বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া গুলিতে শহীদদের বাড়িতে ঈদে আনন্দ নেই। ঈদে প্রতিটি পরিবারে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। সবাই ভাগাভাগি করে নেন ঈদ আনন্দ। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া গুলিতে শহীদদের বাড়িতে নেই ঈদের খুশি।
ঈদের চার দিন কেটে গেলেও পরিবারে চলছে কান্নার রোল। ছেলেসন্তান হারিয়ে মা-বাবার নেই আনন্দ।
জুলাই শহীদ পরিবারের জন্য যেন বেদনায় ভরা ঈদ। গত বছরের ঈদে যাদের উপস্থিতি আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েক গুণ, এবার সেই প্রিয় মুখগুলো মা-বাবার সামনে নেই।
আজও মা-বাবা ও পরিবার তাকিয়ে আছে তাদের সন্তান ফিরে আসবে। কিন্তু পরিবারে আর কোনো দিন ফিরবে না তাদের সন্তান।
শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘পুলিশের গুলি আমার পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। গত বছরের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ছোড়া গুলিতে শহীদ হন আবু সাঈদ।
ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন আবু সাঈদ। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর সাঈদসহ পরিবারের অন্য ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম। ঈদের পর পাঁচ-সাত দিন আনন্দ করত ছেলে। আজ বাড়িতে সবাই আছে, শুধু আবু সাঈদ নাই।
’
আবু সাঈদের ভাই রমজান আলী বলেন, ‘এবারের ঈদে বাড়িতে কোনো আনন্দ নেই। বাড়িটা শূন্য শূন্য লাগছে। আমরা আবু সাঈদের অভাব অনুভব করছি। ভাই নেই, তাকে ছাড়া ঈদের আনন্দ নেই।’
শহীদ মুসলিম উদ্দিন মিলনের স্ত্রী দিলরুবা আকতার বলেন, ‘পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো মানুষটিই চলে গেছেন। আবার ঈদ আনন্দ—বলেই চোখের পানি ছাড়া কিছু নেই। গত বছরের ১৯ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন মিলন।’
শহীদ মানিকের মা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘ঈদের নতুন শাড়ি নিয়ে এসেই মা বলে ডাকত, এবার কেউ ডাকেনি। ঈদের কয়েক দিন হয়ে গেলেও আমার ছেলের জন্য মন কাঁদে। বাড়িতে ঢুকেই মা বলে ডাকত। এবার মানিক আমার মা বলে ডাকল না, কেউ আর মা বলে এত আদর করে ডাকবে না।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ অটোচালক মানিকের মা।
শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের মা ময়না বেগম বলেন, ‘ঈদ এলেই মা ও স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়-স্বজনের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে আনতেন সাজ্জাদ হোসেন। সন্তানের কাছ থেকে ঈদের জন্য নতুন শাড়ি পেয়ে খুবই আনন্দ লাগত। এবার ওইভাবে কেউ আর খোঁজ নেয়নি।’
শহীদ মেরাজুল ইসলাম মেরাজের স্ত্রী বলেন, ‘পিতৃহারা দুই সন্তান বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজ আর পড়তে পারেনি। পরিবারে ঈদের কোনো আনন্দ নেই।’
শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের মা বলেন, ‘ঈদ তো কল্পনায়ই নাই। চার-পাঁচ দিন ধরে ছেলের কথা বেশি মনে পড়ছে। ছেলে তাহিরের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। কষ্টের সংসারে ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল। ছেলে পড়ালেখা শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হবে। পরিবারের কষ্ট দূর করবে। সব স্বপ্নই চুরমার হয়ে গেছে পুলিশের এক গুলিতেই।’ গত বছরের ১৯ জুলাই রংপুর নগরীর সিটি বাজারের সামনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাহির।
শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান কলি বলেন, সাংবাদিক প্রিয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ঢাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। প্রিয়র মা যখন কথা বলছেন তখন শহীদ প্রিয়র মেয়ে চেয়ার থেকে উঠে বাবার (প্রিয়র) ছবি নামিয়ে বাবা বাবা বলে আদর করে। চুমো দেয়। এ সময় বলতে থাকে ‘বাবা তুমি কখন আসবে।’