ঢাকা, সোমবার ০৭ এপ্রিল ২০২৫
২৪ চৈত্র ১৪৩১, ০৭ শাওয়াল ১৪৪৬

নির্বাচিত জার্মান নেতার নতুন আত্মপ্রত্যয়

  • গাজীউল হাসান খান
শেয়ার
নির্বাচিত জার্মান নেতার নতুন আত্মপ্রত্যয়

জার্মানির সদ্যঃসমাপ্ত সাড়া-জাগানো নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক সংগঠন অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) গগনস্পর্শী আস্ফাালন আপাতত বন্ধ হয়েছে। বিরাট ব্যবধানে তারা পরাজিত হয়েছে দেশের প্রাচীন ও রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) কাছে। সিডিইউ এই নির্বাচনে বেভারিয়ায় তাদের সহযোগী সংগঠন ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়নের (সিএসইউ) সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ইলন মাস্ক ও রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরোক্ষ সমর্থনে নির্বাচনের আগে জার্মানিজুড়ে মাঠ গরম করেছিল নিউ নািস নামে অভিযুক্ত এএফডি।

তখন এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল, এবার হয়তো উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান ঠেকানো সম্ভব না-ও হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্ষণশীল গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে তাদের ভরাডুবি হয়েছে। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্রেডরিশ ম্যারেৎসই এই তোলপাড় করা নির্বাচনে শেষ হাসি হাসলেন।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপর্যস্ত জার্মানরা আবার আশায় বুক বাঁধল ফ্রেডরিশ ম্যারেেসর সুযোগ্য নেতৃত্বে এক ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য।

ম্যারেৎস বলেছিলেন, তাঁর দল নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে তিনি দলনেতা হিসেবে দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। বেকার সমস্যা সমাধানসহ জ্বালানিসংকট মোকাবেলা ও রপ্তানি বাণিজ্যে গতি ফেরাবেন। জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দেশকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমুক্ত ও প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করবেন। প্রয়োজনে গতিহীন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন ম্যারেৎস।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়ে প্রকৃত অর্থে জার্মানির কোনো লাভ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তা ছাড়া অভিবাসন ও বহিরাগত শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় সাধন করে বর্তমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাবেন। বর্তমানে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপ জার্মান নেতা ফ্রেডরিশ ম্যারেৎস অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে গণমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ। ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, নতুন করারোপ থেকে ইউরোপের প্রতি ট্রাম্পের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ম্যারেৎস গভীরভাবে সব কিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনকে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিম বলে আখ্যায়িত করেন।
তাঁর মতে, আগের বিশ্বব্যবস্থায় যথেষ্ট পরিবর্তন আসতে পারে এবং তার জন্য জার্মানিকে সর্বতোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তা ছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার জটিল বিষয়টিতে অনতিক্রমনীয় দ্বন্দ্ব দেখা দিলে ইউরোপকে তার নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলেও এই জার্মান নেতা সতর্ক করেন।

https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/1.Print/2025/03.March/02-03-2025/kalerkantho-ed-1a.jpgদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান পরিমণ্ডলে দ্রুত বেরিয়ে আসতে চায় জার্মানি। সদ্যঃসমাপ্ত জার্মানির বুন্ডেসটাগের (জাতীয় সংসদ) নির্বাচনে বিজয়ী জার্মান রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের নেতা ফ্রেডরিশ ম্যারেৎস অতি দ্রুত জার্মানির পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বব্যাপী প্রচেষ্টা (আন্দোলন) চালাবেন বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন। বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধৃতি দিয়ে ম্যারেৎস বলেছেন, দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে তিনি জার্মানি থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সারিয়ে নেবেন। তা ছাড়া জার্মানিতে স্থাপিত যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়ারও পক্ষপাতী নবনিযুক্ত জার্মান চ্যান্সেলর ম্যারেৎস। ফ্রেডরিশ ম্যারেৎস বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটিমুক্ত একটি পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম জার্মান রাষ্ট্র গঠনে আগ্রহী। তাত্ত্বিক দিক থেকে এটি হবে বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি নতুন ইউরোপীয় দেশ। জার্মানির পূর্ণ স্বাধীনতা বাস্তবায়নে ম্যারেৎস দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বব্যাপী করোনা অতিমারির প্রকোপ এবং পর্যায়ক্রমে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতার কারণে জার্মানিতে চরম জ্বালানি, উৎপাদন ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে এক চরম সংকট দেখা দিয়েছিল। এতে জার্মান অর্থনীতি বিশাল অঙ্কের ঘাটতির সম্মুখীন হয়েছে, যা কাটিয়ে ওঠা মোটেও সম্ভব হয়নি। এতে জার্মানিতে যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে, তার ফলে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। এর ফলে একদিকে যেমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দেশটির বহির্বাণিজ্য কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে বেকারত্ব ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্যগত ঊর্ধ্বগতি। এমন একটি অবস্থায় গত ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রক্ষমতায় দ্বিতীয়বারের মতো অধিষ্ঠিত হওয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পন্থায় করারোপ করার হুমকিতে জার্মানিসহ পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখন বিচলিত হয়ে উঠেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেনের বিগত তিন বছরের চলমান যুদ্ধে ইইউয়ের অন্যতম প্রধান সদস্য দেশ জার্মানি সবচেয়ে বেশি অর্থ সাহায্য ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করেছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। জার্মানির সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) সদ্যঃসাবেক চ্যান্সেলর ওলাফ শোলজ ইউরোপীয় প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধকে একটি অত্যন্ত অন্যায় সামরিক আগ্রাসন বলে মনে করতেন। ইউক্রেনের ওপর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সশস্ত্র হামলাকে শোলজ পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যদের ওপর আক্রমণ বলে মনে করতেন। তিনি এটিও আশঙ্কা করতেন যে রাশিয়ার পরবর্তী আক্রমণের টার্গেট হতে পারে ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ড, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া কিংবা মলদোভা। শোলজের ধারণা মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারব্যবস্থা, রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্পায়ন কিংবা অবকাঠামোগত বিনির্মাণকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছেন পুতিন। এ ক্ষেত্রে অবশ্য রাশিয়া কিংবা ইউক্রেনের রুশ ভাষাভাষী অঞ্চলগুলোর দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমস্যার কথাই ভাবেননি শোলজ কিংবা পশ্চিমা নেতারা। এই অভিযোগ গণমাধ্যমের তথ্যাভিজ্ঞমহলের। তাদের সমালোচনার মধ্যে ইউক্রেনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি কিংবা তাঁর পূর্ববর্তী শাসকদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণাও কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইউক্রেনের নেতারা রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ কিংবা ইউক্রেনের সমুদ্রবন্দর ক্রিমিয়াসহ অন্যান্য প্রতিবেশী ইউরোপীয় অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার আগ্রাসী মনোভাব কিংবা সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনাকে দোষারোপ করে চলেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক নেতা মনে করেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটি অবশ্যম্ভাবী ছিল। এখন সে যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘদিনের বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে পারে। এখানে আর যা-ই হোক, একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয় অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বনেতারা বিভিন্ন অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে আন্তরিক হলে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে তথ্যাভিজ্ঞমহলের বিশ্বাস। জার্মানি নিজ স্বার্থেই এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে ভিন্ন জায়গায়, পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকভাবে পরাশক্তিগত আধিপত্য ও স্বার্থ বজায় রাখার ক্ষেত্রে।

নবনির্বাচিত জার্মান ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের নেতা ফ্রেডরিশ ম্যারেৎস উপরোল্লিখিত বিভিন্ন কারণেই জার্মানিকে বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা আধিপত্যের শৃঙ্খলমুক্ত করে তার পূর্ণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রশক্তির অংশীদাররা পরাজিত শক্তির দেশগুলোর সম্পূর্ণ মুক্তির প্রশ্নে যেসব শর্ত আরোপ করেছিল, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি, ইতালি, জাপান ও অন্য যারা পরাজিত হয়েছিল, তাদের প্রতিরক্ষা ও অপরাপর কিছু বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত এবং সময় দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে এখন পর্যন্ত বিগত ৮০ বছরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। সে হিসেবে জার্মানি এখন কিভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত হবে তা তাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জার্মানি থেকে তাঁদের সেনাঘাঁটি গুটিয়ে ফেলতে আগ্রহী হয়েছেন। তা ছাড়া সম্প্রতি তুরস্কের পাশে অর্থাৎ ইজিয়ান সাগরের গ্রিসসংলগ্ন দ্বীপ থেকেও সেনাঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তুরস্ক ও রাশিয়া সন্তোষ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র (ট্রাম্প প্রশাসন) তাদের সামরিক বাজেট সমন্বয় করতে গিয়ে বিদেশে নিয়োজিত তাদের সেনাদের অনেক জায়গা থেকে প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে। এ অবস্থায় জার্মানি তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী ঢেলে সাজানোর নতুন পরিকল্পনার কথা চিন্তা-ভাবনা করছে। ন্যাটোর অন্যতম প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা সামরিক জোটের সদস্যদের সামরিক ব্যয় বছরে ২ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার জন্য ক্রমাগতভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহু আগে থেকেই এই প্রস্তাব কার্যকর করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ন্যাটো জোটের বিভিন্ন সদস্য এ ব্যাপারে তাদের অপারগতার কথা জানিয়েছে। এতে ট্রাম্প তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা তার সামরিক ব্যয় বহন করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র আর নিতে পারবে না। প্রয়োজন হলে বর্তমান পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ভেঙে দিয়ে ইউরোপকে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই কথাটি বর্তমান ন্যাটো সদস্য ফ্রান্স বহু আগে থেকেই বলে এসেছে। ফ্রান্সের সে ধরনের উদ্যোগের প্রতি জার্মানি সমর্থন জানালেও সমর্থন করেনি রাশিয়ার প্রতিবেশী পোল্যান্ড ও অন্য ছোট ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো। রাশিয়া চায় তার সীমানার ওপারে স্থাপিত ন্যাটো ভেঙে যাক। সেটি যত দ্রুত হয়, ততই রাশিয়ার জন্য মঙ্গল।

উপরোল্লিখিত পরিস্থিতিতে জার্মানি সম্পূর্ণ বিষয়টিকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করছে। জার্মানির বর্তমান ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন ও তার নেতারা এবং এমনকি অন্য প্রথম সারির দলগুলোও ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ঢেলে সাজানোর ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া আর যে বিষয়টি নিয়ে তারা ক্রমে ক্রমে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে ইইউয়ের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইইউয়ের পণ্যসামগ্রীর ওপর আনুপাতিক হারে বর্ধিত করারোপ করার ট্রাম্পের যে সাম্প্রতিক ঘোষণা, তাতে জার্মানি, ফ্রান্স ও পোল্যান্ড বেশ কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ বর্তমান মন্দার বাজারে এই বর্ধিত কর তাদের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্যও এ ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়েছে। ইইউয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ক্ষেত্রে সহযোগিতার ব্যাপারে সম্প্রতি ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রাম্প তাঁর অবস্থানে অনড় রয়েছেন। এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছেন জার্মানির নবনির্বাচিত নেতা ফ্রেডরিশ ম্যারেৎস। তিনি জার্মানি এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের জন্য একটি অবস্থানগত পরিকল্পনা নিতে চান, যা বর্তমান আর্থ-রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করতে পারে। ইউরোপীয় তথ্যাভিজ্ঞমহলের মতে, জার্মানির সামনে এখন একের পর এক বহু চ্যালেঞ্জ আসবে, যা দেশটিকে ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। যে ভেঙে যাওয়া দেশটিকে জার্মান জাতি একদিন সুউচ্চ প্রাচীর ধ্বংস করে আবার সংযুক্ত করেছে, তাদের দৃঢ়চেতা মনোভাব এবং কঠিন সংকল্পের কাছে কিছুই অসম্ভব নয়। ফ্রেডরিশ ম্যারেেসর নেতৃত্বে জার্মানি আবার ঐক্যবদ্ধভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে, অর্জন করবে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সমৃদ্ধিসেটিই তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বরপুত্র পিটার হিগস

ড. কানন পুরকায়স্থ
ড. কানন পুরকায়স্থ
শেয়ার
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বরপুত্র পিটার হিগস

তাত্ত্বিক কণা পদার্থবিজ্ঞানী ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক পিটার হিগস ৮ এপ্রিল ২০২৪ সালে ৯৪ বছর বয়সে এডিনবরায় তাঁর নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি প্রায় ছয় দশক এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতা করেন। হিগস গাণিতিকভাবে দেখান, কোনো কণা একটি নতুন ধরনের ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ভর অর্জন করে।

এই ক্ষেত্রই হিগস ক্ষেত্র এবং কণার নাম হিগস বোসন। ২০১২ সালে সার্নে হিগস বোসন আবিষ্কৃত হয়। ফলে ২০১৩ সালে পিটার হিগস ও ফ্রাঁসো ইংলার্ট পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।      

এই আবিষ্কারের পেছনের ইতিহাস একটু জানা যাক।

ছাত্রাবস্থায় হিগস বিজ্ঞান ও দর্শনের নানা বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ১৯৫০ সালের মে মাসের কোনো এক বিকেল। লন্ডনের কিংস কলেজে ম্যাক্সওয়েল সোসাইটি আয়োজন করেছে এক বিজ্ঞান সভা। সোসাইটির সেই সময়ের নবীন সভাপতি ২০ বছরের যুবক পিটার হিগস।
সভায় হিগস প্রশ্ন তুললেন, একজন বিজ্ঞানী কি প্রকৃতির সূত্রকে সত্যিকার অর্থে জানতে পারেন?

বিজ্ঞান হচ্ছে বাস্তবতার সূত্র অনুসন্ধান করার একটি পদ্ধতি এবং এই অনুসন্ধানের জন্য বিজ্ঞানী পরীক্ষণপদ্ধতি ব্যবহার করেন। কিন্তু হিগসের প্রশ্ন, একজন বিজ্ঞানী কিভাবে নিশ্চিত হন যে তিনি যা পর্যবেক্ষণ করছেন, তা-ই সত্য। আমরা কি নিশ্চিত যে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো এই বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণা দেয়? যদি আমরা বিশ্বাস করি যে হ্যাঁ, সঠিক কাজ করছে, তবে হিগসের মতে এটি বিশ্বাসের বিষয়, যুক্তির বিষয় নয়। হিগস বস্তুত বলতে চেয়েছেন যেহেতু বিষয়টি বিশ্বাসের, সেহেতু এটি বিজ্ঞান নয়। প্রকৃতির স্বভাব নিরূপণ করতে গিয়ে আমরা যে বাস্তবতাকে দেখি, তা কল্পনাপ্রসূত হতে পারে।

হিগসের এই যুক্তি সেদিনের সভায় বিতর্কের ঝড় তুলেছিল।

হিগসের এই জিজ্ঞাসা দার্শনিকদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে দার্শনিক রেঁনে দেকার্ত দর্শনের দুটি সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। একটি হলো—আমরা কী জানতে পারি? এবং অন্যটি হলো—আমরা কিভাবে তা জানতে পারি? দেকার্ত তাঁর যুক্তি বিনির্মাণে কল্পনার সাহায্য নিয়েছিলেন এভাবে যে এক দৈত্য তাঁকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে কি জানা যাবে দৈত্য যা বলছে, তা প্রকৃত সত্য কি না। দেকার্ত চিন্তা করলেন দৈত্য কোন বিষয়টি তাকে বিশ্বাস করানোর মাধ্যমে বোকা বানাতে পারবে না। দেকার্ত তার উত্তর দিলেন এভাবে, ‘একটিমাত্র বিষয় আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে যদি আমি চিন্তা করি, তাহলেই আমার অস্তিত্ব আছে।’ দার্শনিক দেকার্তের ভাষায়, cogito ergo sum’   বা ইংরেজিতে বলা যায়,

I think, therefore I am.’  দেকার্ত এ কথা বলেই থেমে যাননি। তিনি সমস্যাটি অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করেন। দেকার্ত উল্লেখ করেন, আমরা যদি কোনো সদাশয় ঈশ্বরের কাছ থেকে আমাদের ইন্দ্রিয় পেয়ে থাকি, তাহলে এই ইন্দ্রিয় দ্বারা আমরা যে বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করব, তা সত্যি হবে। প্রশ্ন হলো, ঈশ্বর যদি সদাশয় না হন, যদি তিনি বোকা বানানোর চেষ্টা করেন, তাহলে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতার পর্যবেক্ষণ সত্য না-ও হতে পারে। এভাবে পর্যবেক্ষণের উভয়সংকটের মধ্যে পিটার হিগস যেতে চাননি। তাই তিনি তাঁর অধ্যয়ন ও গবেষণার জন্য তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানকে বেছে নেন। 

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের বরপুত্র পিটার হিগস১৯৬০ সালে হিগস এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন। হিগস সেখানে একাডেমিক জার্নাল রক্ষণাবেক্ষণের অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। ১৯৬১ সালের বসন্তকালে হিগস ফিজিক্যাল রিভিউ লেটারস জার্নালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত পদার্থবিদ ইওশিরো নামবুর  অতি পরিবাহী তত্ত্ব  (super conductivity)  দিয়ে মৌলিক কণার ভর পরিমাপ সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্র দেখতে পান। এই গবেষণাপত্রই হিগসের গবেষণার মূল বীজমন্ত্র। সাধারণ পরিবাহক; যেমন—তামার তার ও অতিপরিবাহকের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অতিপরিবাহককে ১৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে ফেলে ঠাণ্ডা করলে তার বিদ্যুৎ রোধের ক্ষমতা লোপ পায়। এই ধর্মের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন যে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় অতিপরিবাহক পদার্থের মধ্যে ইলেকট্রন কণা জোড়ায় অবস্থান করে। এই অবস্থায় অতিপরিবাহক পদার্থে কোনো ল্যাটিস  (lattice)  নেই বলে মনে হয়। এই অবস্থায় পদার্থ অধিফ্লুয়িডের (superfluid) মতো আচরণ করে। এই আচরণের কারণে শক্তির ক্ষয় না করে পদার্থ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। অতিপরিবাহকের মধ্যে রোধের ক্ষমতা লোপ পাওয়াকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন ভগ্ন প্রতিসাম্য। নামবু তাঁর গবেষণাপত্রে দেখান যে এই ভগ্ন প্রতিসাম্যই মহাবিশ্বে ভরশূন্য বস্তুকে ভর দান করে।

ইওশিরো নামবু তাঁর অতিপরিবাহী তত্ত্বের জন্য ২০০৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান। হিগস অতি দ্রুত অনুধাবন করেন যে কণা পদার্থবিজ্ঞান এই ভগ্ন প্রতিসাম্যের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে কোনো কণার ভরের কারণ ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

১৯৬৪ সালে গ্রীষ্মকালে অবকাশযাপন শেষে ফিরে এসে তাঁর এক ছাত্র লক্ষ করে যে তাঁর ডেস্কে রয়েছে একটি নোট, যাতে লেখা রয়েছে ‘This summer I have discovered something that is totally useless.’  এর নিচে পিটার হিগসের স্বাক্ষর। ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে হিগস ফিজিকস লেটার জার্নালে ৭৯ লাইনের একটি গবেষণাপত্রে ভগ্ন প্রতিসাম্যের বিষয়টি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন। এভাবেই তাত্ত্বিকভাবে হিগস বোসন ও হিগস ক্ষেত্রের (Higgs field) জন্ম হয়। এই বোসনের সঙ্গে ফার্মিয়ন কণার পার্থক্য হচ্ছে ঘূর্ণন মানের। যেমন—ইলেকট্রনের ঘূর্ণন মান ১/২, ফোটন কণার ঘূর্ণন মান  ১ এবং হিগস বোসন কণার ঘূর্ণন মান শূন্য।

এই গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ৪ জুলাই ২০১২ সালে সার্নের বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেন যে তাঁরা পৃথিবীর শক্তিশালী ত্বরকযন্ত্র বৃহৎ হেড্রন কলাইডারে এক নতুন কণার সন্ধান পেয়েছেন, যার সঙ্গে পিটার হিগসের ‘ঁংবষবংং’ ধারণার মিল রয়েছে। সার্নের মহাপরিচালক রল্ফ ডিটার হিউয়ার ঘোষণা দেন যে ‘ we have now found the last missing cornerstone of the standard model.’  হিউয়ার আরো জানালেন যে হিগস বোসন কণার ভর ১২৫ বিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্টের কাছাকাছি, যা প্রোটনের ভরের প্রায় ১৩৩ গুণ। সার্ন দুটি পরীক্ষা দ্বারা হিগস কণাকে শনাক্ত করে। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে তাঁদের প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। কয়েক বছর আগে রয়াল ইনস্টিটিউশনে প্রদত্ত বক্তৃতায় (যেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম) হিগস বলেছিলেন যে সম্ভবত আমার জীবদ্দশায় এই কণার সন্ধান মিলবে না। কারণ এর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী ত্বরকযন্ত্র, যার অর্থায়নে রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাব রয়েছে।

কণা পদার্থবিজ্ঞানে হিগস বোসন আবিষ্কার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই কণার আবিষ্কার প্রমাণ করে হিগসের ক্ষেত্রের অস্তিত্ব। এই ক্ষেত্র ব্যাখ্যা করে ভগ্ন প্রতিসাম্যের কলাকৌশল, যা থেকে পাওয়া যায় কোনো কণার ভর। সার্নের সামনে দাঁড়িয়ে সার্নের একদল বিজ্ঞানীকে (আমাদের গাইড) প্রশ্ন করেছিলাম, ‘হিগস বোসন কি কণা, না ক্ষেত্র?’ উত্তরে হিগস বললেন, ‘হিগস ক্ষেত্রকে যখন ঝাঁকুনি দেওয়া হয়, তখন তা থেকে বেরিয়ে আসে হিগস বোসন কণা।’ পিটার হিগস আজ আর আমাদের মাঝে নেই,  কিন্তু তাঁর গাণিতিক ভাবনা কণা পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় বলিষ্ঠ অবদান রেখে চলেছে।

লেখক : অধ্যাপক এবং বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা, যুক্তরাজ্য

 

মন্তব্য

আমেরিকার পারস্পরিক শুল্ক এবং বাংলাদেশ

    আব্দুল বায়েস
শেয়ার
আমেরিকার পারস্পরিক শুল্ক এবং বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসা মানে যেন পৃথিবীতে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া। এরই মধ্যে তাঁর কিছু পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী, এমনকি খোদ আমেরিকায়ও  নিন্দিত হয়েছে। তবে আমেরিকা ফার্স্ট প্রতিপাদ্যের প্রবর্তক ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তাঁর আগ্রাসী মনোভাবের ইঙ্গিত আগেরবার প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আঁচ করা গিয়েছিল।

বর্তমান সময়ে আগ্রাসী মনোভাব আরো বেগবান। সর্বশেষ যে বোমাটি তিনি ফাটালেন, তা হচ্ছে আমেরিকায় আমদানি পণ্যের ওপর শুল্কের হার বৃদ্ধি১০ থেকে ৪৮ শতাংশ। তাঁর এই পদক্ষেপ বর্তমান বিতর্কের বেদিতে অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রথম প্রতিক্রিয়া ডলারের জন্য দুঃসংবাদ।
বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক পরিকল্পনা ঘোষণা দেওয়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববাজারে বেড়েছে সোনার দাম। রয়টার্স জানাচ্ছে, প্রতি আউন্স (২৮.৩৫ গ্রাম) সোনার দাম পৌঁছেছে তিন হাজার ১২৯.৪৬ ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন লাখ ৭৬ হাজার ৮৯৯.৩৩ টাকা), যা আগের চেয়ে ০.৬ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সোনা ব্যবসায়ী তাই উওং রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে বলেন, নতুন এই শুল্ক পরিকাল্পনা আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আগ্রাসী। এই পরিকল্পনা কার্যকর করা হলে ভবিষ্যতে একদিকে বাজারে সোনার বিক্রি বাড়বে, অন্যদিকে ডলারের মান কমবে।

 

দুই

আন্তর্জাতিক পণ্য প্রবাহে কোনো একটি দেশ কর্তৃক শুল্ক আরোপ (আমদানি কর) কিভাবে আরোপকারী দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে, তা অর্থশাস্ত্রে সুন্দরভাবে বিধৃত আছে। প্রথমত, শুল্ক বসালে বা বৃদ্ধি করলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। বস্তুত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশসহ অনেক দেশ শুল্কপ্রাচীর সৃষ্টি করে। অন্যভাবেও রাজস্ব আদায় করা যায়, তবে তা রাজনৈতিক লাভালাভে সুবিধাজনক নয় বলে এই ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, শুল্কের ফলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পায়।

কারণ বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায়। তার মানে, অভ্যন্তরীণ শিশু শিল্প সুরক্ষায় বড় হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, শুল্ক আরোপ বা বৃদ্ধির ফলে ভোক্তার উদ্বৃত্ত (যে দামে কিনতে আশা করে এবং যে দাম দিতে হয় তাদের পার্থক্য) হ্রাস পায়। অন্যদিকে দেশীয় সরবরাহকারীর উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি পায় (যে দামে বিক্রি করতে আগ্রহী তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি)। শুল্ক আরোপের পেছনে আরো অনেক কারণ থাকে, তবে মুক্ত বাণিজ্য বা অবাধ বাণিজ্য হলে বাণিজ্যে নিয়োজিত দুই দেশের কল্যাণ অনেক বৃদ্ধি পায় বলে বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদ মনে করে থাকেন। থাক সে কথা।

 

তিন

তবে ট্রাম্প বলছেন, যেসব দেশের ওপর তিনি শুল্ক বাড়িয়ে দিলেন, সেসব দেশ আমেরিকায় উৎপাদিত পণ্য যত কেনে, তার চেয়ে তারা আমেরিকায় তাদের পণ্য বেশি বিক্রি করে অর্থাৎ আমেরিকার সঙ্গে এই প্রতিটি দেশ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত উপভোগ করছে। দেশগুলো আমেরিকার পণ্যের ওপর অনেক বেশি হারে শুল্ক আরোপ করে ওই সব দেশে আমেরিকার পণ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। অথচ আমেরিকার শুল্কের হার কম বিধায় অবাধে তাদের পণ্য আমেরিকায় ঢুকে আমেরিকার জন্য বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি করছে। এবং তা বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ। কাঁহাতক এই বৈষম্য! সুতরাং দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুল্ক-বোমাটি ফাটালেন এবং বলতে হয় হাটে হাঁড়িও ভাঙলেন।

 

চার

বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছেন। আগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে শুল্ক ছিল ১৫ শতাংশ, এর বিপরীতে বুধবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১০.৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২.২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশে আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলারের মতো। ধারণা করা যায়, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, তার মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য (খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম ও ভুট্টা), যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত পণ্য। আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি পণ্যের মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী, কৃষিপণ্য ইত্যাদি।

আমেরিকার পারস্পরিক শুল্ক এবং বাংলাদেশতবে কেবল বাংলাদেশই আঘাতপ্রাপ্ত নয় নয়া শুল্ক ব্যবস্থায়। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্ক পরিকল্পনায় এশিয়ার দেশগুলোর পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র সর্বনিম্ন ১০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। যেমনচীন ৩৪ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৪৬ শতাংশ, তাইওয়ান ৩২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৩২ শতাংশ, জাপান ২৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ড ৩৬ শতাংশ, মালয়েশিয়া ২৪ শতাংশ, কম্বোডিয়া ৪৯ শতাংশ, বাংলাদেশ ৩৭ শতাংশ, ভারত ২৬ শতাংশ, পাকিস্তান ২৯ শতাংশ, সিঙ্গাপুর ১০ শতাংশ, নেপাল ১০ শতাংশ, ফিলিপাইন ১৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৪৪ শতাংশ, মায়ানমার ৪৪ শতাংশ, লাওস ৪৮ শতাংশ। মনে রাখা দরকার, আমেরিকার সঙ্গে উল্লেখিত দেশগুলোর বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বিদ্যমান।

জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ভারতের ওপর, যার পরিমাণ ২৬ শতাংশ। এ ছাড়া বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর শুল্কের হার কম বলে মনে হয়। আর এই কম শুল্কের ফায়দা নিয়ে বাংলাদেশকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাকের বাজার ধরতে চায় কম শুল্কের দেশগুলো। এর মধ্যে অন্যতম দেশ নাকি ভারতএমন অভিযোগ করছে অনেকে। তবে মনে রাখা দরকার যে ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর আগেই শুল্কের হার অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল বলে সম্ভবত এবার কম।

 

পাঁচ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করার প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিস্তর মূল্যায়ন প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ বলছে ইতিবাচক দিকের কথা, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পাল্টাপাল্টি শুল্ককাঠামো বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে করা হয়েছে। এটি মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ কেউ কেউ ভাবেন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মার্কিন ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া। তাদের মনোভাব ও ভোগের আচরণ স্বল্পমেয়াদি রপ্তানিপ্রবণতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সম্পূর্ণভাবে শুল্ক কার্যকর করা হলে খুচরা পর্যায়ে কিছু অস্থিরতা দেখা যেতে পারে, যা প্রত্যাশিত। প্রতিটি দেশ যেভাবে এর প্রতিশোধ নেবে এবং প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা-ও বাণিজ্য গতিশীলতার পরবর্তী পর্যায়কে প্রভাবিত করবে বলে বলছেন কেউ কেউ।

এ ছাড়া পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভোক্তারা এমনিতেই কিনবে কম; এর জেরে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে শুল্কের হিসাবে ফাঁকি আছে। যেমন একটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে কোনো একটি শার্ট আগে ১০ ডলার দিয়ে ক্রয় করত মার্কিন ক্রেতারা। সেটি ক্রয়মূল্য কম দেখিয়ে শুল্কের ভারসাম্য সমন্বয় করবে। অথবা আগের ১০ ডলারের শার্টে শুল্ক দুই ডলার আসত। বর্তমানে আসবে চার ডলার। আগের চেয়ে দুই ডলার বেশি। ফলে শার্টের দাম ১২ ডলার করে সমন্বয় করবে। এর কারণ শুল্ক আরোপ করা হয় বন্দরে আমদানির সময়ের ক্রয়মূল্যের ওপর, বাজারমূল্যের ওপর নয়। আরেকটি সুবিধা হলো, বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, চীন বা এমনকি ভারত এখন উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে। ফলে তারা যতটা আক্রান্ত হবে, বাংলাদেশ ততটা হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।

 

ছয়

বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই পাল্টা শুল্ক বিশ্বকে বাণিজ্যযুদ্ধের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও মন্দা পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একাধিক বিশেষজ্ঞ ও বাজার সমীক্ষা সংস্থা। এরই মধ্যে তার লক্ষণ দেখা গেছে। ট্রাম্প যখনই শুল্ক নিয়ে কিছু বলেছেন বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন, তাত্ক্ষণিকভাবে মার্কিন শেয়ারবাজারে তার প্রভাব পড়ছে, সোনার দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী এবং ডলারের দামের ওপর নিম্নমুখী প্রভাবের কথা আগেই বলা হয়েছে।

তার পরও আমরা মনে করি, বাংলাদেশের উচিত হবে মার্কিন পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের হার ৭৪ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং আলোচনার বা দর-কষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করা। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে সেখানে রপ্তানি যোগ-বিয়োগ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই প্রক্রিয়ায় আমরা লাভবান হব। এমনটি মনে করছে অনেকেই।   

 

সাত

আমেরিকা ফার্স্ট বা জাতীয়তাবাদী স্লোগানের ওপর ভর করে পাল্টা শুল্ক বসানো আমেরিকাকে হয়তো স্বল্পকালীন স্বস্তি দেবে। এমনও হতে পারে যে অতি উৎসাহী ট্রাম্প সমর্থক তাঁকে গাধার পিঠে উল্টো বসিয়ে আনন্দ উপভোগ করবেন এবং পরবর্তী সময়ে হাসাহাসি হবে এ নিয়ে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা আমেরিকা কিংবা বিশ্ব কারো জন্যই কল্যাণকর নয়। পৃথিবীর সব দেশের উচিত হবে তাদের শুল্কের কাঠামো যৌক্তিক করা। বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে, তা কম মূল্য সংযোজক এবং এর চাহিদা স্থিতিস্থাপকতাও অপেক্ষাকৃত কম। সুতরাং ২০ ডলারের শার্ট খুচরা বাজারে ২৩ ডলার হলে আমেরিকার নিম্নবিত্ত শ্রেণি পালাই পালাই বলবে তেমনটি নয়, আবার ভারত, চীন কিংবা ভিয়েতনাম মূলত উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য (হাই ভ্যালু প্রডাক্ট) রপ্তানি করে বিধায় বাংলাদেশের বাজার হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা কম বলে মনে হয়। আখেরে নিজের দ্রব্য প্রতিযোগী করার বিকল্প নেই—‘সেই দিন নাইরে নাতি গাবুতগুবুত খাতি।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

মন্তব্য

ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন ও ইউনূস-মোদি বৈঠক

    ড. সুজিত কুমার দত্ত
শেয়ার
ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন ও ইউনূস-মোদি বৈঠক

গত ৩ ও ৪ এপ্রিল ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ বিমসটেক (বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) শীর্ষ সম্মেলন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার নেতারা অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে সম্মেলনের পার্শ্বক্রমে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যকার বৈঠক আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। সম্মেলনে সদস্য দেশগুলো বাণিজ্য ও পরিবহন সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেয়।

মায়ানমারে সংঘটিত ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে এবং সম্মিলিতভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে অনুষ্ঠিত আধাঘণ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি আঞ্চলিক কূটনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বেশ টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছিল।

শুধু অভিনন্দনবার্তা, স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির পক্ষ থেকে ইউনূসকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো ছাড়া আর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে ইউনূস-মোদি বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে পুনরায় কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের নৈশভোজেও ইউনূস ও মোদি পাশাপাশি বসেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলাপচারিতা হয়। এই ঘটনাও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলানোর ইঙ্গিত দেয়।

এই পরিস্থিতিতে ইউনূস-মোদি বৈঠকটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈঠকের পর বাংলাদেশের প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে পারস্পারিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রেস সচিবের মতে, বৈঠকটি অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ ছিল এবং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/1.Print/2025/04.April/06-04-2025/Sohan/kalerkantho-ed-2a.jpgইউনূস-মোদি বৈঠকের ফলাফল এবং এর প্রভাব আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর এই বৈঠকের প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈঠকে হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সীমান্ত হত্যা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হওয়ায় সীমান্ত হত্যা বন্ধে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন দুই দেশের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হওয়ায় সমস্যা সমাধানে নতুন করে আলোচনার পথ খুলেছে। তবে এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধান না হলে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।

বিমসটেক আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম। এই শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইউনূস-মোদি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় এই ফোরামের গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিমসটেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনূস-মোদি বৈঠকের ফলাফল এবং এর প্রভাব আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পুনরায় কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খুলেছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই আলোচনার ফলাফল নির্ভর করবে দুই দেশের সরকারপ্রধানদের সদিচ্ছার ওপর। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

বিমসটেক সদস্য দেশগুলো বাণিজ্য, পরিবহন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের চেয়ারম্যানশিপে এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে নতুন গতি আসবে বলে আশা করা যায়। তবে মায়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাও জরুরি। ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মায়ানমারের ভূমিকম্প ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে বিমসটেক সদস্য দেশগুলো উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

datta.ir@cu.ac.bd

মন্তব্য

ড. ইউনূসের আরো স্থায়িত্বের প্রশ্নে কিছু কথা

    গাজীউল হাসান খান
শেয়ার
ড. ইউনূসের আরো স্থায়িত্বের প্রশ্নে কিছু কথা

আজকাল কোনো রাজনৈতিক কথা বলা কিংবা লেখার ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়। কোনো ব্যাপারে বক্তা কিংবা লেখকের নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই একটি পক্ষ নির্ধারণের প্রবৃত্তি দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ বক্তা বা লেখক রাজনীতিগতভাবে কোন পক্ষের লোক, সেটি নির্ধারণের একটি প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এটি আমাদের পারস্পরিক সমঝোতা কিংবা বৃহত্তরভাবে বোঝাপড়ার অভাবেও হতে পারে।

একই রাজনীতি কিংবা দর্শনে বিশ্বাস করলেও বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন জনের কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিতেই পারে। এটিই আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অন্যদিকে গণতন্ত্রের একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। নিজেদের মধ্যে বহুমত বিরাজ করলেও বৃহত্তর সমঝোতা কিংবা অবাধ মতবিনিময়ের কারণে অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করেও হয়তো বা দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে একটি কমন প্ল্যাটফর্মে সমবেত হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে। কিংবা বাংলাদেশের বর্তমান চলমান রাজনীতিতে এ ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা ব্যত্যয় দেখা দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেড় দশক ধরে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেছে, তাদের মধ্যে বর্তমানে একটি সুস্পষ্ট মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এই মতবিরোধ দেশের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র মেরামত বা প্রয়োজনীয় সংস্কারকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচন। দুই দিন আগে হোক আর পরেই হোক, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দেশ পরিচালনার জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কোনো বিকল্প পথ নেই।

সুতরাং সে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে এসে যাতে সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই রাষ্ট্র মেরামত বা প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোর প্রশ্ন উঠে এসেছে। একাত্তরের পর থেকে, বিশেষ করে বিগত ১৮ বছরের আওয়ামী শাসনামলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে যেভাবে কবর দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে দূরীভূত করা। এই পর্বতপ্রমাণ কাজ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুসম্পন্ন হবেতার যেমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, তেমনি তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখতে হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা থাকতে পারে না। রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, বিচারিক কিংবা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যত সংস্কারই আনা হোক, তা একটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার (Trial and Error) মধ্যে চলতে থাকবে যতক্ষণ না সেসব সংস্কার জনগণের কাছে সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়।

নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় এসে যদি সব কিছু অর্থাৎ গণবিরোধী সব আইনকানুন বদলে ফেলতে পারতেন, তাহলে বিগত বছরগুলোতে এ দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন, দুর্নীতি এবং সম্পদ পাচারসহ একটি জাতি বিধ্বংসকারী অবস্থার সৃষ্টি হতো না।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদ কিংবা দুঃশাসন এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর পর্যায়ক্রমিক ব্যর্থতার কারণেই জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। সেই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে দেশের সর্বক্ষেত্রে যদি একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তনের ধারা লক্ষ করা না যায়, তাহলে বিগত ৫৩ বছরে রাজনীতির নামে এ দেশে যা হয়েছে, ভবিষ্যতেও দেশ আবার সেখানেই ফিরে যেতে বাধ্য হবে। এ দেশের রাজনীতিতে দু-একজন রাজনীতিক ছাড়া আর বাদবাকি সবার যোগ্যতা, আদর্শ ও মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সবাই অবগত রয়েছে। সে কারণেই দেশের রাজনীতিতে এবং রাজনীতিকদের মধ্যে একটি গুণগত পরিবর্তন আনা আবশ্যক। নতুবা জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। তবু শেষ পর্যন্ত দেশ রাজনীতিকরাই পরিচালনা করবেন। তাঁদের নেতৃত্বেই দেশ শাসিত হবে, পরিচালিত হবে এবং এগিয়ে যাবে। সে কারণেই যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের বেশ কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

https://asset.kalerkantho.com/public/news_images/share/photo/shares/1.Print/2025/04.April/06-04-2025/Sohan/kalerkantho-ed-2a.jpgঅর্থ-বিত্ত কিংবা সম্পদের মালিকরাই রাজনীতি করবেন, আর কেউ নয়সেটি আর চলতে দেওয়া যেতে পারে না। আজ যাঁরা দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং একটি বৃহত্তর সমঝোতার মাধ্যমে দেশের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য এগিয়ে যেতে হবে। মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাত কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না। সে জন্য বিভিন্ন সংকট নিরসনে এখনই বিভিন্ন দল ও নেতার মধ্যে ঘন ঘন অন্তর্দলীয় আলোচনা শুরু করতে হবে এবং গড়ে তুলতে হবে একটি সর্বদলীয় ঐক্য ও সমঝোতা। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি একটি ন্যূনতম ঐক্য, সমঝোতা ও সংহতি গড়ে না ওঠে, তাহলে বৈদেশিক শক্তি, যারা আমাদের পদানত করে শোষণ করতে চায়, তারা আবার অবাধে আমাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ইন্ধন জোগাতেই থাকবে। সে কারণেই দেশের অত্যাবশ্যকীয় সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচন নিয়ে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য ও সমঝোতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তা না করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান চলমান বিভেদ ও অনৈক্যকে আরো ব্যাপক এবং আত্মঘাতী করে তুলবে। এ দেশে রাজনীতি করতে হলে সবাইকে নিয়েই করতে হবে। কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না। সুতরাং সে জাতি গঠনমূলক এবং জাতীয় স্বার্থের রাজনীতিতে সবাইকে একদলীয় রাজনীতির মনোভাব দূর করতে হবে।

ওপরে উল্লিখিত বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে স্বদেশ থেকে পাঁচ হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত বিএনপি নেতা তারেক রহমান বহুদিন ধরে অনেক গঠনমূলক কথাবার্তা বলেছেন। অনেকে সেগুলোকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছে আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যক্তিস্বার্থ বা নেতৃত্বের টোপ হিসেবেও উল্লেখ করেছে। কিন্তু এই বিষয়টিকে গঠনমূলকভাবে জাতীয় স্বার্থের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করাই অত্যন্ত সমীচীন হবে বলে আমি মনে করি। আমি একজন সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমি আমার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে একটি কথাই বলতে চাইসব দল একসঙ্গে ক্ষমতায় যায় না। তবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে দেশের ছোট-বড় সব দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাহলেই রাজনীতির ক্ষেত্রে সাফল্য আসে। দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যায়। ফিরে আসি তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তিনি একটি সর্বদলীয় সরকার (নির্দিষ্ট সময়ের জন্য) গঠন করতে চান, যাতে শুরুতেই জাতীয় ঐক্য ও স্বার্থ বিনষ্ট না হয়। উপরন্তু আগামী নির্বাচনে তারেক রহমান নবগঠিত নাগরিক পার্টির সঙ্গে একটি জোট গঠনেরও বাসনা প্রকাশ করেছেন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনেক রাজনৈতিক প্রস্তাব আসা শুরু হয়েছে। এতে বিরোধিতা থাকবে না এমন নয়। জাতীয় স্বার্থে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ কিংবা কর্মসূচির গঠনমূলক সমালোচনা থাকতেই পারে। কেউ না কেউ সরকারি পদক্ষেপ বা কর্মসূচির বিকল্প লাভজনক পথও দেখাতে পারে। এতে জাতীয় স্বার্থে ঐক্য, সংহতি কিংবা সমঝোতা বিনষ্ট হবে না। তা ছাড়া নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির কয়েকজন নেতা নির্বাচনের পর দেশে রাজনীতির কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থার এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে সফল উত্তরণের জন্য অর্থাৎ মধ্যবর্তী সময়ের জন্য একটি ট্রানজিশনাল সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। গভীরে তলিয়ে দেখতে গেলে সে প্রস্তাব তারেক রহমানের প্রস্তাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কোনো মতবিরোধ আছে বলে মনে হয় না। মতবিরোধ যা-ই আছে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছা অসম্ভব নয়। তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার সূচনায় রাষ্ট্র মেরামতের প্রশ্নে তারেক রহমান তাঁর একটি সংস্কার প্রস্তাব সংবলিত ৩১ দফা ঘোষণা করেছিলেন, যার মধ্যে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট বিষয়বস্তু রয়েছে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। যত দিন কোনো জাতি বা রাষ্ট্র থাকবে, তত দিনই এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। তবে কথা হচ্ছে, অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে বর্তমানে রাষ্ট্র মেরামত বা জরুরি সংস্কারের যে বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলোকে তো অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এটি বিবেচনা করার সময় যাঁদের হাতে নেই, তাঁরা দীর্ঘ ১৮ বছর কোথায় ছিলেন?

দেশের আপামর জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতায় যোগ্য নেতৃত্বের অবস্থান কামনা করে। সে কারণেই অনেকে মনে করে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধ্যাপক ইউনূসের আরো কিছুটা সময় থাকা আবশ্যক। তাহলে দেশ ও জাতি একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। এটি কোনো অযৌক্তিক দাবি বা আকাঙ্ক্ষা নয়। কারণ ড. ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তি, যাঁর প্রতি দেশের জনগণ এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা রয়েছে। অন্যরা এই মুহূর্তে ক্ষমতায় আসীন হলে পতিত ফ্যাসিবাদীদের দোসর এবং আধিপত্যবাদী আন্তর্জাতিক মহলের চাপ নেওয়ার মতো শক্তি দেখাতে সক্ষম না-ও হতে পারে। এই কথাটি কি সার্বিকভাবে অস্বীকার করা যায়? যায় না। সুতরাং যাঁরা ড. ইউসূসের প্রতি আস্থা দেখাচ্ছেন, তাঁদের অপরাধটা কী? একাত্তর-পরবর্তী দেশীয় রাজনীতিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া ছাড়া কেউ তো তেমনভাবে কোনো আশার আলো দেখাতে পারেননি। এ ক্ষেত্রে বিএনপির কেউ কেউ যদি মনে করেন, তাঁরা অনেকেই শহীদ জিয়া কিংবা খালেদা জিয়ার মতো পরীক্ষিত নেতা হয়ে গেছেন, তাহলে সেটি হবে একটি দিবাস্বপ্নের মতো। তাঁদের প্রতি জনগণের তেমন আস্থা থাকলে তো বহু আগেই শেখ হাসিনার পতন ঘটত। সুতরাং সমালোচকের মুখে কথা তুলে না দিয়ে বাস্তববাদী হওয়া অনেক বুদ্ধিমানের কাজ। এ ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন, তা হচ্ছে দিব্যদৃষ্টি ও বাস্তববাদিতা। একটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল টিমকে মাঠে নামিয়ে খেলায় হেরে যাওয়ার চেয়ে বাছাইকৃত শক্তিশালী একটি টিমকে মাঠে নামিয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেওয়াই প্রকৃত ক্রীড়ামোদীদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক জনগণের লক্ষ্যও একটিই। বাংলাদেশকে জেতাতে হবে। সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করতে হবে। শত্রুর সব অপকৌশল ঠেকাতে হবে। দেশের অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করতে হবে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সমৃদ্ধির গতি বেগবান করতে হবে। তরুণদের দিয়ে সেটি সম্ভব। জরাগ্রস্ত বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের দিয়ে সেটি কতটুকু অর্জিত হতে পারে? এ কথা দেশপ্রেমিক জনগণ যতটা ভাবে, ক্ষমতালোভী দলীয় নেতাদের অনেকে মনকে সেটি বোঝাতে পারেন না।

এসব কারণে তরুণ নেতা তারেক রহমান চান জাতীয় ভিত্তিতে একটি বৃহত্তর ঐক্য, যা তাঁকে এবং দেশের তরুণ নেতৃত্বকে একটি বলিষ্ঠ নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করবে। লুকোছাপার কিছু নেই। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অনেকেই চায় অতি প্রয়োজনীয় বা আবশ্যকীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে অধ্যাপক ইউনূসের উল্লিখিত সময়ের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেওয়া হোক। তা থেকে বাছাইকৃত তরুণ নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে (দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কিংবা প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে) একটি মধ্যবর্তী কিংবা Transitional Governmentগঠন করা হোক, যার নেতৃত্বে থাকবেন ড. ইউনূস। তাঁকে যেকোনো একটি আসন খালি করে পাস করিয়ে আনা সম্ভব হবে। তা ছাড়া সেই সরকারের নেতৃত্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবেন তরুণ নেতা তারেক রহমান। তাঁকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাহায্য করবেন তরুণ নেতারা, যাঁদের দিনে দিনে যোগ্য রাজনীতিক ও নেতা হিসেবে গড়ে (প্রশিক্ষিত) তোলা যাবে। জামায়াতে ইসলামী কিংবা অন্যদের মধ্যে কেউ ইচ্ছা করলে বিরোধী দলের আসন অলংকৃত করতেও বাধা থাকবে না। দেশের বৃহত্তর বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী মহলের একটি বিশাল অংশের ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও সরকার গঠন নিয়ে চিন্তা-চেতনা এমনই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষককুল কিংবা শহর-নগরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের ধ্যান-ধারণাও এখন এভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে। এগুলো আমার কোনো ব্যক্তিগত অভিলাষ নয়।

লেখক, সাংবাদিক কিংবা বিশেষ করে কলাম লেখকরা যা শোনেন, যা দেখেন, সেটি নিয়েই লিখে থাকেন। এতে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। এর পেছনে দেশপ্রেম বা দেশের বৃহত্তর স্বার্থ ছাড়া আর যা-ই থাক, কোনো চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র নেই। দেশের সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই রাজনীতিকদের চেয়ে আগে ভেবে থাকে। তারা দেশের স্বার্থ, উন্নতি ও সমৃদ্ধি ছাড়া আর কিছুই চায় না। অন্যদিকে দেশের চিন্তাশীল মানুষ ও বুদ্ধিজীবীরা চান দেশের আর্থ-রাজনৈতিক সমৃদ্ধি ও মুক্তি। আধিপত্য কিংবা সম্প্রসারণবাদীদের প্রভাব কিংবা নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি দেশ, যেখানে থাকবে মানুষের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার। এবং ঘটবে অর্থনৈতিক মুক্তি কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ ও ছাত্র-জনতার।

 

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক

gaziulhkhan@gmail.com

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ