সন্দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের বুকে কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপের সমষ্টি। এই দ্বীপগুলো বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত। সম্ভবত পাঠান রাজত্বকালে তারাই প্রথম সন্দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। এরপর মোগল শাসনামলে এই দ্বীপগুলো মোগলদের দ্বারা অধিকৃত হয় এবং এর শস্য শ্যামল রূপে মুগ্ধ হয়ে মোগলদের অনেকেই এখানে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে।
বাংলার বিদ্রোহ
সন্দ্বীপের বিদ্রোহ
অনিন্দ্য আরিফ

সন্দ্বীপের ইতিহাসে দিলালের নাম ছিল প্রসিদ্ধ। তাঁর প্রকৃত নাম দেলোয়ার খাঁ।
খিদিরপুরের ভূকৈলাসের ঘোষাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের শেষ আহাদদার ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ও বিহারের গভর্নর ভেরলস্ট সাহেবের সদর দপ্তরের কেরানি ও বেনিয়ান। গভর্নর ভেরলস্ট সাহেবের অনুগ্রহেই তিনি ১৭৬৩ সালে বেনামীতে সন্দ্বীপের আহাদদারি লাভ করেন। এই গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। তাঁর পেছনে ছিল ইংরেজ বণিক রাজের অস্ত্রশক্তি।
এদিকে চাদ খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশের চতুর্থ পুরুষ আবু তোরাপ চৌধুরী চাদ খাঁর জমিদারির এক অংশ লাভ করেন। আবু তোরাপের জমিদারি বৃহৎ না হলেও তিনি ছিলেন শৌর্যবীর্যশালী অতিশয় দূরাকাঙ্ক্ষী জমিদার। তাঁর অধীনে ১৫০০ দাসদাসি ছিল। আবু তোরাপ গোকুলের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। অল্পকালের মধ্যে তিনি সব জমিদারকে তাড়িয়ে সন্দ্বীপের কর্তা হয়ে বসেন। গোকুল এটা সহ্য করলেন না। গোকুল বিতাড়িত জমিদারদের দিয়ে নবাব দরবার ও বাংলার প্রকৃত শাসক ইংরেজদের কাছে অভিযোগ পেশ করলেন। ইংরেজ গভর্নর আবু তোরাপকে দমনের জন্য ক্যাপ্টেন নলিকিনকে প্রেরণ করেন। ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যভাগে ক্যাপ্টেন নলিকিনের সঙ্গে আবু তোরাপের ভীষণ যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে আবু তোরাপের বাহিনী ধ্বংস হয় ও তিনি নিহত হন।
আবু তোরাপের মৃত্যুর পর সরকার তাঁর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং অপর জমিদারিগুলো এর মালিকদের ফিরিয়ে দেয়। গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের আহাদদার হওয়ার সুযোগে আবু তোরাপের জমিদারি এক কর্মচারীর নামে বন্দোবস্ত করেন। পরে গোকুল ঘোষাল আরো অত্যাচারী হয়ে উঠেন এবং অন্যদের জমিদারি গ্রাস করতে থাকেন। এর বিরুদ্ধে বাংলার তৎকালীন গভর্নর কাটিয়ার সাহেবের কাছে সুবিচারের দাবি জানিয়ে দরখাস্ত দিলে কাটিয়ার এই দরখাস্ত মুর্শিদাবাদে নায়েব দেওয়ান সৈয়দ রেজা খাঁর কাছে পাঠান। রেজা খাঁ জমিদারদের জমিদারি ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশ গোকুল ঘোষাল সুকৌশলে নাকচ করতে সক্ষম হন। গোকুল ঘোষালের অত্যাচারে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন।
১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে সন্দ্বীপের কৃষকরা মরিয়া হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহ সন্দ্বীপের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। জমিদাররাও এই বিদ্রোহে যোগ দেন। গোকুল ঘোষাল বিদ্রোহ দমন অসাধ্য বুঝে ইংরেজদের কাছে অবিলম্বে একদল সৈন্য প্রেরণের জন্য আবেদন করেন। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে একটি সৈন্যবাহিনী সন্দ্বীপে এসে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের এই বিদ্রোহ ইংরেজদের টনক নড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারা গোকুল ঘোষালকে বিতাড়িত করে না। ১৭৭২ সালে আহাদদারের পদ তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু গোকুল ঘোষাল সন্দ্বীপের জমিদাররূপে কৃষকদের অত্যাচার করতে থাকেন। তখন জমিদাররা আবার কম্পানির শরণাপন্ন হন। অবশেষে মুর্শিদাবাদের রেভিনিউ বোর্ড ডানকান নামে একজন কর্মচারীকে তদন্তের জন্য পাঠায়। ডানকান গোকুল ঘোষালের কুকীর্তির কথা কম্পানিকে জানালে কম্পানি আবু তোরাপের পুত্র ছাড়া সব জমিদারি জমিদারদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। সন্দ্বীপের ইতিহাসে ইংরেজদের সহায়তায় গোকুল ঘোষালের অত্যাচারের কাহিনী এবং তার বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সম্পর্কিত খবর