অস্টিওপোরোসিসকে হাড়ের ক্ষয়রোগ বলে থাকে অনেকেই। আসলে কিন্তু রোগটি ডিজেনারেটিভ বা শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন সম্পর্কিত, ক্ষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ‘অস্টিও’ শব্দটির অর্থ হাড়, ‘পরোসিস’ অর্থ পোরস বা ছিদ্র। যাদের অস্টিওপোরোসিস দেখা দেয়, তাদের হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়।
অস্টিওপোরোসিস : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি
- বৃদ্ধ বয়সে দেখা দেয় হাড়ের দুর্বলতা, অল্পতেই হতে পারে ফ্র্যাকচার। রোগটিকে মেডিক্যাল ভাষায় বলে অস্টিওপোরোসিস। এর নেই কোনো স্থায়ী সমাধান, রোগের প্রকোপ কমিয়ে জীবনযাপনের মান উন্নতিই চিকিৎসার লক্ষ্য। এই রোগ কেন হয় ও প্রতিকার কী—জানাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন

সাধারণত বয়স ৫০ বছর পার হওয়ার পর নারী ও পুরুষ উভয়েরই অস্টিওপোরোসিস দেখা দিতে শুরু করে।
হাড়ের ওপর প্রভাব
হাড়ের দুটি অংশ, কমপ্যাক্ট বোন এবং স্পঞ্জি বা ট্রেবাকুলার বোনের সমন্বয়ে সেটি গঠিত হয়। অস্টিওপোরোসিস হলে হাড়ের ওপরের আবরণ বা কমপ্যাক্ট বোনের পুরুত্ব্ব কমে যায়, পাশাপাশি স্পঞ্জি অংশটির ছিদ্র বেড়ে যায়, ফলে কমে যায় ঘনত্ব।
কারণ
সুস্থ দেহে প্রতিনিয়ত হাড়ের কোষগুলো পুরনো ও ক্ষতিগ্রস্ত হাড় সরিয়ে নতুন করে হাড় তৈরি করে। অস্টিওপোরোসিসের মূল কারণ, হাড়ের গঠন ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। সেটির কয়েকটি প্রধান কারণ হচ্ছে—
বয়স: প্রত্যেক মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তখনই অস্টিওপোরোসিস রোগের শুরু।
হরমোনগত পরিবর্তন: মেনোপজ পার হওয়ার পর নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। তখন অস্টিওপোরোসিসের লক্ষণ নারীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যায়।
বংশগত: যাদের বংশে অস্টিওপোরোসিস রোগের ইতিহাস আছে, তাদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি।
খাদ্যাভ্যাস: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার কম খেলে দেখা দিতে পারে হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব। এর ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যায়।
জীবনযাপন: ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করলেও অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।
লক্ষণ
এই রোগের লক্ষণগুলো শুরুতে চিহ্নিত করা কঠিন। কেননা প্রথমে রোগটির তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না, সম্ভাব্য যেসব উপসর্গ দেখা যেতে পারে, সেসব খুবই সাধারণ যেমন—শরীরে ব্যথা বা চাপের অনুভূতি। রোগীদের মনে সেটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে রোগের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে লক্ষণগুলোও প্রকট হয়। রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে, যেমন—
♦ ঘাড়, কোমর ও মেরুদণ্ডে প্রতিনিয়ত ব্যথা অনুভূত হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় পরিণত হতে পারে।
♦ পেশির ব্যথা বা পেশিতে দুর্বলতা।
♦ মেরুদণ্ডের হাড় সংকুচিত হয়ে উচ্চতা কমে যাওয়া বা কুঁজো হয়ে যাওয়া।
♦ পাঁজরের হাড় নিচের দিকে ঝুলে পড়া।
♦ ছোটখাটো আঘাতে হাড় ভেঙে যাওয়া।
অন্যান্য কারণে ঝুঁকিতে যারা
যাদের হাড় ভাঙার ইতিহাস আছে, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় অথবা খিঁচুনির ওষুধ সেবন করেছে, তাদের এ রোগের ঝুঁকি সমবয়সীদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি। এ ছাড়াও যাদের বাতজনিত রোগ, থাইরয়েড ও প্রজনন গ্রন্থির সমস্যা, খাদ্যনালি থেকে পুষ্টি ও ভিটামিন শোষণে সমস্যা আছে—তাদের অপরিণত বয়সেও অস্টিওপোরোসিস দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা
অস্টিওপোরোসিস শনাক্ত হলে ভয়ের কারণ নেই। সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। সে জন্য যা প্রয়োজন—
♦ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ।
♦ বায়োফসফোনেটস জাতীয় ওষুধ ব্যবহার, যা হাড়ের ক্ষয় কমায়।
♦ নারীদের জন্য হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি।
♦ শারীরিক থেরাপি, ব্যায়াম ইত্যাদি।
প্রতিরোধে করণীয়
অস্টিওপোরোসিস প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। সচেতনতা এবং সঠিক জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে জেনে নিন।
সুষম খাবার গ্রহণ: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যেমন—দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ ইত্যাদির পাশাপাশি ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত।
ভিটামিন ডি গ্রহণ : ভিটামিন-ডি’র অভাব পূরণে প্রতিদিন কিছু সময় সূর্যের আলোতে থাকুন। এ ছাড়াও নির্দিষ্ট পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ, মাশরুম ও ডিমের কুসুম ইত্যাদি খেতে হবে। ভিটামিন ডি’র ঘাটতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।
নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত কায়িক শ্রমসহ কিছু শরীরচর্চা, যেমন—দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালনা ইত্যাদি নিয়মিত করা উচিত। কসরতগুলো সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট ধরে করুন।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন: ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করুন, এসব হাড় ক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যারা ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে পড়ে, তাদের নিয়মিত হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করা উচিত জানার জন্য যে তারা অস্টিওপোরোসিসে ভুগছে কি না।
ওষুধ ও পরামর্শ: প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে। হাড় ক্ষয় রোধে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধও কার্যকর।
অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধযোগ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি রোগ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ করলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। সময়মতো সচেতন হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে সুস্থ ও কার্যকর জীবনযাপন করা সম্ভব। সুতরাং হাড়ের যত্ন নিন।
পরামর্শ দিয়েছেন: অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের প্রধান, ল্যাবএইড হাসপাতাল লিমিটেড
অনুলিখন : আতাউর রহমান
সম্পর্কিত খবর

কিডনি পরীক্ষায় অবহেলা নয়
- অনেক রোগীর কিডনি বিকল হয়ে গেলেও কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অন্যান্য রোগের সঙ্গে কিডনি সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণও মিলে যেতে পারে। যে ধরনের সমস্যায় কিডনি পরীক্ষা জরুরি, তা জানাচ্ছেন কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ

নীরবে নিভৃতেও কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। কোনো বড় লক্ষণ ছাড়াই কিডনিতে দেখা দিতে পারে প্রাণঘাতী সব রোগ, এমনটি অনেকেরই অজানা। ডাক্তারের কাছে রোগীরা এমন অবস্থায় উপস্থিত হন, যখন আর ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই সময় থাকতেই কিডনির অবস্থা জেনে নেওয়া জরুরি।
ডায়াবেটিস
কিডনির বড় শত্রু অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। কিডনির ওপর এ রোগটির প্রভাব এতটাই প্রকট যে প্রতি তিনজন ডায়াবেটিক রোগীর মধ্যে একজনই কিডনি বিকল হওয়ার শিকার।
উচ্চ রক্তচাপ
এ রোগেও কিডনির বড়সড় ক্ষতি হয়।
হৃদরোগ
হূিপণ্ডের সমস্যায় দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে চাপ পড়ে। সেটি বিকল হলে কিডনি বিকল হওয়ারও মারাত্মক ঝুঁকি দেখা দেয়।
রক্তনালির অসুখ
বিভিন্ন অঙ্গের রক্তনালিতে চর্বি জমা হতে থাকলে, সেসব অঙ্গ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। যেমন—মস্তিষ্কের রক্তনালিতে চর্বি জমে গেলেও হতে পারে স্ট্রোক। পায়ের রক্তনালিতে এমনটি হলে হাঁটার সময় তীব্র ব্যথা হতে পারে। রক্তনালির সমস্যায় ভুগছেন যাঁরা, তাঁরা কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।
ইউরোলজির সমস্যা
বেশ কিছু কারণে প্রস্রাব বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রোস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে অনেক সময় প্রস্রাব বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া স্নায়বিক দুর্বলতার কারণেও প্রস্রাবের প্রবাহে সমস্যা হতে পারে। কিডনি থেকে প্রস্রাব বের হওয়ার পথে পাথর জমে গেলেও প্রস্রাবের বেগে হতে পারে বিপত্তি। এগুলো সবই কিডনিস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি। এ সমস্যায় ভুগছেন যেসব রোগী, তাঁদের কিডনি কার্যক্রমও নিরীক্ষা করা দরকার।
ওষুধ
বেশ কিছু ওষুধ কিডনির শত্রু। এর অপরিমিত ব্যবহার কিডনির সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেদনানাশক ওষুধ বা পেইনকিলার। এ ছাড়া কিছু ওষুধ কিডনির ক্ষতি করে; যেমন—লিথিয়াম, সাইক্লোস্পোরিন, কিছু ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক এবং উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ। এসব ওষুধ গ্রহণের সময় কিডনি কার্যক্রম পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কিছু ব্যাধি
সিস্টেমিক লিউপাস ইরিথেমাটোসাস (এসএলই) নামের বাত রোগেও বেশ ক্ষতি হয় কিডনির। এ ছাড়া মাল্টিপল মায়ালোমাসহ আরো কিছু রোগে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পায়ে পানি এলে
চিকিৎসকদের ভাষায় এ লক্ষণের নাম ইডিমা। এমনটি দেখা দেওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয় ইডিমা। শরীরের কোথাও পানি জমে গেলে দ্রুত কিডনি পরীক্ষা করা খুবই জরুরি।
লেখক : ক্লাসিফায়েড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, সিএমএইচ, বরিশাল

রোজাদারের দাঁত ও মুখের যত্ন
ডা. অনুপম পোদ্দার

রমজান মাসে প্রাত্যহিক রুটিন বদলে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে খাবার ও পানি গ্রহণ না করার কারণে মুখের লালা উৎপাদন কম হয়। এর ফলে মুখগহ্বর ও জিহ্বা শুকিয়ে যায়। মুখের অভ্যন্তর শুষ্ক থাকায় তৈরি হয় দুর্গন্ধ।
সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ ও মেসওয়াক ব্যবহার
সাহরি ও ইফতারের পর নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে। দাঁত, মাড়ি ও জিহ্বা ঠিকভাবে পরিষ্কার করার জন্য অন্তত দুই মিনিট ধরে ব্রাশ করতে হবে। ধর্মীয় দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মেসওয়াকের ব্যবহার।
ফ্লসিং
রাতের খাবার গ্রহণের পর দাঁত ব্রাশের পাশাপাশি ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে। ব্রাশ করলেও অনেক সময় দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যকণা ঠিকমতো পরিষ্কার হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ফ্লসিং।
মাউথওয়াশ ব্যবহার ও গার্গল
মাউথওয়াশ কেনার আগেই খেয়াল করতে হবে, সেটি অ্যালকোহলমুক্ত কি না। অ্যালকোহলমুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করলে মুখের শুষ্কতা কম হবে। হালকা কুসুম গরম পানি ও লবণ দিয়ে গার্গল করলেও মুখের ব্যাকটেরিয়া কমে যায়। অন্তত ৩০ সেকেন্ড মুখে রাখতে হবে মাউথওয়াশ, নইলে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যাবে না।
পর্যাপ্ত পানি পান
ইফতারের পর থেকে সাহরি পর্যন্ত প্রচুর পানি পান করুন। এ সময়ের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত আট থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। এতে মুখের শুষ্কতা কমে যাবে। চা ও কফি মুখের শুষ্কতা বাড়ায়। তাই যতটা সম্ভব এ ধরনের পানীয় কম পান করতে হবে। তবে যাদের পানি পান করা নিয়ে চিকিৎসকের বিধি-নিষেধ আছে, তা মেনে চলতে হবে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
মিষ্টান্নজাতীয় খাবার বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় মুখে দুর্গন্ধ বাড়ায়। যেসব খাবার পেটে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি করে, সেসবও মুখের স্বাস্থ্য নষ্টের কারণ। অতিরিক্ত মিষ্টিযুক্ত ফলও সমস্যার কারণ হতে পারে। এসব খাবারের বদলে বেশি করে রসালো ফলমূল; যেমন—মাল্টা, তরমুজ, পেঁপে ও সবুজ শাক-সবজি খাওয়া যেতে পারে। এতে মুখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় থাকবে।
জিহ্বা ও মাড়ির যত্ন
দাঁত ব্রাশ করার সময় সঙ্গে সঙ্গে জিহ্বা পরিষ্কার করুন। কারণ জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া জমে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি মাড়ি ম্যাসাজ করুন। এতে মাড়ি সতেজ ও সুস্থ থাকবে।
লেখক : অধ্যক্ষ, খুলনা ডেন্টাল কলেজ

নির্যাতিতা নারীর মানসিক স্বাস্থ্য
- যৌন নিপীড়ন, নারী নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এ ধরনের আঘাতের পর দেখা দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি ভয়াবহ মানসিক সমস্যা। সঠিক চিকিৎসা না পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন না বেশির ভাগ নারী। নির্যাতিতার মনে যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে ও তার চিকিৎসার বিস্তারিত জানাচ্ছেন ডা. মুনতাসীর মারুফ

ঘরে-বাইরে প্রতিনিয়ত নানাভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন। নারীর সঙ্গে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংস ঘটনা ধর্ষণ। এ জঘণ্য হামলার শিকার নারীরা কেবল শারীরিকভাবেই জখম ও ক্ষতিগ্রস্ত হন, তা নয়।
চরম এ সহিংসতাই যে একমাত্র যৌন নিপীড়ন, তা নয়। ইভ টিজিং, অনলাইনে মেসেজ বা কমেন্টের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, শারীরিক লাঞ্ছনা বা মতের বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্কের মতো ঘটনাও মনে তীব্র ছাপ ফেলতে পারে।
পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার
যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার নারীরা পরবর্তী সময়ে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার (সংক্ষেপে পিটিএসডি) রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। পিটিএসডি আক্রান্ত নারীর মনে আঘাতের ভয়ংকর স্মৃতি বারবার ফিরে আসে। ধর্ষকের চেহারা বা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনো শব্দ, দৃশ্য বা আলোচনা তাঁর মনে আকস্মিকভাবে জাগিয়ে তোলে সেই দুঃসহ স্মৃতি।
যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে অনেকেই দুঃসহ পরিস্থিতিটি মনে করিয়ে দিতে পারে—এ ধরনের ঘটনা, ব্যক্তি বা আলোচনা এড়িয়ে চলেন। মানুষের সঙ্গ, বিশেষত পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা বা কথাবার্তা কমিয়ে দেন বা পুরোপুরি বন্ধ করেও দিতে পারেন। নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশে অক্ষম হয়ে পড়েন অনেকে। অনেকেই ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যান অজান্তেই।
বিষণ্নতা ও উদ্বেগ
বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারেন যৌন নির্যাতনের শিকার নারী। দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকে এবং দৈনন্দিন কাজে উৎসাহ বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আনন্দের অনুভূতি, ঘুম, খাওয়ার রুচি, মনোযোগ, চিন্তা ও কাজের গতি কমে যায়। অনেকে নিজেকে ধর্ষণ থেকে রক্ষা করতে না পারার হতাশায় অথবা ধর্ষণের জন্য নিজেকেই দায়ী ভেবে অপরাধবোধে ভোগেন। উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত নারীরা অনেক বিষয় নিয়েই অস্থিরচিত্ত, উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত থাকেন। বাড়ির ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে বাড়ির বাইরে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজে, অন্য কারো দুঃসংবাদে, এমনকি নিজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন বিষয়াবলিতেও অতিরিক্ত উদ্বেগে আক্রান্ত হন। এর সঙ্গে শারীরিক বিভিন্ন উপসর্গও দেখা দিতে পারে; যেমন—মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা কাঁপা, খাওয়ায় অরুচি, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া প্রভৃতি।
মাদকাসক্তি
মানসিক যন্ত্রণা ও চাপ থেকে মুক্তি পেতে বা দুঃসহ স্মৃতি সাময়িকভাবে ভুলে থাকতে কেউ কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ঘুমের ওষুধ বা অন্যান্য মাদক গ্রহণ করেন। মানসিক চাপ মোকাবেলার চরম ক্ষতিকর কৌশল এটি। এতে মানসিক যন্ত্রণা সাময়িক উপশম হলেও মাদকে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। মাদকাসক্তির ফলে নানা শারীরিক-মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা উল্টো সৃষ্টি করে বাড়তি জটিলতা।
আত্মহত্যা প্রবণতা
যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হওয়ার ফলে সৃষ্ট অসহায়ত্ব ও বিষণ্নতা, পাশাপাশি অবর্ণনীয় মানসিক ও সামাজিক চাপ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নিরাপত্তাহীনতা, আতঙ্কবোধ, সামাজিক গঞ্জনা, বিচারহীনতা বা বিচারপ্রক্রিয়ায় সৃষ্ট হতাশা, বৈষম্য ও অসহায়বোধ থেকে মুক্তি পেতে অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেন।
আত্মক্ষতি বা সেলফ হার্ম
অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে না নিলেও নিজের ক্ষতি করেন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা থেকে শুরু করে শরীরের বিভিন্ন অংশে কাটা-ছেঁড়া করা বা পুড়িয়ে দেওয়ার নজিরও দেখা যায়।
পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব
পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, বিশেষত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনীহা ও জড়তা অনুভব করেন অনেক ভুক্তভোগী। সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। অন্যদিকে আক্রান্ত নারী তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের যথোপযুক্ত বিচার না পেলে পরিবার বা সমাজকে অবচেতন মনে দায়ী ভাবেন, যা আরো বেশি করে তাঁকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না ভুক্তভোগীরা।
চিকিৎসা
যৌন নির্যাতনের শিকার নারীকে তাঁর চিন্তা-ভাবনা ও যথাযথ আবেগ প্রকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। সামাজিক ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে তাঁর নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করতে হবে। মানসিক চাপ মোকাবেলা ও খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, পিটিএসডিসহ যেকোনো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে।
উৎকণ্ঠাবিনাশী ও বিষণ্নতারোধী ওষুধ এবং বিশেষ কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির সমন্বয়ে আক্রান্ত নারীর চিকিৎসা করা হয়। গ্রুপ থেরাপির মাধ্যমে রোগীর মাঝে এই বিশ্বাস জন্মে যে এই দুর্যোগে তিনি একা নন। তাঁর মতো ক্ষতিগ্রস্ত আরো অনেকেই আছেন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিকটজনদের বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
কমিউনিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি বিভাগ
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট