প্রতিবছর ঈদ, বিয়ে ও অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে কেনাকাটা করতে যেতেন। ভারতের বড় শপিং মল এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতি তাঁদের ব্যাপক আকর্ষণ ছিল। ডলারের খোলাবাজারেও ঈদের আগমনী বার্তা টের পাওয়া যেত। তবে এবার চিত্র বদলেছে।
ভিসা জটিলতার কারণে ভারতমুখো কেনাকাটা ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে নতুন গতি এসেছে।
কাঙ্ক্ষিত সাড়া নেই বাংলাদেশের ডলারের খোলাবাজারেও। হজকেন্দ্রিক কিছু লেনদেন হলেও তা আগের বছরের তুলনায় অনেক কম। এখন দেশের ব্যাংকগুলোতে ১২২ টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে ডলার।
খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংক রেটের পার্থক্য দুই থেকে আড়াই টাকা। কারণ খোলাবাজারে ১২৪ থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যেই লেনদেন হচ্ছে প্রতি ডলার।
তথ্য বলছে, গত বছরের মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলারের নির্ধারিত দাম ছিল ১১০ টাকা। কিন্তু নির্ধারিত দামে ডলার পাওয়া যাচ্ছিল না।
আমদানি বিল পরিশোধের জন্য নির্ধারিত দামের বাইরে প্রতি ডলারে আরো ১৩ টাকা পর্যন্ত পে অর্ডারের মাধ্যমে দিতে হয়েছে। এতে প্রতি ডলার ১২৩ টাকায় বিক্রি হতো। খোলাবাজারে ডলারের উত্তাপ ছিল আরো বেশি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বছর কয়েকটি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে জরিমানাও করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ঈদে সেই চিত্র একেবারেই ভিন্ন।
মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এম এস জামান বলেন, অন্যান্য ঈদের মতো এবার সাড়া নেই। আগে ঈদের সময় অনেকে খোলাবাজার থেকে ডলার কিনত। কিন্তু এখন ঈদকেন্দ্রিক তেমন কোনো চাপ নেই। এখন খোলাবাজারে ১২৪ থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যেই ডলার বেচাকেনা হচ্ছে। অনেক দিন থেকে এই দামেই স্থিতিশীল আছে ডলারের বাজার। ব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারে এখন খুব বেশি পার্থক্য নেই বলেও জানিয়েছেন এই ডলার ব্যবসায়ী।
গ্লোবাল ইকোনমিস্ট ফোরাম নামের একটি সংগঠনের মতে, প্রতিবছর রমজান মাসে কমপক্ষে দেড় লাখ বাংলাদেশি কেনাকাটার উদ্দেশ্যে ভারত যেতেন। এই একটি ঈদকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৩০ কোটি ডলার আয় করত ভারত। ফলে এই সময়ে খোলাবাজারে ডলারের দাম বেড়ে যেত। বর্তমানে সীমান্ত উত্তেজনা, রাজনৈতিক বিভাজন ও ভিসা জটিলতার কারণে ভারতে যেতে পারছেন না বাংলাদেশিরা।
শুধু ডলারের খোলাবাজারে নয়, ভারতের নিষেধাজ্ঞায় ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনেও প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সরকার পতনের পর থেকে ভারতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে যে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ডিসেম্বরেও অব্যাহত ছিল। ভারতে ২৩ মাসের মধ্যে গত ডিসেম্বরেই বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন ছিল সবচেয়ে কম। দেশের বাইরে গত জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হতো ভারতেই।
নিম্নমুখী এই প্রবণতার ফলে দেশের বাইরে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচের তালিকায় ভারত নেমে গেছে চতুর্থ স্থানে। আগের মাসের মতো প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ড। তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুর। দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনের তথ্য ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করে রবিবার, যেখানে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য আছে।
হালনাগাদ তথ্য বলছে, ডিসেম্বরে দেশের বাইরে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন হয় ৪৯১ কোটি টাকা, যা আগের মাস নভেম্বরে ছিল ৪৩১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১৩.৯২ শতাংশ।
ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয় ৭৪ কোটি টাকা, যা নভেম্বরে ছিল ৬৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ডে ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লেনদেন হয় থাইল্যান্ডে, ৬৪ কোটি টাকা, নভেম্বরে যা ছিল ৪৬ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা সিঙ্গাপুরে লেনদেন হয় ৪১ কোটি টাকা, যা নভেম্বরে ছিল ৩৮ কোটি টাকা। চতুর্থ অবস্থানে আছে ভারত, যেখানে ডিসেম্বরে লেনদেন হয় ৪০ কোটি টাকা, আর নভেম্বরে হয় ৪৭ কোটি টাকা।
গত আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে। ফলে ভারতে বাংলাদেশিদের ভ্রমণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়, যার প্রভাব ক্রেডিট কার্ডের লেনদেনেও পড়ে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডে ভারতে লেনদেন হয় ৭৩ কোটি টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৯২ কোটি টাকা।