মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হতে হবে

  • ড. নিয়াজ আহম্মেদ
শেয়ার
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হতে হবে

কয়েক দিন আগে কুয়েট ও রুয়েটের দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করে। ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী স্কুলের এক শিক্ষার্থী বাসার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নিজেকে হনন করে। লেখক, সাংবাদিক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের ৪২ বছরের মেয়ে নিজেকে হননের পথ বেছে নেন। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো।

এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা খুললেই আমাদের চোখে পড়ে। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেকে নিজেই হরণের পথ বেছে নিচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া টিনএজ থেকে শুরু করে বয়স্ক পর্যন্ত সবার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও গৃহবধূদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অনেক বেশি।
একেক শ্রেণির আত্মহত্যার কারণও একেক রকম। সমাজে বসবাসরত অনেক মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা রয়েছে। তা না হলে নিজেকে হননের মতো কাজ কেনই বা বেছে নেবে। কারোর মানসিক সমস্যা প্রকাশ পায় এবং আমরা বুঝতে পারি।
আবার কারোরটা প্রকাশ পায় না, তবে একান্ত কাছের মানুষ বুঝতে পারে। যারা নিজেকে গুটিয়ে রাখে এবং যাদের মেলামেশার পরিধি ছোট, তাদের বেলায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে তা জানা ও বোঝা সহজ নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা, কোনো মানসিক রোগ, বঞ্চনা, অবসাদ ও হতাশা থেকে মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়, যা একটি পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করে এবং নিজেকে হননের পথ বেছে নেয়। আবার অনেকের বেলায় তাৎক্ষণিক রাগ ও অভিমান থেকেও আত্মহত্যা করার প্রবণতা কাজ করে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে আগে থেকে কোনো মানসিক বিচ্যুতি ও সামাজিকীকরণের সমস্যা থেকে থাকে, যা হয়তো পরিবারের কারো দৃষ্টিগোচর হয়নি কিংবা চোখে পড়েনি।
সুপ্ত থাকুক আর প্রকাশ ঘটুক না কেন, কোনো না কোনো মানসিক অস্থিরতা কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক অসংগতি ছাড়া এবং একেবারে কারণ ছাড়া আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে না।

বর্তমান সময়ে আমাদের মধ্যে চাহিদা, প্রয়োজন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশাসহ বহুবিধ বিষয় প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। ভেঙে বললে এগুলো নতুন হচ্ছে এবং পূরণে শক্ত অবস্থান কাজ করছে। কারো কারো ক্ষেত্রে পূরণের সামর্থ্যকে কোনোভাবেই মূল্যায়ন করা হয় না। পরিবর্তিত চাহিদা পূরণ করা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলার ক্ষমতা সবার সমান থাকে না। এমন প্রয়োজন রয়েছে, যা কোনো কোনো পরিবারের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয় না। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টি এখানে জড়িত। আবার সন্তানের এমন অনেক প্রয়োজন ও চাহিদা থাকে, যা পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের দিক থেকে সম্ভব না-ও হতে পারে। তখন একটু সমস্যাই হয়। প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে দ্রুততার বিষয়টিও কাজ করে। জিনিসটি আমার এখনই চাই। পারিবারিক সম্পর্ক, লেখাপড়া ও আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে আমাদের সবার, বিশেষ করে সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ও চাহিদার পরিবর্তন দ্রুত হচ্ছে। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রত্যাশার পরিমাণও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আমরা অনেক সময় প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবহারসহ অন্যান্য বিষয় অন্যের কাছ থেকে সঠিকভাবে পাই না। কিন্তু অন্যের ওপর আমার যে নিয়ন্ত্রণ নেই, তা আমরা ভুলে যাই। ইচ্ছা করেই আমরা জোর করে অন্যের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার আদায় করতে পারি না। অন্যরা আমার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করলে কিংবা খারাপ বললে আমার কী-ই বা করার আছে। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়ার বেদনা ও হতাশা মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, যা মানসিক চাপে রূপান্তরিত হয়। এমন মনোসামাজিক প্রেক্ষাপট অনেকের পক্ষে সহ্য করতে না পারার ব্যর্থতা আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়।

এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী? মানসিক স্বাস্থ্যকে আমাদের সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পরিবারের সব সদস্যের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের ওপর নজর দিতে হবে, বিশেষ করে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। জীবনে চলার পথে যে কারো সংকট ও সমস্যা তৈরি হতে পারে। আর্থিক, মানসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে ধরনেরই সংকট তৈরি  হোক না কেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা সমীচীন। পরিবার একটি সন্তানের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে অনেক কিছু শেখার আছে।

নিজের মানসিক স্বাস্থ্য এবং নিজেকে বেশি যত্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, যাকে ইংরেজিতে সেলফ কেয়ার বলা হয়। এর অর্থ এই নয় যে আপনি অন্যকে নিয়ে ভাববেন না। দিনের একটি সময়ে নিজেকে নিয়ে চিন্তা করুন, ভাবুন ও আত্মমূল্যায়ন করুন। নিজের মতো করে ভালো থাকার চেষ্টা করুন। দেখবেন, আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে এবং আপনি মানসিক চাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারছেন।

 লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

neazahmed_2002@yahoo.com

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

ডলার সংকটেও ওয়েজ আর্নার্স বন্ড নিয়ে বিড়ম্বনা

    নিরঞ্জন রায়
শেয়ার
ডলার সংকটেও ওয়েজ আর্নার্স বন্ড নিয়ে বিড়ম্বনা

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলার সংগ্রহের যতগুলো মাধ্যম আছে, তার মধ্যে ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড (ওয়েজ আর্নার্স বন্ড) অন্যতম। কেননা দেশে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের অন্যান্য যেসব পন্থা আছে, যেমনরপ্তানি আয়, বৈদেশিক রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক ঋণ, এর সবগুলোর বিপরীতে তাত্ক্ষণিক ব্যয় থাকে। অর্থাৎ এসব উৎস থেকে একদিকে ডলার সংগ্রহ করা হয় এবং অন্যদিকে সেই ডলার আমদানিমূল্য ও ঋণ পরিশোধসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। সেদিক থেকে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড কিছুটা ভিন্ন।

অবশ্য বাস্তবে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত ডলার তাত্ক্ষণিক ব্যয় করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু ক্রেতা মেয়াদপূর্তিতে বন্ডের আসল অর্থ ডলারে রূপান্তর করে তাঁর নিবাসী দেশে বা অন্য কোনো দেশে ফিরিয়ে নিতে পারে। এ কারণে মেয়াদপূর্তিতে বন্ডের আসল অর্থ ডলারে ফেরত দেওয়ার স্বার্থে মোট বিক্রীত ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের সমপরিমাণ ডলার বিশেষভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, যা মূলত সরকারের টেকসই বা দীর্ঘমেয়াদি ডলার ফান্ড হিসেবে কাজ করে। যদিও এই ডলার ফান্ড শুধু ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের অর্থ পরিশোধে ব্যয় করার কথা, তার পরও দেশের জরুরি প্রয়োজনে বন্ডের মেয়াদপূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বিশেষ ফান্ডের অর্থ ব্যয় করার সুযোগ থাকে।
এটাই সরকারের দিক থেকে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের মাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। প্রথমত, এই বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে পাঠাতে আগ্রহী থাকে। দ্বিতীয়ত, এই বন্ডের আসল অর্থ যেহেতু মেয়াদপূর্তিতে পুনরায় ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া যায়, তাই অনেকেই, বিশেষ করে যেসব প্রবাসী স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করে, তারা এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখায়।

যদিও বন্ডে প্রদত্ত সুযোগ অনুযায়ী এর আসল অর্থ ক্রেতা তার নিবাসী দেশে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবে বেশির ভাগ ক্রেতা না নিয়ে এখানে রেখে দেয়, যতক্ষণ পর্যন্ত পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ থাকে। তৃতীয়ত, এই বন্ডের ওপর প্রদত্ত সুদ তুলনামূলক বেশি থাকায় প্রবাসীরা তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে এনে প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ করার পরিবর্তে এই বন্ডে বিনিয়োগ করে রাখতে পারে।

ডলার সংকটেও ওয়েজ আর্নার্স বন্ড নিয়ে বিড়ম্বনাএ রকম একটি বিশেষ সুবিধাসংবলিত ওয়েজ আর্নার্স বন্ড যতটা জনপ্রিয় হওয়ার কথা ছিল এবং যেভাবে ব্যাপক হারে এই বন্ডে প্রবাসীদের ডলার বিনিয়োগ করার কথা ছিল, তেমনটা হয়নি। এর অনেক কারণও আছে। প্রথমত, এটি যে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ এক বিনিয়োগ ব্যবস্থা, সে ব্যাপারে তেমন প্রচার-প্রচারণা নেই বললেই চলে।

দ্বিতীয়ত, এই বন্ডে বিনিয়োগ করার পদ্ধতি বেশ জটিল। অনেক রকম ফরম পূরণ করতে হয় এবং অ্যাম্বাসি বা হাইকমিশনের সহযোগিতা নিতে হয়, যা বেশ কষ্টসাধ্য। তার ওপর বন্ড ইস্যু করা এবং ইস্যুকৃত বন্ড সংগ্রহ করাও খুব সহজ হয় না। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে বিনিয়োগ করা ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া। এসব কারণে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ক্রয় এবং নবায়ন করা নিয়ে যথেষ্ট বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে। এই বন্ড নবায়নের সুযোগ সীমিত করার পেছনে উচ্চ হারের সুদ প্রদানকে যুক্তি হিসেবে দেখানো হতে পারে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সুদের হার বেশি মনে হলেও প্রকৃত অর্থে সরকার সঞ্চয়পত্রের চেয়ে অনেক কম সুদ এই বন্ডের ওপর দিয়ে থাকে। বিষয়টি অনেকে হয়তো মানতে চাইবেন না, তাই তাদের জ্ঞাতার্থে একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।    

আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ডলারের বিনিময় মুল্য যখন ৮০ টাকা ছিল তখন সরকার একজন প্রবাসীর কাছ থেকে এক লাখ ডলার ক্রয় করে ৮০ লাখ টাকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ড ইস্যু করেছে। এখন যখন সেই বন্ড মেয়াদ পূর্ণ করেছে তখন দেশে ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা এবং সে অনুযায়ী বন্ডের আসল অর্থ ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে ডলারের বর্তমান বিনিময় মূল্য অনুযায়ী ৬৭ হাজার ডলার। এই পাঁচ বছর সময়ে সরকারের এক্সচেঞ্জ গেইন হবে ১৩ হাজার ডলার, যা বর্তমান বিনিময় মূল্য অনুযায়ী ১৬ লাখ টাকা। বন্ডের পাঁচ বছর মেয়াদকালে সরকার টাকায় সুদ প্রদান করবে ৪৮ লাখ টাকা যদি বন্ডের ওপর সুদের হার ১২ শতাংশ হয়। বিনিময় লাভ বিবেচনায় নিলে সরকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের ওপর প্রকৃত সুদ প্রদান করবে ৩২ লাখ টাকা। পক্ষান্তরে যদি ওয়েজ আর্নার্স বন্ডে বিনিয়োগের পরিবর্তে সরকারি সঞ্চয়পত্রে এই ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে রাখা হয় এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর যদি সুদের হার হয় ১০ শতাংশ, তাহলে সরকারকে সুদ দিতে হবে ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক লাখ ডলারের ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের ওপর প্রদত্ত প্রকৃত সুদ সমপরিমাণ সঞ্চয়পত্রের চেয়ে আট লাখ টাকা কম হবে।   

পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে আলোচ্য উদাহরণে চক্রবৃদ্ধি সুদের পরিবর্তে সরল সুদ ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে চক্রবৃদ্ধি সুদের ক্ষেত্রে পরিমাণটা বেশি হবে, কিন্তু পার্থক্যের পরিমাণ এ রকমই থাকবে। এ কারণেই দেখা যায় সঞ্চয়পত্রের পরিবর্তে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের ওপর সরকার প্রকৃত সুদ কম প্রদান করে থাকে। আলোচ্য উদাহরণে যে বিনিময় হারের পতন দেখানো হয়েছে তা খুবই অস্বাভাবিক, যা বিশেষ কারণ ছাড়া সাধারণত হয় না। যেমনব-এখন হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলার হার্ড কারেন্সি হয়ে যাওয়ায়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও টাকার যে অবমূল্যায়ন ঘটে, সেটি বিবেচনায় নিলেও সরকার ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের ওপর প্রকৃত সুদ অনেক বেশি প্রদান করে থাকে। এ কারণে প্রবাসীদের বিনিয়োগ করা ওয়েজ আর্নার্স বন্ড যত দিন পর্যন্ত পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া যায়, ততই সরকারের লাভ। এটি জানা সত্ত্বেও সরকার এই ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। এখন থেকে বিনিয়োগের পর সর্বোচ্চ দুইবারের জন্য ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগ করা যাবে।

ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের পথ বন্ধ করে দিলে নানা রকম সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য। প্রথমত, দেশের ডলার সংকটের মুহূর্তে এই সিদ্ধান্ত ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে দেবে এবং সংকট কিছুটা হলেও তীব্র হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ওয়েজ আর্নার্স বন্ড যখন পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে না, তখন বন্ডের বিনিয়োগকারীর সামনে দুটো পথ খোলা থাকবে। বন্ডের অর্থ ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে নিয়ে যাওয়া এবং এর ফলে দেশ থেকে ভালো অঙ্কের ডলার বিদেশে চলে যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে এই বন্ডের টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা। কিন্তু সে ক্ষেত্রে সরকারের এমন কী লাভ হবে তা আমাদের কাছে মোটেই বোধগম্য নয়। কেননা এতে সরকারকে প্রকৃত সুদ বেশি দিতে হবে, যা আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তৃতীয়ত, অনেক প্রবাসী যখন জানবে যে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে, তখন তারা এই বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এর ফলে দেশে ডলার আসা যে অনেকটা হ্রাস পাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ অব্যাহত রাখার মাধ্যমে বর্তমানে এই খাতে বিনিয়োগ করা ডলার ধরে রাখা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি এই বন্ডে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করে দেশের ডলার সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করার সুযোগ থাকবে। 

এ রকম বাস্তবতায় বিশেষ করে দেশ যেহেতু ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ঠিক সেই সময়ে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করার পদক্ষেপ মোটেই যুক্তিসংগত এবং বাস্তবসম্মত হয়নি। তা ছাড়া এতে সরকারের ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যদি তর্কের খাতিরে এক্সচেঞ্জ গেইনের মতো জটিল বিষয়টি সরিয়ে রেখে সোজাসুজি ধরে নিই যে উচ্চ সুদের হারই ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করার পেছনে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। সে ক্ষেত্রে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের ওপর সুদের হার হ্রাস করে সঞ্চয়পত্রের ওপর প্রদত্ত সুদের হারের সমান করে দেওয়া যেতে পারে। এখানে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো যে ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের সুদ যেহেতু টাকায় প্রদান করা হয়, তাই এই বন্ডের ওপর এবং সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয়ের তেমন কোনো তারতম্য নেই। অবশ্য যারা নতুন ওয়েজ আর্নার্স বন্ডে বিনিয়োগ করবে, তাদের উৎসাহিত করার স্বার্থে শুরুতে উচ্চ সুদ প্রদান করলেও তৃতীয়বারের বেশি পুনর্বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের সমান সুদ প্রদান করা যেতে পারে। মোটকথা যেকোনোভাবেই হোক না কেন, এই ওয়েজ আর্নার্স বন্ড পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত না করে অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড নতুনভাবে ক্রয় এবং পুনর্বিনিয়োগের পদ্ধতি যথেষ্ট সহজ করা প্রয়োজন। এমনটা করতে পারলে দেশ এবং প্রবাসী উভয়ই উপকৃত হতে পারবে। সেই সঙ্গে ডলার সংকট নিরসনে ওয়েজ আর্নার্স বন্ড কিছুটা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আশা করি, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ভেবে দেখবে।

 

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

nironjankumar_roy@yahoo.com

 

মন্তব্য

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও আরব রাষ্ট্রগুলোর অগ্নিপরীক্ষা

    এ কে এম আতিকুর রহমান
শেয়ার
গাজা নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও আরব রাষ্ট্রগুলোর অগ্নিপরীক্ষা

২০ জানুয়ারি ২০২৫ ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর কদিন আগেই ১৫ জানুয়ারি গাজার হামাস যোদ্ধা এবং ইহুদিবাদী ইসরায়েল ছয় সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে রাজি হয়। এই চুক্তির অন্যতম বিষয় ছিল গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার ও জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া। ট্রাম্প আন্তরিকভাবে ওই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে আবার শান্তি ফিরে আসবে।

যাহোক, নানা সংকটের মধ্যেও ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৪৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং কমপক্ষে এক লাখ ১২ হাজার জন আহত হয়েছেন। তবে এখনো গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। 

শপথ গ্রহণের পরপরই ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বাড়ানোর কথা বললেও আশা করা যাচ্ছিল যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি হয়তো দুটি পক্ষকেই একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে।

কিন্তু কয়েক দিন পরই তিনি বললেন যে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত। ফিলিস্তিনিদের স্থানান্তরিত করা উচিত। তিনি গাজার ২.৩ মিলিয়ন বাসিন্দাকে মিসর এবং জর্দানে স্থানান্তরিত করার প্রস্তাব করেছেন এই যুক্তিতে যে তারা সেখানে ভালো থাকবে। অন্যদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গাজাকে মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা হিসেবে পুনর্গঠিত করার ইঙ্গিত দেন।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে সফররত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্পষ্টভাবেই ওই ঘোষণা যেমন মার্কিন আধিপত্যবাদের নগ্নতার প্রকাশ, তেমনি ফিলিস্তিন সার্বভৌমত্বের ধারণাকে প্রত্যাখ্যানের শামিল। 

স্বাভাবিক কারণেই ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের ফলে শুধু আরব রাষ্ট্রগুলো বা মুসলিম দেশগুলোতেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি কয়েক দিন আগে ইসরায়েল সফরকালে মার্কিন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের ছয় সিনেটরের একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে গাজা দখলের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প করছেন তার বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন, গাজা দখলের জন্য সেনা পাঠানোর যে ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, সেই সেনাবাহিনী চলে জনগণের করের টাকায়।

করদাতাদের অর্থে এমন একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা তার জন্য অসম্ভব হবে। তিনি আরব অঞ্চলের নেতাদের গাজা পুনর্গঠনসংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা হাজির করার আহ্বান জানান, যা মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে বাস্তবসম্মত হবে এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধিকার সমুন্নত রাখবে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু লোক ছাড়া কোনো মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের ওই ঘোষণাকে সমর্থন করবে না। তাহলে কোন ধারণায় ট্রাম্প এসব কথা বলতে পারেন? নিশ্চয়ই পেছনের কারণটি অন্য কিছু। সেটি কি তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা যাচাই করা?

গাজা নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও আরব রাষ্ট্রগুলোর অগ্নিপরীক্ষাআমরা জানি, এ মাসে গাজা ইস্যু নিয়ে মিসরে আরব লীগের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ কারণে তা আগামী ৪ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। মূলত ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় আঞ্চলিক সমর্থন বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ওই বৈঠক আহ্বান করেছিল মিসর। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে সম্মেলনের মৌলিক ও যৌক্তিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জোটের সদস্যরা নতুন তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে একমত হয়েছে। তারা গাজা নিয়ে একটি বিকল্প পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছে। ওই পরিকল্পনায় ট্রাম্পের সম্মতি রয়েছে বলে জানা যায়। উল্লেখ্য, জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ওয়াশিংটন সফরকালে ১১ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকে অন্যান্য বিষয় ছাড়াও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ফলে ওই অঞ্চলে সম্ভাব্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে অস্থিতিশীলতা ও ইসলামী উগ্রবাদের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। হয়তো নতুন সম্ভাবনাটি সেই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় ঘটতে যাচ্ছে। 

এখন পর্যন্ত যতটুকু বোঝা যায়, ট্রাম্পের পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে ঐক্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল আরব রাষ্ট্রগুলো। তারই ধারাবাহিকতায় আরব নেতারা গাজার জন্য ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিপরীতে একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় মিলিত হন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জর্দানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, মিসরের রাষ্ট্রপতি আবদেল-ফাত্তাহ আল-সিসি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, বাহরাইনের যুবরাজ সালমান বিন হামাদ আল খলিফা এবং কুয়েতের আমির শেখ মিশাল আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ উপস্থিত ছিলেন। মূলত এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ওপর আলোকপাত করা, যাতে ফিলিস্তিনিদের ছিটমহল থেকে না সরিয়ে নেওয়া যায়। ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ এবং গাজা উপত্যকার উন্নয়নের সমর্থনে যৌথ প্রচেষ্টা সম্পর্কে ওই দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে আলোচনার পর বৈঠকটি শেষ হয়। বৈঠকে নেতারা সর্বশেষ ফিলিস্তিনি ঘটনাবলি মোকাবেলায় ৪ মার্চ কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য জরুরি আরব লীগের শীর্ষ সম্মেলনের প্রতি তাদের সমর্থনও ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলেও গাজা উপত্যকার প্রশাসন কার হাতে থাকবে এবং পুনর্গঠনের জন্য অর্থায়ন কিভাবে হবে, সেই প্রশ্নগুলো রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ওই দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যও বিদ্যমান। যদিও কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে মিসর কী পরিকল্পনা উত্থাপন করতে যাচ্ছে তা জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি ওই পরিকল্পনায় ১. গাজায় যে ধ্বংসস্তূপ জমে আছে তা অপসারণ করা; ২. গাজার নগর পরিকল্পনা, আবাসন নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা; ৩. প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ব্যবস্থা করা; ৪. দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের জন্য একটি রাজনৈতিক পথ উন্মোচন এবং একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য প্রণোদনা সৃষ্টি করা ইত্যাদি বিষয় থাকতে পারে। যাহোক, এসব জানার জন্য আমাদের সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতেই হবে। 

এদিকে জাতিসংঘ বলেছে যে গাজা পুনর্গঠনে ৫৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি লাগবে, যার মধ্যে প্রথম তিন বছরের জন্য ২০ বিলিয়নের বেশি প্রয়োজন হতে পারে। আসন্ন সম্মেলনে রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে এই অর্থের সংকুলান কিভাবে করা হবে তা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। আর মিসরের পরিকল্পনায় অর্থায়নের বিষয়টিই হয়ে উঠবে এক বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এ বাবদ অর্থ ব্যয় করার আগে মিসর ও কাতারের কাছ থেকে হামাস ইস্যু নিয়ে কিছু শর্তারোপের উল্লেখ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে গাজার নিয়ন্ত্রণ হামাসের পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক ফিলিস্তিনি প্রশাসন-এর হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো নানা যোগ-বিয়োগের হিসাব করে অর্থায়নে সম্মত হবে। তবে মূল অর্থ জোগানদাতা দেশ যদি মার্কিনদের বন্ধুরাষ্ট্র হয়, তাহলে সেই সমীকরণে যে মার্কিন প্রভাব থাকবে না এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে মিসর ও জর্দানের ভূমিকা কী হবে সে বিষয় নিয়েও কথা উঠবে। তবে ওই অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম দেশের (যেমন ইরান, লেবানন, লিবিয়া, ইরাক বা তুরস্ক) প্রতিক্রিয়া কী হবে বা তাদের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে তা হয়তো কায়রো পরিকল্পনাটি ঘোষণা করার পরই স্পষ্ট হবে।

রাজনৈতিক দিক থেকে ওই পরিকল্পনায় হামাসের ভূমিকা কী হবে সেটি যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনি ওই পরিকল্পনা ইসরায়েল কিভাবে গ্রহণ করবে সেই প্রশ্নটিও রয়েছে। যতটুকু জানা গেছে, রিয়াদ গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে দেখতে চায়। হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতারও জোর দিয়ে বলেছে যে গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে ফিলিস্তিনিদেরই। আসলে সব আঞ্চলিক পক্ষই বুঝতে পারছে, তাদের প্রস্তাবিত যেকোনো বিকল্প পরিকল্পনায় কোনোভাবেই হামাস থাকতে পারবে না। কারণ হামাসের উপস্থিতি এটিকে মার্কিন প্রশাসন ও ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে না। আর পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করতে অবশ্যই ট্রাম্পের সম্মতির প্রয়োজন হবে সেটিও বলার অপেক্ষা রাখে না।     

তাহলে ট্রাম্পের গাজা খেলার এই অগ্নিপরীক্ষায় আরব রাষ্ট্রগুলো কি উত্তীর্ণ হতে পারবে? ফিলিস্তিনিরা কি তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি তাদের এই পরিকল্পনায় সম্মত হবে? সব প্রশ্নের শেষে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের একটাই প্রত্যাশা, তারা ফিলিস্তিন বা ইসরায়েল কোথাও আর মানুষের জীবন নিয়ে কোনো নৃশংস খেলা দেখতে চায় না। 

 লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর এবং নতুন নাটকীয়তা

    ড. ফরিদুল আলম
শেয়ার
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর এবং নতুন নাটকীয়তা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এই আলোচনায় রুশ এবং মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার আলোচনা শেষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে জানানো হলেও এই আলোচনায় ইউক্রেনকে সংযুক্ত করা হয়নি। ট্রাম্প ও পুতিনের আগ্রহে এই আলোচনায় ইউক্রেনকে রাখা না রাখা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কির দিকে তোপ দাগা হয়েছে। তাঁকে স্বৈরশাসক হিসেবে এবং দেশের ভেতর একজন অজনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ট্রাম্পের বিশেষ উপদেষ্টা ইলন মাস্ক।

মার্কিন প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, তা হলো এই যুদ্ধ বন্ধের জন্য তাদের দিক থেকে ইউক্রেনকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করা হচ্ছে না। তারা বরং এটিই মনে করছে যে মার্কিন অর্থ সহায়তা বন্ধই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে এই যুদ্ধে এত দিন ধরে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো বিশাল অঙ্কের অর্থ সহায়তা করে এলেও এটি যুক্তরাষ্ট্র প্রদত্ত অর্থের তুলনায় অতি নগণ্য।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর এবং নতুন নাটকীয়তাডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় প্রতিদিনই ইউক্রেন নিয়ে কোনো না কোনো মন্তব্য করছেন।

তাঁর সর্বশেষ বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ইউরোপ যে অর্থ এত দিন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে দিয়েছে, সেটি ঋণ হিসেবে দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দেওয়া হয়েছে এই যুদ্ধে সহায়তা হিসেবে। তিনি ভবিষ্যতে আর কোনো অর্থ এর পেছনে খরচ করতে রাজি নন, উপরন্তু তাঁদের দিক থেকে দেওয়া শত শত কোটি ডলার অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা চান তিনি। একই সঙ্গে অন্তত কোনো না কোনো উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যেন তার দেওয়া অর্থের প্রতিদান দেওয়া হয়, তার নিশ্চয়তা চান।
এ ক্ষেত্রে তিনি ইউক্রেনের বিরল খনিজ পদার্থ কিংবা তেলের অংশীদারির বিনিময়ে তাঁদের দিক থেকে দেওয়া সহায়তার উসুল করতে চান। তিনি অর্থের পরিমাণটা উল্লেখ করতেও ভোলেননি। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া ৩০০ কোটি ডলারের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৫০০ কোটি ডলার বাণিজ্য করতে চায় ইউক্রেনে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চাওয়া বিরল খনিজ পদার্থের অংশীদারির দাবিকে এরই মধ্যে খারিজ করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। জবাবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হলে হয় জেলেনস্কিকে দ্রুত সরে যেতে হবে, নয়তো তিনি ইউক্রেনকে হারাবেন।
সে ক্ষেত্রে এর দায় পুরোটাই জেলেনস্কির ঘাড়ে এসে বর্তাবে।

ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন যুদ্ধ বন্ধ ও এর পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে পরোক্ষভাবে অর্থপ্রাপ্তির দিকটি জানানো হয় এবং ইউক্রেনের দিক থেকে তা খারিজ করে দেওয়া হলো। এর আগে তিনি তিন দিনের ব্যবধানে দুই রকমের কথা বলেছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন যে রাশিয়া এই যুদ্ধ শুরু করেছে। এর তিন দিনের মাথায় তিনি এই যুদ্ধের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করে জানিয়েছেন যে ইউক্রেনের এটি শুরু করতে দেওয়া উচিত হয়নি, অর্থাৎ যে ন্যাটোতে যোগদান করা না করা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ উন্মুক্ত ছিল। এর জন্য তিনি কি সত্যি ইউক্রেনকে দায়ী করতে পারেন কি না, সেটি নিয়ে সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠবে। ইউক্রেন যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে উসকানি এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো নিশ্চয়তা না পেত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার একার পক্ষে এই যুদ্ধে জড়িত হওয়ার কোনো কারণ থাকত না। একই সঙ্গে এটিও সংগত যে প্রতিবেশী রাশিয়ার দিক থেকে সম্ভাব্য হামলা এবং প্রতিনিয়ত হুমকি মোকাবেলায় তার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচ্য ছিল। একই সময়ে এখানে ইউক্রেনের স্বার্থের সঙ্গে ইউরোপের স্বার্থের সম্মিলন ঘটেছিল বলেই ইউরোপের পক্ষ থেকে রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালানোর যুক্তি স্পষ্ট ছিল। জো বাইডেনের সময়ে কেবল নয়, এত দিন ধরে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে অভিন্নভাবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির এক ধরনের বৈপরীত্যের প্রকাশ ঘটছে। 

পরিস্থিতি বলছে, ট্রাম্প এত দিন ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অতীতের বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের নানা রকম বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলেও আলোচনার মধ্য দিয়ে এর নিসরন ঘটেছে। এবার ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প ইউক্রেন এবং ইউরোপকে আলোচনার বাইরে রেখেই এর সুরাহা করতে চাচ্ছেন, যার মধ্য দিয়ে কেবল ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি নতুন করে কী ধরনের সিদ্ধান্তে আসতে চাইছেন এটি একটি ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোকে অভিন্ন নীতিমালার আলোকে দেখে এলেও পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করেছে কিছুদিন আগে মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনের পর থেকে। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন আগ্রহের দিকটি হচ্ছে, তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের রক্ষণশীল দলগুলোর মধ্যকার নতুন জোট গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে গত ১৯ তারিখে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তিনি এবং প্রেসিডেন্ট পুতিন মিলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এই ঘটনা ইউরোপের জন্য একটি আকস্মিক ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিষয়, যা ইউরোপের নিরাপত্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িতএমন একটি জরুরি সিদ্ধান্তের আগে তিনি একতরফাভাবে তাঁর নিজের মতামত অন্যদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন বলে ইউরোপের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের দেশগুলো ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংকটের বাইরেও নতুন করে রাশিয়ার উত্থানের মধ্য দিয়ে গোটা ইউরোপের নিরাপত্তাহীনতার বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করার পর ইউক্রেনের নিরাপত্তার দিকটি ইউরোপকেই সামলাতে হবে। এ ক্ষেত্রে নতুন কোনো মার্কিন সহায়তা দেওয়া হবে না। এই মুহূর্তে ইউরোপ এ ধরনের বিষয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত নয়। সেই সঙ্গে ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হবে নাএমন মার্কিন সিদ্ধান্ত ইউরোপের ওপর এক ধরনের চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়, যা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপের দূরত্ব সৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়। 

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য ইউরোপকে হতাশ করেছে এবং নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলেছে। ভ্যান্স কোনো ধরনের রাখঢাক না করেই ইউরোপকে দায়ী করেছেন এই বলে যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের দেশগুলো বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে রোধ করেছে। ভ্যান্সের এই বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সম্পৃক্ততা ছাড়াই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ থেকে ইউরোপের কাছে এটিই দৃশ্যমান হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে, যেখানে ইউরোপের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে নতুন করে বিনির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলোর কোনো ভূমিকা থাকবে না। 

সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের উদ্যোগ এবং রিয়াদে রুশ-মার্কিন দুই দেশের মধ্যকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যকার আসন্ন বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন মেরুকরণ আসতে যাচ্ছে বলে মনে করছে অনেকেই। পরিস্থিতি যখন এমন অবস্থায়, এশিয়ার দুই শক্তি ভারত ও চীন নতুন এবং পরিবর্তিত এক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের উত্থানের প্রবল সম্ভাবনা দেখছে। তারাও এটিই ভাবছে যে ট্রাম্পের সঙ্গে পুতিনের এই সখ্যের মধ্য দিয়ে রাশিয়াই দিনশেষে লাভবান হবে এবং চীন ও ভারতের নতুন করে উত্থান ঘটবে। বিষয়গুলো যে ট্রাম্প একেবারে অনুধাবন করছেন না তা নয়, তাঁর পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট না হলেও এটি ভাবতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে দুর্বল করে রাশিয়াকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে না।

বিষয়টি এমন হতে পারে যে পুতিনের সঙ্গে সমঝোতার মধ্য দিয়ে তিনি ইউক্রেনের ভূমিতে রাশিয়ার আক্রমণকে বন্ধ করতে সচেষ্ট হবেন এবং বিনিময়ে তিনি ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদান থেকে বিরত রাখতে রাশিয়াকে নিশ্চয়তা দেবেন। প্রশ্ন আসতে পারে, ইউক্রেনের মতো একটি সার্বভৌম দেশে মার্কিন প্রশাসনের এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা কিভাবে সম্ভব। বিষয়টি খুব স্বাভাবিক, এরই মধ্যে জেলেনস্কির নিজ পদে থাকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। হয়তো মার্কিন প্রশাসন খুব শিগগির তাঁকে পদ থেকে সরাতে সব ধরনের তৎপরতাই শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে মার্কিন পছন্দের একজন এই পদে অভিষিক্ত হতে পারেন। আর ইউরোপকে ইউক্রেনের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব এবং সেই সঙ্গে আর্থিক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা বজায় থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় পাওনা হবে দেশটির বিরল খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, যার মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রত্যাশিত আর্থিক অর্জনের বিষয়টির নিশ্চয়তা ঘটতে পারে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

mfulka@yahoo.com

 

মন্তব্য

বসবাসযোগ্য সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে

    ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
শেয়ার
বসবাসযোগ্য সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে

উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী দেশ বিভাগের সময় বাঙালিদের চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, এরা বড়ই ষড়যন্ত্রপ্রিয়। অর্থাৎ সুযোগ পেলেই এরা একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। একই সঙ্গে এরা কর্মসংগঠনে বা কর্মসম্পাদনে অদক্ষ ও দুর্বল। জার্মানিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী কর্মসূত্রে বেশ কিছুদিন ভারতবর্ষে অবস্থান করেছিলেন।

তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ থেকে এ দেশের মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কাজেই এ দেশের মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। উল্লিখিত সমাজবিজ্ঞানীর এই মন্তব্য হয়তো ঢালওভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কিন্তু তাই বলে একে উপেক্ষা করা যাবে না। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় যেসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, তার মধ্যে উল্লিখিত সমস্যা দুটি অন্যতম।

ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশের মানুষের চরিত্র এবং আচার-আচরণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমধর্মী। এরা যেমন কাউকে সহজে আপন করে নিতে পারে, তেমনি সম্পর্কের সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে তাদের মাঝে হিংস্রতার উদ্ভব ঘটতে পারে। অতীত সম্পর্ক ভুলে গিয়ে তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতে পারে। একবার সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলাদেশে ভ্রমণে এসে নদীতে জোয়ার-ভাটা প্রত্যক্ষ করে নাকি মন্তব্য করেছিলেন, যে দেশের নদীর পানি সকালে একদিকে এবং বিকেলে অন্যদিকে ধাবিত হয়, সে দেশের মানুষের মন বোঝা বড়ই কঠিন।

এই অঞ্চলের মানুষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অত্যন্ত উদার হলেও অনেকের মাঝেই স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যেকোনো পন্থা গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

বসবাসযোগ্য সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যেআজকাল অনেকের মুখে শোনা যায়, দেশটি বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আগের সেই দিনকাল আর নেই। মানুষের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টি এবং রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব দেখা দিয়েছে। দেশের বাস্তব পরিস্থিতিই সম্ভবত মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবে জনকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গেছে। আগে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সামাজিক পুঁজির বিকাশ লক্ষ করা যেত। এখন তা অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। সামাজিক পুঁজি বলতে এমন একটি অবস্থাকে আমরা বুঝে থাকি, যেখানে একজনের প্রয়োজনে আরেকজন নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনা না করেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত। অতীতে আমরা দেখেছি, যখন কোনো কৃষকের জমিতে ফসল তোলার সময় হতো, তখন এলাকার অনেকেই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ফসল তুলে দিত। রাস্তা নির্মাণের প্রয়োজন হলে সরকারের প্রতি তাকিয়ে না থেকে নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে রাস্তা নির্মাণ করত। এ ধরনের প্রবণতা এখন খুব একটা প্রত্যক্ষ করা যায় না। আগেকার দিনের মতো সামাজিক বন্ধন চোখে পড়ে না। বরং উল্টো হানাহানি, রাহাজানি প্রাধান্য পাচ্ছে গ্রামীণ সমাজে। মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।

একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল মূলত গ্রামকেন্দ্রিক। জিডিপির ৯০ শতাংশই আসত গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। এখন এই অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। কয়েক বছর আগের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটছে। একসময় মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশের মতো বাস করত গ্রামে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে কর্মসংস্থানের জন্য আসত, তারাও সপ্তাহান্তে গ্রামে পরিবারের কাছে ফিরে যেত। কিন্তু এখন সেই অবস্থা আর নেই। কেউ একজন গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন করলে সে আর গ্রামে ফিরে যেতে চায় না। বর্তমানে শহর হয়ে উঠেছে অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের মতো বাস করে শহরে। আর জিডিপির ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয় শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভরকেন্দ্র দ্রুত গ্রাম থেকে শহরে সরে আসছে। অন্যদিকে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক রূপান্তর ঘটছে। আগে যারা প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল, তারা ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু পরিবারে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে একসময় যারা একেবারেই দরিদ্র ছিল, তাদের অনেকেই এখন দ্রুত নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উন্নীত হচ্ছে। এর পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে বিদেশগামিতা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জনশক্তি রপ্তানি খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি খাত। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে যাঁরা কর্মসংস্থানের উপলক্ষে বিদেশে গমন করেন, তাঁদের বৃহদংশই গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা। তারা যেকোনোভাবেই হোক, জমিজিরাত বিক্রি করে বিদেশে চলে যাচ্ছে। একসময় প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দিয়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখছে। যে পরিবার থেকে কেউ একজন বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গমন করেন, তাঁর পরিবারের প্রাথমিক কাজ হয়ে দাঁড়ায় প্রেরিত রেমিট্যান্স দিয়ে জমি ক্রয় এবং বাড়ি নির্মাণ। দেশে আসা রেমিট্যান্স শিল্পে বা অন্য কোনো বিকল্প আয়বর্ধক কাজে ব্যবহার করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি আরো চাঙ্গা হতো।        

কয়েক বছর আগে একটি বিদেশি সংস্থার গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিন দশক আগেও বাংলাদেশের ১২ শতাংশ পরিবার মধ্যবিত্ত ছিল। এখন তা ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই উত্থানের পেছনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ে শুধু যে মধ্যবিত্ত পরিবারের হার বেড়েছে তা নয়, তাদের ক্রয়ক্ষমতা বা ভোগ ব্যয়ের সামর্থ্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এই প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। শহুরে জীবনে যেসব উপকরণ ব্যবহৃত হতো, তা এখন গ্রামীণ এলাকায়ও সম্প্রসারিত হয়েছে। কালার টিভি, ফ্রিজ, এমনকি এসি এখন গ্রামীণ পরিবারেও ব্যবহার করতে দেখা যায়।

তবে বিগত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে শহুরে জীবনের মতো গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাও কলুষিত হয়েছে। চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, খুন-জখম, রাজনৈতিক হানাহানি এখন শহরের মতো গ্রামীণ জীবনেও সঞ্চারিত হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে যাঁরা গ্রামে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন, তাঁদের সবাই সম্মান করত। এখন যাঁরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, তাঁরা জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হন না। ভোট কারচুপির মাধ্যমে তাঁরা ক্ষমতা দখল করে নেন। নির্বাচিত হয়েই তাঁরা চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। গ্রামীণ সমাজে এখন টাউট-বাটপাড়ের উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। গ্রামীণ এলাকায় প্রতারক শ্রেণি নানাভাবে সাধারণ মানুষের সম্পদ ও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

শুধু গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায়ই নয়, পুরো দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এক ধরনের কলুষতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের প্রভাবশালী একটি শ্রেণির অনৈতিক কর্মকাণ্ড যেকোনো বিবেকবান মানুষকেই ব্যথিত করবে। এখন যেন অর্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিভাবে সেই অর্থ উপার্জিত হচ্ছে, তা ভেবে দেখার কোনো অবকাশ কারো নেই। সবাই অর্থের পেছনে ছুটছে। একজন পণ্ডিত ব্যক্তি বলেছিলেন, অর্থ হচ্ছে সেকেন্ড গড বা দ্বিতীয় প্রভু। কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করলে অনুধাবন করা যায়, এই প্রবাদ বাক্যটি যথার্থই ছিল। দুর্নীতির বিষবাষ্প শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম এলাকায়ও কেউ একজন জনপ্রতিনিধি হতে পারলে তাঁর পক্ষে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া বিচিত্র নয়। তাঁরা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য যেকোনো ঘৃণ্য পন্থা অনুসরণ করতেও দ্বিধা করেন না।

সমাজব্যবস্থার এই অধঃপতনের জন্য আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বহুলাংশে দায়ী। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি পরিশীলিত এবং মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা। মানুষের মনোজগতে বিদ্যমান মানবিক গুণাবলিকে জাগিয়ে তোলা, যাতে তারা সমাজের উন্নয়নে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেটি করতে পারেনি। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে দক্ষ এবং কর্মক্ষম মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ তৈরি করা, কিন্তু সেটি হচ্ছে না। আমরা প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীকে শিক্ষা সমাপন করে বের হতে দেখছি। কিন্তু তাদের মধ্যে কজন আছে, যারা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত? বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম যাতে সত্যিকার শিক্ষিত এবং মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠতে না পারে, সে জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চক্রান্ত করা হয়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মোটেও কর্মমুখী নয়। একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও নিশ্চিত হতে পারছে না সে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে কি না। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকার কারণে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বিদেশ গমনের প্রবণতা বাড়ছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা উচ্চশিক্ষিত অহমিকাপূর্ণ বেকার তৈরি করছে মাত্র। যারা দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না, তারা বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং অনেকেই সাধারণ মানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুুষ অত্যন্ত সৃজনশীল ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু তারা প্রতিভা বিকাশের মতো উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না।

সমাজে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতাও অনেকাংশে দায়ী। রাজনীতিবিদদের অনেকেই ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতি এবং অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত। সুনাগরিক হতে হলে একজন মানুষকে সৎ এবং মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন দেশপ্রেমিক হতে হবে। কিন্তু আমরা শিক্ষার্থীদের মাঝে এই গুণাবলি সঞ্চারিত করতে পারছি না। সর্বস্তরে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণ, রাজনৈতিকীকরণের কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। সুনাগরিক হওয়ার শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবার থেকে দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমে সেই গুণাবলিকে আরো পরিশীলিত এবং ব্যাপৃত করতে হবে। বর্তমানে যারা তরুণ প্রজন্ম, তাদের মধ্যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তারা প্রমাণ করেছে কিভাবে স্বৈরাচারী সরকারের মসনদ উল্টে দিতে হয়। এই প্রজন্মকে যদি আমরা নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তারা ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারবে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে আমাদের কি তেমন কোনো পরিকল্পনা আছে?

দেশে যদি সুনাগরিক গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা যেত, তাহলে দুর্নীতির মাত্রা অনেকটাই হ্রাস পেত। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সত্যিকার দেশপ্রেমিক একজন মানুষ কখনোই দুর্নীতি করতে পারে না। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে আমরা প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করছি, কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠছে তার খোঁজ রাখছি না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষের সুকুমারবৃত্তিকে জাগ্রত করে তাকে একজন আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

দেশ অনেক দিন গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে ছিল। ছিল স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অধীনে। গণতন্ত্রহীন সমাজে সুকুমারবৃত্তির যথাযথ বিকাশ ঘটে না। মানুষের মাঝে হানাহানি, প্রতারণা এবং দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের সামাজিক অবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে কলুষিত করা হয়েছে। সমাজব্যবস্থা এখন দুর্নীতি আর অনাচারের কবলে পতিত হয়েছে, যার পরিণতি এখন আমরা ভোগ করছি। ভবিষ্যতেও অনেক দিন আমাদের স্বৈরাচারের কুফল ভোগ করতে হবে। এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উন্নয়নের জন্য মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো। আর এটি সম্ভব একমাত্র উপযুক্ত জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে নৈতিক শিক্ষা বিস্তার শুরু করতে হবে। সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করা, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ তার ন্যায়সংগত অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। এভাবেই একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী সমাজ বিনির্মাণে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ