তিনি বিমানবন্দর ছেড়ে যেতে চাননি, কারণ ফ্রান্সে ঢুকতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পুরো ফ্রান্সে এই বিমানবন্দরই একমাত্র জায়গা যেখানে তিনি নিরাপদ। এয়ারপোর্টের বসার বেঞ্চ, সেখানকার খাবারের দোকান আর টার্মিনালের কর্মচারীরা হয়ে ওঠেন তার নিত্যসঙ্গী।
এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা, মাইকের ঘোষণা, যাত্রীদের কোলাহল— এই সবকিছুর মধ্যেই মেহরান কাটিয়েছেন তার প্রতিদিনের জীবন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠতেন, ওয়াশরুমে যেতেন, এবং তারপর নাস্তার জন্য ম্যাকডোনাল্ডসে বসতেন।
দুপুরের খাবারও সেখানেই খেতেন।
কিন্তু এত বছর ধরে তার খরচ চলল কীভাবে? বিমানবন্দরের কর্মচারীরা তাকে খাবারের জন্য মিল ভাউচার দিতেন, যা দিয়ে তিনি প্রতিদিনের খাবার কিনতেন। বাকি সময় তিনি ডায়েরি লিখতেন— প্রতিদিন কী খেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, এমনকি সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলিও সেখানে লিখে রাখতেন।
এয়ারপোর্টের ডাক্তার আলফ্রেডকে বেশ কিছু এ-ফোর সাইজের কাগজ দিয়েছিলেন। আলফ্রেড তার দিনলিপি লেখার কাজে এসব কাগজ ব্যবহার করেছিলেন। প্রতিদিন সম্ভবত তিনি ২০ পাতার মতো লিখতেন। এসব করতে করতেই তার অনেক সময় চলে যেত। বাকি সময় তিনি বই পড়ে কাটাতেন। ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যাপারে তার অনেক আগ্রহ ছিল।
মেহরান কারিমি নাসেরি ১৯৯৪ সালে বিবিসিকে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, এয়ারপোর্টে বাস করার মধ্যে ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই আছে।
ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা খারাপ নয়। প্রতিদিনই আমি খুব সুন্দর সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। অল্প কিছু জায়গার মধ্যে আমি একাই ছিলাম। সুখী হওয়ার মতো খুব বেশি কিছু ছিল না। তবে আমি আশা করি যে সবকিছুই সুন্দরভাবে শেষ হবে।’
মেহরান এক সময় বুঝতে পারেন তার নাম উচ্চারণ করা ইংরেজি ভাষাভাষীদের জন্য কঠিন। একবার তিনি ব্রিটিশ দূতাবাসে নাগরিকত্বের জন্য চিঠি লেখেন। সেখান থেকে উত্তর আসে— ‘ডিয়ার স্যার’ অথবা ‘ডিয়ার আলফ্রেড’। এই চিঠি পাওয়ার পর তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন— ‘ব্রিটিশ সরকার আমাকে নাগরিকত্ব দেয়নি, কিন্তু নাইটহুড দিয়েছে!’
কেন তিনি যুক্তরাজ্যে যেতে চেয়েছিলেন?
১৯৪৫ সালে ইরানে জন্ম নেওয়া মেহরান জীবনের বেশ কিছু সময় বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে কাটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার মা ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। তাই তিনি যুক্তরাজ্যে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার কাছে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় বারবার তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়।
১৯৯৯ সালে ১১ বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর ফ্রান্স তাকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়। কিন্তু ততদিনে তিনি বিমানবন্দরের জীবনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি সেখানে থাকতে চাইলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, এমন একটা পরিস্থিতিতে কেউ ১১ বছর ধরে থাকতে পারে না। এটা একাধিক সরকারের ব্যর্থতার ফল।’
মেহরান কারিমি নাসেরি: সিনেমার চরিত্র হয়ে ওঠা
ব্রিটিশ লেখক এন্ড্রু ডনকিন ২০০৪ সালে তার এই আশ্চর্য কাহিনী সম্পর্কে জানতে পারেন। তার এই অদ্ভুত জীবনের ওপর ভিত্তি করে ২০০৪ সালে হলিউডে তৈরি হয় স্টিভেন স্পিলবার্গের সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন টম হ্যাঙ্কস। সিনেমার স্বত্ব বিক্রি করে মেহরান প্রায় ২.৭৫ লাখ ডলার পান। এরপর রাতারাতি তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন।
তার সম্পর্কে লেখক এন্ড্রু ডনকিন বলেন, ‘তিনি যেন হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ। বিমানবন্দর তার বাড়ি হয়ে গিয়েছিল। তার কাহিনী শুনে অনেকে দুঃখ পেয়েছে, আবার অনেকেই মনে করেছে তিনি ভাগ্যবান— কারণ তার সংসারের কোনো ঝামেলা নেই।’
তিনি বলেন, ‘একদিন আমি একটা ফোন পাই। ওপাশ থেকে বলা হলো— আপনি কি আজ বিকেল তিনটার মধ্যে শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে আসতে পারবেন? এমন একজন আছেন যিনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’ ডনকিন দ্রুত বিমানবন্দরে যান এবং সেখানেই পরিচয় হয় মেহরান কারিমি নাসেরির সঙ্গে।
এন্ড্রু ডনকিন বলছেন, মেহরান ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান এক ব্যক্তি। তার জীবনে তাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি এমন একটা বিমানবন্দরে ছিলেন যা সবসময় ব্যস্ত। সেখানে সারাক্ষণ শব্দ হচ্ছে, মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নানা রকমের দূষণের মধ্যে তাকে থাকতে হয়েছে। আশেপাশে যারা ছিল তাদের দিক থেকেও নানা ধরনের বিপদের ঝুঁকি ছিল। তাকে আমার খুব ভাল লেগেছিল। প্রথমবার সাক্ষাতের পর থেকেই আমাদের মধ্যে একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল বলে জানান লেখক ডনকিন।
শেষ পরিণতি
২০০৬ সালে তিনি বিমানবন্দর ছেড়ে যান। এরপর ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার জিনিসপত্র প্যারিসের গৃহহীনদের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে তিনি বিমানবন্দরকে এতটাই আপন করে ফেলেছিলেন যে, ২০২২ সালে আবার ফিরে আসেন শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে। কিন্তু ফিরেও খুব বেশিদিন বাঁচেননি। ১২ নভেম্বর, ২০২২ সালে সেখানেই মারা যান। তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।
এক বিরল জীবনের গল্প
মেহরান কারিমি নাসেরির জীবন যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক অদ্ভুত উদাহরণ। একদিকে তিনি ভাগ্যবান, কারণ তার কাহিনী সিনেমা ও বইয়ের মাধ্যমে অমর হয়ে গেছে। অন্যদিকে, তার জীবন একটি বিমানবন্দরের বেঞ্চে আটকে ছিল। একটি নো-ম্যানস ল্যান্ডে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রায় দুই দশক— যে জীবন কল্পনাকেও হার মানায়।
সূত্র : বিবিসি বাংলা