ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে ঝিনাইদহ। চরমপন্থীদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের তত্পরতা আবারও দেখা যাচ্ছে। গত শুক্রবার রাতে নিজেদের অধিপত্য বিস্তারে জেলার শৈলকুপা উপজেলার রামচন্দ্রপুর এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় এক চরমপন্থী নেতাসহ তিনজনকে। এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েছে জাসদ গণবাহিনীর সামরিক প্রধান কালু।
এ ঘটনায় জনমনে ভীতি কাজ করছে।
নিহতরা হলেন—হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আহাদনগর গ্রামের মৃত রাহাজ উদ্দিনের ছেলে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ নেতা হানিফ আলী ওরফে হানেফ (৫৬), তাঁর শ্যালক একই উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের উন্মাদ আলীর ছেলে লিটন হোসেন (৩৮) ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পিয়ারপুর গ্রামের আরজান হোসেনের ছেলে রাইসুল ইসলাম রাজু (২৮)। তাঁদের মাথায় ও বুকে গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হানিফের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ হয়েছিল।
তিনি তত্কালীন রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের বিশেষ ক্ষমায় জামিনে ছিলেন।
জানা গেছে, পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা হানিফ নব্বইয়ের দশকে ঝিনাইদহের সদর, হরিণাকুণ্ডু, শৈলকুপা, চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৪টি হত্যাসহ অসংখ্য মামলা রয়েছে। ২০১৭ সালে হরিণাকুণ্ডুর নারায়ণকান্দি বাঁওড়ের মত্সজীবী সমিতির তত্কালীন সভাপতি জিয়াউল হককে গুলি করে হত্যা করে বাঁওড়ের দখল নেন তিনি।
সূত্র জানায়, এই তিন খুনের নেপথ্যে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার কায়েতপাড়ার বাঁওড় দখল। ওই বাঁওড়ে কোটি টাকার ওপরে মাছ ছাড়া রয়েছে। এক বছর আগে মত্স্যজীবী লীগ নেতা পরিচয়ে হানিফ বাঁওড়ে মাছ ধরা ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে এলাকার বিবদমান একাধিক গ্রুপের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এরই জেরে হানিফসহ তাঁর দুই সঙ্গীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
কায়েতপাড়ার ওই বাঁওড় দখল নিয়ে গত তিন দশকে অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ খুন
এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন জাসদ গণবাহিনীর সামরিক প্রধান কালু।
গত শুক্রবার রাতে চরমপন্থী নেতা কালুর পাঠানো খুদে বার্তায় বলা হয়, ‘সন্ধ্যায় রামচন্দ্রপুর খালের মধ্যে তিনজনকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে।’ সড়কের ওপর দুটি মোটরসাইকেল পড়ে আছে বলেও জানান তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হরিণাকুণ্ডুর অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক বলেন, ‘সন্ত্রাসী হানিফ কুলবাড়িয়া গ্রামের আব্দুর রহমান, তিওরবিলা গ্রামের লুত্ফর রহমান, তাহেরহুদার আব্দুল কাদের ও পোলতাডাঙ্গার ইজাল মাস্টারসহ শতাধিক মানুষকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে। ইজাল মাস্টারকে হত্যার পর তাঁর মাথা কেটে বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলে হানিফ। ওই সময় ঘটনাটি দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।’
নিহত হানিফের ছোট ভাই ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম ইশা বলেন, ‘শুক্রবার বিকেলে ভাইয়াকে মোবাইলে কল করে কে বা করা ডাকে। তখন তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। পরে শুনি তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাঁওড়ের মাছ ধরা নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ভাইয়ের বিরোধ চলছিল। হয়তো এরই জেরে তাঁদের হত্যা করা হতে পারে।’
জেলা বিএনপির সহসভাপতি এনামুল কবির মুকুল বলেন, ‘চরমপন্থীরা হঠাৎ করে এই জনপদে আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। তারা খুন, ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছে তারা। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষ বাহিনী যদি এসবের লাগাম টানতে না পারে তাহলে এই অঞ্চল আবারও অশান্ত হয়ে উঠবে।’
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমরান জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হানিফ নিষিদ্ধঘোষিত পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা ছিল। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক হত্যা, অপহরণ, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। সেই সঙ্গে একটি হত্যা মামলায় তার ফাঁসির আদেশ হয়েছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘নিহত হানিফের ফাঁসির রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিশেষ ক্ষমায় সে জামিনে মুক্ত হয়।’
সতর্ক চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ
ঝিনাইদহে চরমপন্থী নেতাসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সতর্ক অবস্থায় রয়েছে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ। যদিও চুয়াডাঙ্গায় এসংক্রান্ত আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কোনো খবর তাঁদের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কনক কুমার দাস। অন্যদিকে এ ঘটনার পর ঝিনাইদহসহ খুলনা বিভাগের কয়েক জেলার বামপন্থীদের জন্য সতর্কবার্তায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলাউদ্দিন উমর।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কনক কুমার দাস বলেন, শুক্রবার রাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকায় হত্যার ঘটনা ও দুষ্কৃতকারীদের সতর্কবার্তার বিষয়ে তাঁরা অবগত আছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশ সতর্ক অবস্থায় আছে। তিনি আরো বলেন, যদিও চুয়াডাঙ্গায় এসংক্রান্ত আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কোনো খবর তাঁদের কাছে নেই।