদিস শরিফে পারস্পরিক মীমাংসা করাকে রোজা থেকেও উত্তম বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত, সদাকাহ্র চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বলেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯)
৭. শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা : রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের এই ছয়টি নফল রোজা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে এই কয়েকটি রোজা রাখলেই বাকি ১১ মাস রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের সিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, তাকে সারা বছর সাওম পালন করার সওয়াব দেওয়া হবে!’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৮)
পরিশেষে মাহে রমজান আমাদের জীবনে একটি প্রশিক্ষণকাল, যা কেবল এক মাসের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা বাস্তব জীবনে অনুসরণ করি, তবে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সুন্দর হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমিন।

মুমিন যেভাবে আল্লাহর প্রিয় হয়
মুফতি আতাউর রহমান

আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা। প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহও তাঁর বান্দাকে ভালোবাসবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে।’
(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৪)
আল্লাহর ভালোবাসার গুরুত্ব
শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) এক ফাতাওয়ায় বলেছেন, ‘মুমিনের জন্য হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা ওয়াজিব।
১. আল্লাহর ভালোবাসা ঈমানের দাবি : মুমিনের ঈমানের দাবি হলো আল্লাহকে ভালোবাসা। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা পেয়ে যায় : ১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সব কিছু অপেক্ষা বেশি প্রিয় হবে।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৮৭)
২. আল্লাহর ভালোবাসা মুমিনের
বৈশিষ্ট্য : আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা লালন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মুমিন তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)
৩. ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে লেখেন, ‘আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তরের শক্তি, আত্মার খোরাক ও চোখের প্রশান্তি। সেটা এমন জীবনীশক্তি, যা থেকে যে বঞ্চিত হয় সে যেন প্রকৃতার্থেই মৃত। আল্লাহর ভালোবাসাই ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা।’ (মাদারিজুস সালিকিন : ৩/৮)
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়গুলো বর্ণনা করা হলো—
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য : মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো।
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)
২. ভালো কাজ করা : মহান আল্লাহ সেসব মানুষকে ভালোবাসেন, যারা সৎকর্মপরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সৎ কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)
৩. দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জন করা : যারা পূতঃপবিত্র থেকে ভালোবাসে এবং যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। দেহের পবিত্রতা হলো বাহ্যিক নাপাকি থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)
৪. আল্লাহভীতি অর্জন করা : যাপিত জীবনে আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৬)
৫. আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : আল্লাহর ওপর আস্থাশীল বান্দাদের আল্লাহ ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
৬. নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভে সাহায্য করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৩)
৭. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)
৮. ন্যায়বিচার করা : আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)
আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

মহানবী (সা.)-এর কাছে নারী সাহাবিদের বায়াত
আলেমা হাবিবা আক্তার

মহানবী (সা.) সাহাবিদের থেকে আনুগত্য ও যুদ্ধের বায়াত গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায়াত ছিল ‘প্রথম আকাবার শপথ’। নবুয়তের দশম বছর হজের সময় মদিনার ছয় ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে ঈমান ও আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। নবুয়তের ১৩তম বছর মদিনার ৭৫ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবী (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন।
(আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-১৫৮ ও ১৬১)
কোরআনে নারীদের বায়াত
মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) সাফা পর্বতের ওপর অবস্থান করছিলেন।
হাদিসে নারীদের বায়াত
পবিত্র কোরআনের মতো হাদিসেও নারীদের বায়াত গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। উমাইমা বিনতে রুকাইকা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি কয়েকজন আনসারি নারীর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হই।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪১৮১)
যেভাবে নারীদের বায়াত করান
পুরুষরা মহানবী (সা.)-এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করত। যেমনটি পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা তোমার হাতে বায়াত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়াত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১০)
কিন্তু মহানবী (সা.) নারী সাহাবিদের বায়াত করাতেন মুখে মুখে, তিনি কখনো তাদের হাত স্পর্শ করতেন না। সুনানে নাসায়ির উল্লিখিত হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘(নারীদের) এই বায়াত কেবল কথাবার্তার মাধ্যমে হয়েছে। হাতের ওপর হাত রেখে বায়াত হয়নি, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে হতো। বস্তুত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত কখনো কোনো গাইরে মাহরাম নারীর হাতকে স্পর্শ করেনি।’ (মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)
যেসব বিষয়ে বায়াত নেন
মহানবী (সা.) নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ে নারীদের থেকে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। তা হলো—১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, ২. চুরি না করা, ৩. ব্যভিচার না করা, ৪. সন্তান হত্যা না করা, ৫. অপবাদ না দেওয়া, ৬. মহানবী (সা.)-এর অবাধ্য না হওয়া।
তবে কোরআনে ছয়টি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, জাহেলি যুগের নারীরা উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ে বেশি লিপ্ত ছিল। তাই মহানবী (সা.) এসব বিষয়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন, যেন তারা তাদের অতীত অভ্যাসে ফিরে না যায়। উল্লিখিত আলোচনা ও বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তাসাউফের শায়খ ও আলেমরা চাইলে ইসলামের শর্ত মেনে বায়াত গ্রহণ করতে পারবে।
(মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)
আল্লাহ সবাইকে সঠিকভাবে দ্বিন মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।