ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও কিছু আরব রাষ্ট্রও হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
এলিসি প্যালিসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘আমরা একটি যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি নিয়ে কথা বলব।’ পাশাপাশি ফ্রান্স ও মিসরের মধ্যে একটি কৌশলগত অংশীদারি জোরদার করার লক্ষ্যও ম্যাখোঁর রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আরববিশ্বে ফ্রান্সের ভূমিকা কী?
সাবেক সাংবাদিক ও বর্তমানে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা এইকে কনসিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ এল কেই মনে করেন, ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মিসর ও আরববিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগে ফ্রান্স এগিয়ে রয়েছে।
ডিডব্লিউকে তিনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে ফরাসি-মিসরীয় সম্পর্ক চমৎকার। অনেক ফরাসি কম্পানি মিসরে সক্রিয় এবং সেখানে তাদের কয়েক হাজার কর্মী রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে প্রথম দেশ হিসেবে ২৪টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান কিনেছিল মিসর, যা অন্যান্য দেশে বিমান রপ্তানির পথ প্রশস্ত করেছিল।’ এখনো ফরাসি সামরিক সরঞ্জামের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক দেশ মিসর।
এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট শার্ল ডি গলের মধ্যপ্রাচ্যনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা এই জেনারেল মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যপন্থী কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। এই কৌশলের ফলে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও সেটি নিঃশর্ত ছিল না। ডি গল ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছিলেন এবং ১৯৬৭ সালের জুনে মিসরে হামলা চালিয়ে ছয় দিনের যুদ্ধ শুরু করার পর ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিলেন। আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ডি গল সতর্ক অবস্থান নিয়েছিলেন।
এল কেই ব্যাখ্যা করেন, ‘আরববিশ্বে, বিশেষ করে মিসরে ফ্রান্সকে অত্যন্ত সম্মান দিয়ে দেখার এটি আরেকটি কারণ।’
১৯৯৫ সাল থেকে এলিসি প্যালেসে প্রবেশ ও সংবাদ সংগ্রহের অনুমতি রয়েছে সাংবাদিক খালেদ সাদ জাঘলুলের। এই প্রবণতাটি তিনিও প্রত্যক্ষ করেছেন।
মিসরীয় পরামর্শদাতা জাঘলুল ডিডব্লিউকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক, নিকোলাস সারকোজি, ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ও এখন ইমানুয়েল ম্যাখোঁ—সবাই সপ্তাহে অন্তত একবার কায়রোর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। ১৯৭৯ সালে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির পর থেকে কায়রোকে একটি গ্রহণযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা হয়ে আসছে।’
সেই সময় মিসর ছিল প্রথম আরবদেশ, যারা তথাকথিত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
অনিশ্চিত রাজনৈতিক সময়ে মিসরে ফরাসি রাষ্ট্রীয় সফর
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ গার্গেসের কাছে আসন্ন সফরের সময়কালটাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেতৃত্বে শূন্যতার সময়ে পশ্চিমা নেতা হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে ম্যাখোঁর। যুক্তরাষ্ট্র এখন অসংলগ্ন বলে মনে হচ্ছে। জোট সরকার গঠনের আলোচনার নিজেদের সুশৃঙ্খল করার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে জার্মানি। ইতালি ও যুক্তরাজ্যের মতো মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের উপস্থিতিও কম।’
মিসর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি এবং আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে এর অবস্থান। গার্গেস বলেন, ‘মিসরে যা ঘটে তার সুদূরপ্রসারী পরিণতি রয়েছে। অভিবাসনের দিক থেকে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অনেক শরণার্থীকে গ্রহণ করে দেশটি। লিবিয়ার মতো শরণার্থীরা (ইউরোপের দিকে) এগিয়ে যায় না। এমন একটি অঞ্চলে স্থিতিশীলতার আশ্রয়স্থল হিসেবে মিসরকে দেখা হয়, যে অঞ্চলে গৃহযুদ্ধ ও সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রয়েছে।’
সাংবাদিক জাঘলুল বলেন, মিসর সব আঞ্চলিক সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা নেয়। তিনি আরো বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বলা হয়, মিসর ছাড়া আপনি যুদ্ধ বা শান্তি স্থাপন করতে পারবেন না, আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এই জাতি একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।’
‘ফ্রান্স, ইইউ ও মিসরকে চাপ তৈরি করতে হবে’
মার্চের শুরুতে আরব লীগের ২২টি সদস্য রাষ্ট্র মিসরের রাজধানীতে বৈঠকে বসে। পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে গাজা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনায় একমত হয় দেশগুলো। একমত হওয়া অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বাসিন্দাদের গাজাতেই থাকতে দেওয়া এবং পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দিয়ে গাজা পরিচালিত করার সিদ্ধান্তও ছিল।
এই প্রস্তাবটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিলিস্তিনিদের মিসর ও জর্দানে স্থানান্তরিত করার পরিকল্পনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এলিসির মুখপাত্র জানান, ‘আরব পরিকল্পনা আলোচনার জন্য একটি ভালো ভিত্তি, তবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও গাজার ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এটি সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, এই সফরের ফলাফল পরবর্তীতে ওয়াশিংটনের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
ফ্রান্স ও সৌদি আরবও এই জুনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর একটি সম্মেলনের পরিকল্পনা করছে। সাদ জঘলুল আশা করেন, ম্যাখোঁর এই সফর ফলপ্রসূ হবে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ফ্রান্স, ইইউ ও মিসরকে অবশ্যই চাপ তৈরি করতে হবে।’
এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রান্সকে মিসরের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ভিন্নভাবে ব্যবহার করার আহ্বান জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থাটি ‘মানবাধিকার সংকট’ এবং দেশটির ‘বিরোধী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের ওপর নিয়মতান্ত্রিক দমন’ সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিসর প্রতিনিধি লেনা কোলেট ডিডব্লিউকে বলেন, ‘চূড়ান্ত ঘোষণায় ম্যাখোঁর স্পষ্টভাবে মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করা উচিত, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দাবি করা উচিত এবং এই আগস্টে সংসদীয় নির্বাচন অবাধ ও গণতান্ত্রিকভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।’
এলিসির সূত্র জানিয়েছে, সফরে মানবাধিকারের বিষয়টিও ‘উল্লেখ’ করা হবে।