‘আমরা ১৬ জন। উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা, জেলা দায়রা জজ, শিক্ষকও রয়েছেন। ২০১০ সালে জমি কিনেছিলাম। মাটি ভরাট করে ঘর তুলে বাউন্ডারি ওয়ালও দিই।
‘আমরা ১৬ জন। উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা, জেলা দায়রা জজ, শিক্ষকও রয়েছেন। ২০১০ সালে জমি কিনেছিলাম। মাটি ভরাট করে ঘর তুলে বাউন্ডারি ওয়ালও দিই।
ওরা কারা—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ওদের নেতা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের ভাই রফিকুল আলম। সঙ্গে আরো আছে কুষ্টিয়া এলাকার সাবেক এক উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা, কসাই খলিল, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মহীউদ্দিন, সাদিক অ্যাগ্রোর মালিকের কয়েকজন নিকটাত্মীয়সহ অনেকে। মাহবুবউল আলম হানিফ নেপথ্যে থেকে এই দখলবাজির দেখভাল করতেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাও তাঁদের সঙ্গে জড়িত বলে শুনেছি।
ভুক্তভোগী অনেক জুলুম-নির্যাতনের কথা জানিয়ে বললেন, ‘আপনারা হয়তো আমার কথাগুলো রেকর্ড করে রাখছেন। কিন্তু অনুরোধ, আমার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করবেন না। তাহলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’
এ ধরনের অভিযোগ রাজধানীর কালশী, মাটিকাটা, পল্লবী ও ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন এলাকার অনেকের। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সাধারণ মানুষের ও সরকারি জমি, খাল জবরদখল করে নেওয়া আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জবরদখল : অভিযোগকারীদের বক্তব্য এবং প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনায় জানা যায়, হত্যাসহ সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি এবং সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জবরদখলের সঙ্গে জড়িত অনেককে সঙ্গে নিয়ে ওই সব এলাকায় একটি সংঘবদ্ধচক্র দীর্ঘদিন ধরে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড’ নামের একটি কম্পানির হর্তাকর্তা ওরা। ‘আরজেড বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামের আরেকটি কম্পানিতেও রয়েছে তারা। এরই মধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জবরদখল করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন সাক্কুর জমি দখল করার জন্য আর্টিকেলের লোকজন তাঁর জমির ওপর সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয় এবং চারপাশের বাউন্ডারি ভাঙচুর করে বলে খবর পাওয়া যায়। এ ধরনের জবরদখলের অভিযোগ অনেক।
‘আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড’ ও ‘আরজেড বিল্ডার্স লিমিটেড’ মাটি ভরাট করে প্লট বিক্রির পাশাপাশি ভবন নির্মাণের কাজও করে থাকে। প্রধান অফিস বনানীর ১৭ নম্বর রোডের রূপসা টাওয়ারে। আর সাইড অফিস ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ইসিবি-কালশী মেইন রোডের পাশে। রূপসা টাওয়ারের অফিসে গত সপ্তাহে দুই কর্মদিবসে গিয়েও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মেলেনি।
কম্পানিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ৬০ থেকে ৭০ ফুট চওড়া কালশী খালের একাংশ এবং সরকারি রাস্তা ও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের প্রায় ৩০ বিঘা সরকারি জমি দখল ও ভরাট করে তা প্লট আকারে বিক্রির অপচেষ্টা চলছে। এই সম্পত্তির মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। খালটি দখল ও ভরাট করায় ভাসানটেক, মিরপুর-১০, ১১, ১৪, পল্লবী ক্যান্টনমেন্ট, মানিকদী, মাটিকাটাসহ বিশাল এলাকার স্যুয়ারেজের এবং বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন বাধার মুখে। দখলদারদের প্রচারণা—এই খাল উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বসবাসের জন্য কালশী খালের পাশে সরকারিভাবে তিনটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ও বস্তিবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই খালটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড সরকারি এই খালের দুই পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ভরাটের কাজ শুরু করে। এ কাজ গত ৫ আগস্ট পর্যন্ত চালু ছিল। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, খালটির প্রস্থ ছিল ৭০ ফুট। কিন্তু ভরাটের ফলে বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ ফুট রয়েছে। আর্টিকেল স্ট্রাকচারকে সিটি করপোরেশন খাল ভরাট করতে নিষেধ করলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়। এলাকাবাসী গত বছর শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের কাছে এই খাল ও সরকারি জমি দখলমুক্ত করার জন্য লিখিত আবেদন জানায়। এর অনুলিপি পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পরও একই অবস্থা বহাল।
এসব বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান, এনডিসি গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু কালশী সরকারি খাল নয়, সব খাল সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। আগামীকাল (রবিবার) উত্তরের ১২টি খাল নিয়ে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক আছে। আমরা আপাতত বৃষ্টির পানি যাতে সহজে সরতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে চাচ্ছি। বর্ষা মৌসুমকে মাথায় রেখে আগে খালগুলো পরিষ্কার করব। পরে দখলমুক্ত করার বিষয়ে কাজ করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘খাল যেটুকু দখলমুক্ত আছে, তা পরিষ্কার করতে আমাদের কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। কিন্তু দখলমুক্ত করতে গেলে আইনের অনেক বিষয় থাকে। অনেক রকম জটিলতা পার করে সেটি করতে হয়। তাই আমরা পরিষ্কার করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
কম্পানির হর্তাকর্তা যাঁরা : আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল আলম চুন্নু আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের বড় ভাই। কম্পানিতে তাঁর শেয়ার দুই হাজার ৭০০টি। ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি পলাতক বলে জানা যায়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ধারণা, কাগজে-কলমে না থাকলেও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফই আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের মূল নিয়ন্ত্রক ও সুবিধাভোগী। তাঁর সঙ্গে সরকারের সাবেক ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাও রয়েছেন।
কম্পানির পরিচালক (সেলস) তরিকুল ইসলাম গত ২০ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠের কাছে দাবি করেন, ‘রফিকুল আলম মাঝেমধ্যে সাইড অফিসে আসেন। তবে বনানীর রূপসা টাওয়ারের অফিসে এখন কেউ যাচ্ছেন না।’ কম্পানির লোকজন কালের কণ্ঠকে জানান, তরিকুল ইসলামই কম্পানির চেয়ারম্যান ও এমডির সঙ্গে যোগাযোগ মাধ্যম। কম্পানির এমডির সঙ্গে কম্পানিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে কথা বলতে বা দেখা করতে চাইলে তরিকুল ইসলাম জানান, তিনি চেষ্টা করবেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপে ‘আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড’ ও ‘আরজেড বিল্ডার্স লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে এ সম্পর্কে কম্পানির এমডি বা তরিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তরিকুল ইসলাম মেসেজ পাঠান, ‘আমি কালকে (২২-০২-২৫) আপডেট দিচ্ছি।’ কিন্তু সে আপডেট আর পাওয়া যায়নি।
কম্পানির এমডির দায়িত্বে রয়েছেন মো. তারেক আল মামুন। কম্পানিতে তাঁর শেয়ার দুই হাজার ৫০০টি। তিনি কুষ্টিয়া দৌলতপুরের ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। বর্তমানে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সহযোগী একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টায় রয়েছেন বলে জানা যায়। হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া তারেকের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সাদিক অ্যাগ্রোর সঙ্গে ব্যবসা এবং তাঁর ব্যবসায় আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের ছেলে বিপ্লবের বিনিয়োগ রয়েছে বলেও জানা যায়। সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির ছবি দেখা যায়। সূত্র জানায়, একসময় তারেক আল মামুন দুজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার সন্তানদের গৃহশিক্ষক ছিলেন। ওই পরিচয় ব্যবহার করে এবং সে সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার মদদপুষ্ট হয়ে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। প্রাথমিকভাবে মো. তারেক আল মামুনের বিপুল সম্পদের যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তা বিস্ময়কর।
কম্পানির অন্যতম পরিচালক হচ্ছেন কসাই খলিল খ্যাত মো. খলিলুর রহমান। জানা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত খলিল বাউনিয়া বাঁধ বাজারে নিজ দোকানে কসাইয়ের কাজ করতেন। ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পদক। জন্ম শরীয়তপুরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর পিতা ইউনূস ভাণ্ডারী তেজগাঁও রেললাইন বস্তি ও ভাসানটেক বস্তিতে বসবাস করেন। পরে বাউনিয়া বাঁধ দুই হাজার ৬০০ বাস্তুহারা পরিবার পুনর্বাসন প্রকল্পে ব্লক-বিতে পৌনে এক কাঠার বাসা বরাদ্দ পায়। দরিদ্র পিতার সন্তান খলিলুর রহমানের উত্থান ১৬ বছর আগে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। বর্তমানে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক। পল্লবী থানায় কর্মরত ছিলেন এমন একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, খলিল ওই থানার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তিনি মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবেও পরিচিত এবং প্রতারণা, মারামারি, ধর্ষণসহ অনেক মামলার আসামি। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিছু মামলার ফাইনাল রিপোর্ট করিয়ে নিয়েছেন। খলিলের বিরুদ্ধে মামলার মধ্যে আছে বা ছিল, বাউনিয়া বাঁধ ডি-ব্লকের হাজেরা খাতুনকে জোর করে উচ্ছেদ করা। এ নিয়ে পল্লবী থানায় মামলা হয়, কলাবাগান বস্তির মো. আবুল কাশেমের বোনের ঘর দখল করতে গিয়ে ওই বোনের মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে পল্লবী থানায় মামলা হয়; খালেকুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি তাঁর জমিতে মাটি ভরাট করতে গেলে তাঁকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে পল্লবী থানায় খলিলের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়; বাউনিয়া বাঁধের ই-ব্লকের বাসিন্দা মো. আসলামের ছেলেকে চাঁদা না দেওয়ায় গুরুতর জখম করা হয়। এ বিষয়েও পল্লবী থানায় খলিলের বিরুদ্ধে মামলা হয়; খলিলের নেতৃত্বে কৃষক লীগের সভাপতি মাকসুদুল আলমের ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে খলিলের সন্ত্রাসী দল দখল করে নেয় মাকসুদুল আলমের জমি। এ বিষয়ে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানায় মামলা হয় (মামলা নম্বর-৮২/৮৮৯)। সেনপাড়া ও বাউনিয়া মৌজায় অনেক জমির মালিক খলিলের দাপটের কাছে জিম্মি। রয়েছে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। খলিল সর্বশেষ বাউনিয়া মৌজার বৈশাখী খামারের ভেতর বিভিন্ন মালিকের জমি জোরজবরদস্তি দখলে নিয়ে মাটি ভরাট করে বিক্রির পাঁয়তারা করছিলে বলে অভিযোগ রয়েছে। খলিলের বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অন্যের জমি নিজের দাবি করে বিক্রির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সেনপাড়া মৌজায় এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। সেনপাড়া মৌজায় ১৩ কাঠা জমির জাল কাগজ তৈরি করে দখলে রেখেছেন। প্রকৃত মালিকদের দাম দিয়েছেন ৪০ লাখ টাকা। আর পাঁচ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রির চেষ্টা করছেন। বাউনিয়া মৌজায় বৈশাখী খামারের ভেতর বিভিন্ন মালিকের জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে মাটি ভরাটের পর জাল কাগজ তৈরি করে জমি বিক্রির পাঁয়তারা করছেন বলে সূত্র জানায়। কোনো মালিক তাঁর জমির কাছে গেলে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেন খলিল। মালিকরা থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নেয় না। বর্তমানে ১০০ কোটি টাকার মালিক তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতেও সাহস করে না অনেকে। পুলিশকে ম্যানেজ করে কিছু মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, থানা থেকে এসব বিষয়ে অভিযোগ গ্রহণ করা হয় না। বলা হয়, জমির মামলা কোর্টে, আমাদের কাছে না। ৫ আগস্টের পর থেকে খলিলুর রহমানকে তাঁর নিজ এলাকায় এবং কম্পানির অফিসে দেখা যায়নি। কিন্তু তাঁর সহযোগীরা এলাকায় সক্রিয়।
কম্পানির আরেক ডিরেক্টর ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মহীউদ্দিন আহমেদ। আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডে তাঁর শেয়ারের সংখ্যা দুই হাজার ২০০টি। মহীউদ্দিনের বিরুদ্ধে গত বছর ২৭ মে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের জমি দখল করে কবলাসূত্রে মালিক হিসেবে মেজর জেনারেল পদবির একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার শাশুড়ির নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর ছোট ভাই পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ৫ আগস্টের পর থেকে মহীউদ্দিন আহমেদও লাপাত্তা।
সম্পর্কিত খবর
রাজধানীর মিরপুরে ১৮৬ একর জায়গা নিয়ে গঠিত জাতীয় চিড়িয়াখানা। ঈদের ছুটিতে এই বিনোদনকেন্দ্রে থাকে বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়। তাই এবারও চিড়িয়াখানায় ঈদের ছুটিতে ছয় দিনে (ঈদের দিন থেকে ৫ এপ্রিল) প্রায় আট লাখ দর্শনার্থীর সমাগম হবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এই বিশালসংখ্যক দর্শনার্থীর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতে চিড়িয়াখানাকে নতুন রূপে সাজানো হবে। বিশেষ করে নানা রঙে রাঙানো হবে চিড়িয়াখানার বেষ্টনী, দেয়াল ও বিভিন্ন গাছের গোড়া। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দর্শনার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া হবে ঈদের শুভেচ্ছাবার্তা।
এবারের ঈদে প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দর্শনার্থীদের জন্য চিড়িয়াখানা বরাবরের মতোই প্রস্তুত থাকবে। আমরা থানা পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীকে চিঠি দিয়েছি। তাদের সঙ্গে সোমবার নিরাপত্তা বিষয়সহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
ঈদে নতুন কোনো প্রাণী যুক্ত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন কোনো প্রাণী যুক্ত হচ্ছে না। তবে প্রায় বছরখানেক হলো বাঘের দুটি এবং জিরাফের দুটি শাবকের বয়স প্রায় এক বছর, এগুলো ডিসপ্লে করছি, অন্যান্য প্রাণীর পাশাপাশি এগুলো দেখতে পারবে দর্শনার্থীরা।
ঈদে দর্শনার্থীর সমাগম নিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে অনুমান করা যায়, ঈদের দিন প্রায় এক লাখ দর্শনার্থী আসে, এর পরের দুই দিন প্রায় দেড় লাখ করে, চতুর্থ দিন এক লাখের বেশি—এভাবে শনিবার পর্যন্ত (৫ এপ্রিল) সব মিলিয়ে আট লাখের মতো দর্শনার্থী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিরূপ আবহাওয়া থাকলে দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হতে পারে।
চিড়িয়াখানার পরিচালক আরো বলেন, ‘ঈদে চিড়িয়াখানার ভেতরে হকারের কোনো উৎপাত থাকবে না। ভেতরে এবং গেটের বাইরে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত টহল থাকবে, যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তথ্যকেন্দ্র থেকে দর্শনার্থীরা সেবা পাবে। তথ্যকেন্দ্রে স্টাফ নিয়েজিত থাকবে, যেন দর্শনার্থীদের সমস্যা হলে তাঁরা তত্ক্ষণাৎ সেবা দিতে পারেন। সব সময়ের মতো এবারও ঘুরতে আসা বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা থাকবে। এই চেয়ার পাওয়া যাবে চিড়িয়াখানার তথ্যকেন্দ্রে।’
আসন্ন ঈদের ছুটিতে উপদেষ্টা পরিষদের বেশির ভাগ সদস্য ঢাকায় থাকবেন জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ঈদের দীর্ঘ ছুটি হলেও অর্থনীতিতে কোনো স্থবিরতা আসবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি এবং অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা বলেন উপদেষ্টা।
এবার ঈদে দীর্ঘ ছুটি, অর্থনীতিতে কোনো স্থবিরতা দেখা দেবে কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘না, না, না,
অর্থনীতিতে কোনো স্থবিরতা আসবে না। সব কিছু সচল থাকবে।
বৈঠকের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ১১টি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
ভারতের ৫০ হাজার টন চাল আসছে : খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ভারত থেকে আরো ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল আমদানি করছে সরকার। এতে ব্যয় হবে দুই কোটি ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।
সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্য থেকে দুই কার্গো এলএনজি : দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোটেশনের মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে সিঙ্গাপুর থেকে এক কার্গো এবং যুক্তরাজ্য থেকে এক কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ব্যয় হবে এক হাজার ৩৬৬ কোটি ৮৭ লাখ ৮২ হাজার ৪০০ টাকা। প্রতি এমএমবিটিইউ ১৪.০৮ ডলার হিসাবে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি ক্রয়ে ব্যয় হবে ৬৭৫ কোটি ২৮ লাখ ৫৮ হাজার ১১২ টাকা।
রাশিয়া-সৌদি আরবের ৪১৮ কোটি টাকার সার আসছে : রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির আওতায় রাশিয়া ও সৌদি আরব থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানি করবে সরকার। এতে মোট ব্যয় হবে ৪১৮ কোটি ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ২০০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার জেএসসি থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার। প্রতি মেট্রিক টন সারের দাম ধরা হয়েছে ৩০৬.৩৭ মার্কিন ডলার। এদিকে মুন্সীগঞ্জে বিসিক কেমিকাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আগে কাজের পরামর্শক নিয়োগ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে ভেরিয়েশন প্রস্তাবসহ তিন ক্রয় প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ। এই তিন প্রস্তাবে ব্যয় হবে ২২৯ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৩৪ টাকা।
রাজধানীর ধানমণ্ডিতে গত বুধবার ভোরের দিকে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বাসায় ‘অভিযানের’ নামে ডাকাতি করতে যাওয়া দলটির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ওই বাসায় ডাকাতির আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মতো প্রস্তুতি নিয়েছিল ডাকাতদল। অনেকে সে সময় র্যাবের পোশাক পরা ছিল। কেউ কেউ নিজেদের ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দেয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলো ফরহাদ বীন মোশারফ, ইয়াছিন হাসান, মোবাশ্বের আহাম্মেদ, ওয়াকিল মাহমুদ, আবদুল্লাহ ও সুমন।
ডাকাতদল গ্রেপ্তারে সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ায় ছয় নিরাপত্তাকর্মীকে পাঁচ হাজার টাকা করে পুরস্কার দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের সদস্য। গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কাছ থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত ‘র্যাব’ লেখা কালো রঙের দুটি জ্যাকেট, তিনটি কালো রঙের ‘র্যাব’ লেখা ক্যাপ, একটি মাইক্রোবাস, পাঁচটি মোবাইল ফোনসেট, একটি লোহার তৈরি ছেনি, একটি পুরনো লাল রঙের স্লাই রেঞ্জ ও নগদ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, ডাকাতির সময় ওই বাসায় ২৫-৩০ জন ছিল। অপারেশন পরিচালনার জন্য পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যে ধরনের প্রিপারেশন নিয়ে যায়, সে ধরনের ফুল প্রিপারেশন ডাকাতদলের ছিল। তাদের সঙ্গে র্যাবের কটি ও জ্যাকেট পরা লোকজনও ছিল। সঙ্গে মাইক্রোফোন হাতে মিডিয়ার লোক পরিচয় দেওয়া লোকও ছিল, যারা সোর্স হিসেবে কাজ করে। তাদের মধ্যে পাঁচ-ছয়জন ছাত্রদের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়েছেন।
বুধবার ভোর পৌনে ৫টার দিকে ধানমণ্ডি ৮ নম্বর সড়কের ওই বাসায় ডাকাতির বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই বাড়িটির মালিক এম এ হান্নান আজাদ স্বর্ণ ব্যবসায়ী। ‘অলংকার নিকেতন জুয়েলার্স’ নামে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে।
উপকমিশনার বলেন, বাড়িটির নিচতলা, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় এস এম সোর্সিংয়ের অফিস রয়েছে। এ ছাড়া ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কনসালটেন্সি অফিস, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট রয়েছে।
তিনি বলেন, ডাকাতদলটি তিনটি মাইক্রোবাস ও একটি প্রাইভেট কারে ওই বাসার সামনে এসে গেটে নিরাপত্তাকর্মীদের বলে, তারা র্যাবের লোক, তাদের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট আছে। তারা বাড়িতে অভিযান চালাবে। এ জন্য তাড়াতাড়ি গেট খুলতে বলে। সে সময় দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড তাদের সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে। তখন ডাকাতরা সিকিউরিটি গার্ডদের গালাগাল করতে থাকে এবং গেট না খুললে তাঁদের হত্যার হুমকি দেয়। তাদের কয়েকজন গেটের ওপর দিয়ে টপকে ভেতরে ঢুকে জোর করে গেট খুলে ফেলে। এরপর তারা সবাই বাড়িতে ঢুকে সিকিউরিটি গার্ড, কেয়ারটেকার ও গাড়িচালককে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে।
ব্যবসায়ীর বাসায় স্বর্ণ থাকতে পারে ধারণা থেকে ডাকাতদলটির টার্গেটে ওই বাসা থাকলেও তারা নিচতলায় এস এম সোর্সিংয়ের অফিস থেকে ‘তল্লাশির’ নামে লুটপাট করে।
এরপর ডাকাতরা নিরাপত্তারক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তৃতীয় তলায় গিয়ে এস এম সোর্সিংয়ের অফিসের গেট ভেঙে ফেলে। এ সময় গেট ভাঙার শব্দ পেয়ে চতুর্থ তলায় থাকা এস এম সোর্সিংয়ের তিনজন অফিস সহকারী তৃতীয় তলায় নেমে আসেন।
ডাকাতরা তখন তাঁদেরও আটক করে মারধর করে অফিসের ও বাসার চাবি দিতে বলে। এরপর তারা চাবি নিয়ে তৃতীয় তলার অফিসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে অফিসের ড্রয়ার ভেঙে নগদ ২২ লাখ টাকা লুট করে এবং অফিসের বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। তাদের আরেকটি দল চতুর্থ তলার অফিসে ঢুকে আলমারি ভেঙে নগদ ১৩ লাখ টাকা লুট করে নেয়।
সব শেষে বাড়ির মালিক এম এ হান্নান আজাদের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ডাকাতদল ওই বাসা থেকে দেড় লাখ টাকা, স্বর্ণের কানের দুল ও চেইনসহ আনুমানিক আড়াই ভরি স্বর্ণ লুট করে। এরপর তারা মালিক এম এ হান্নানকে জোর করে নিচে নামিয়ে গাড়িতে উঠানোর চেষ্টা করে।
উপকমিশনার মাসুদ বলেন, এসবের মধ্যে কেউ একজন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে খবর দিলে টহল পুলিশের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের গ্রেপ্তার করে।