আফগানিস্তানের সংবিধানে ইসলাম ও শরিয়া আইন

আসআদ শাহীন
আসআদ শাহীন
শেয়ার
আফগানিস্তানের সংবিধানে ইসলাম ও শরিয়া আইন
পার্লামেন্ট ভবন, কাবুল, আফগানিস্তান। ছবি: সংগৃহীত

যেকোনো দেশ দখলের পর সাধারণত দখলদার শক্তি ওই দেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে থাকে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রও ব্যতিক্রম নয়। তারা আফগানিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে (যাতে ১২টি অনুচ্ছেদ ও ১৬২টি ধারা আছে), যা The Constitutional Loya Jirga  -এর ৫০০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি দ্বারা অনুমোদিত হয়। পরে ২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি কাবুলে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বাস্তবায়ন করেন।

এই সংবিধানে ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ভূমিকা থেকেই স্পষ্ট।

ভূমিকার সূচনা হয়েছে এভাবে : ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম, আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন, সালাত ও সালাম প্রেরিত নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তার সাথি-সঙ্গী ও অনুসারীদের প্রতি।’

ভূমিকার প্রথম অনুচ্ছেদে ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এই ভাষায়—‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস রেখে, তার ইচ্ছার প্রতি ভরসা করে এবং ইসলাম ধর্মকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।

অন্যদিকে শেষ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে এই বাক্যের মাধ্যমে—‘জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের প্রতি সম্মান প্রদর্শন।’

রাষ্ট্রের পরিচিতি

আফগান সংবিধানের প্রথম ধারায় রাষ্ট্রের পরিচিতি তার নামের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আফগানিস্তান একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।’

দ্বিতীয় ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইসলাম ধর্ম আফগানিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম।’ তবে একই সঙ্গে অন্য ধর্মের অনুসারীদের জন্য তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে (যা অবশ্যই আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে)।

সংবিধানের সপ্তম ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আফগানিস্তান জাতিসংঘ সনদ ও মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মেনে চলবে।’ এই ধারায় আরো জোর দেওয়া হয়েছে সন্ত্রাসবাদ, মাদক চাষ ও পাচার থেকে বিরত থাকার ওপর। এর পাশাপাশি সংযোজন করা হয়েছে ইসলামী ফিকহ (আইনশাস্ত্র) থেকে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা : ‘মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।’

অষ্টাদশ ধারায় নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘হিজরি বর্ষপঞ্জি হবে রাষ্ট্রের সরকারি বর্ষপঞ্জি এবং শুক্রবার হবে রাষ্ট্রের সাপ্তাহিক ছুটির দিন।’

১৯তম ধারায় রাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক নির্ধারণ করা হয়েছে।

  প্রতীকের শীর্ষ অংশে একটি ধর্মীয় বাক্য সংযোজন করা হয়েছে, যাকে ‘পবিত্র’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবার।’

২০তম ধারায় সংবিধান জাতীয় সংগীত সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করেছে। এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আল্লাহু আকবার’ বাক্যটি অবশ্যই জাতীয় সংগীতে থাকতে হবে।

এটি স্পষ্ট যে ইসলাম ধর্ম রাষ্ট্রের প্রতিটি দিক ও আনুষ্ঠানিক প্রতীকের কেন্দ্রে আছে। রাষ্ট্রের পরিচিতি, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় প্রতীক—সব কিছুতে ইসলামের সুস্পষ্ট উপস্থিতি আছে।

শরিয়া ও আইন

তালেবান আন্দোলনের মুখপাত্র ঘোষণা করেছেন, ‘শরিয়া আফগানিস্তানের লেনদেন ও কার্যক্রম পরিচালনার মূল ভিত্তি হবে।’ এই ঘোষণা একটি যৌক্তিক প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করে, আফগানিস্তানে কি এমন কোনো আইন ছিল, যা শরিয়ার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ?

বিশেষ করে যখন বর্তমান সংবিধানের তৃতীয় ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আফগানিস্তানে কোনো আইন ইসলাম ধর্মের নীতিমালা ও আদেশের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হতে পারবে না।’

আফগান সংবিধানের ধারা-১৩০-এ আরো নিশ্চিত করা হয়েছে যে কোনো আদালত যদি কোনো মামলা নিষ্পত্তির জন্য লিখিত আইনে কোনো বিধান না পায়, তাহলে তারা হানাফি ফিকহের আলোকে সেই বিরোধ মীমাংসা করবে। তবে যদি বিবাদকারীরা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হয়, সে ক্ষেত্রে শিয়া ফিকহের ভিত্তিতে বিরোধের সমাধান করা হবে।

এখানে স্পষ্টভাবে সংবিধান আইন প্রণেতাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, ‘কোনো আইন শরিয়ার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হতে পারবে না।’ একই সঙ্গে বিচার বিভাগের জন্যও সীমা নির্ধারণ করেছে যে তারা শরিয়ার বাইরে যেতে পারবে না।

এটি এমন একটি মূলনীতি, যা সংবিধানের ধারা-১৪৯-এ অপরিবর্তনীয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ধারাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, ‘ইসলাম ধর্মের নীতিমালা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলোর সংশোধন অনুমোদনযোগ্য নয়।’

সংবিধানে রাজনৈতিক দল ও শীর্ষ পদসমূহ

আফগান সংবিধান নাগরিকদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বেসরকারি সংগঠন বা রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার। তবে সংবিধানের ধারা-১৩৫-এ এই স্বাধীনতার ওপর কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শর্তটি হলো, ‘কোনো সংগঠন বা দলের ঘোষণাপত্র ও চার্টার ইসলাম ধর্মের নীতি এবং সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হতে পারবে না।’

রাষ্ট্রের শীর্ষ পদগুলোর ক্ষেত্রে, আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আংশিক রাষ্ট্রপতিশাসিত বা আধা-রাষ্ট্রপতিশাসিত হিসেবে বর্ণনা করা যায়, যেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অন্যান্য সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগের জন্য একটি মৌলিক শর্ত হলো, তাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের আগে রাষ্ট্রপতিকে একটি নির্দিষ্ট শপথ গ্রহণ করতে হবে, যা নিম্নরূপ :

‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আমি আল্লাহ তাআলার নামে শপথ করছি যে আমি ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুগত থাকব এবং তা রক্ষা করব। সংবিধান ও অন্যান্য আইনের প্রতি সম্মান দেখাব এবং সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব। আফগানিস্তানের স্বাধীনতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করব। আল্লাহর সাহায্য এবং জাতির সমর্থন নিয়ে আমি আফগান জনগণের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাব।’

সংবিধানের ধারা-৭৪-এ মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথের ফরম্যাট প্রায় একই রকম রাখা হয়েছে। তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সংযুক্ত করা হয়েছে—‘ইসলাম ধর্মের সুরক্ষা’।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের জন্য সংবিধানের ধারা-১১৮-তে কয়েকটি যোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তৃতীয় শর্তটি হলো, ‘তাদের অবশ্যই আইন বা ইসলামী ফিকহ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা থাকতে হবে।’

সংবিধানের ধারা-১৯০-এ বিচারকদের শপথের নির্দিষ্ট ফরম্যাট উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিম্নরূপ :

‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আমি আল্লাহ তাআলার নামে শপথ করছি যে আমি ইসলাম ধর্মের নীতি এবং এই সংবিধান ও আফগানিস্তানের অন্যান্য আইন অনুযায়ী সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে আমার বিচারিক দায়িত্ব পালন করব। আমি আমার কাজ সম্পূর্ণ সততা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সম্পন্ন করব।’

এখানে দেখা যায়, সংবিধান আফগানিস্তানের শীর্ষ পদগুলোর নিয়োগ, যোগ্যতার শর্ত এবং শপথগ্রহণের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মকে সর্বত্র প্রাধান্য দিয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই। প্রতিটি স্তরে ইসলামী মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় আদর্শের সুস্পষ্ট উপস্থিতি আছে।

শিক্ষা সংবিধান

এটি সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয় যে আধুনিক রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা শিক্ষার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার দাবি করে, যাতে কোনো ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক পরিচিতি প্রকাশ না পায়। কিন্তু আফগানিস্তানের বর্তমান সংবিধান এতে বিপরীতভাবে কাজ করেছে। সংবিধানের ধারা-১৭-তে শিক্ষা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং এতে বলা হয়েছে, ‘ধর্মীয় শিক্ষার উন্নতি করা, মসজিদ, ধর্মীয় স্কুল তথা মাদরাসা এবং ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর (মারকাজ) অবস্থা সংবিধানিকভাবে সংগঠিত ও উন্নত করা।’

এবং সংবিধান এখানেই থেমে থাকেনি, ধারা-৪৫-এ আরো স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রকে এমন একটি একক শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ইসলাম ধর্মের নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে।’

নারীবাদ এবং গণতন্ত্র সংবিধান

নারীর অবস্থান সংক্রান্ত বিষয়ে সংবিধানে সাধারণ নাগরিকত্বের অধিকার হিসেবে ধারা-২২-এ উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নারীদের সমান অধিকার ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে সংবিধান এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এটি শরিয়ার সঙ্গে বিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করতে বাধা দেয়। সুতরাং এটি একটি সমতা প্রদান করেছে, যা শরিয়াভিত্তিক।

ধারা-৪৪-এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র নারীশিক্ষা উন্নত করার জন্য কার্যকর কর্মসূচি তৈরি করবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত শিক্ষার মধ্যে মূল ফোকাস হবে।’

তথ্যসূত্র:

World Intellectual Property Organization, The Constitution and Laws of the Taliban, The Constitution of Afghanistan

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

শরিফ আহমাদ
শরিফ আহমাদ
শেয়ার
ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

ঘরবাড়ি প্রত্যেক মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র।‌ দিনশেষে ক্লান্তির শেষ ঠিকানা। ঘরে ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে পরিবারে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে। পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

সুন্দর মন-মানসিকতায় ঘরগুলো দুনিয়ায় জান্নাতের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাই এ বিষয়ে সব নারী-পুরুষের সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ঈমান-আকিদা পরিশুদ্ধ করা

নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধ রাখা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা ঈমান-আকিদা সঠিক না হলে কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।

তবে নারীদের ঈমান-আকিদা শুদ্ধ রাখার গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ তারা পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের অন্যতম স্তম্ভ। বিশুদ্ধ ঈমান আমলের অধিকারীদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উত্কৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব।
’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)

নামাজের স্থান নির্দিষ্ট করা

ইসলাম নারীদের জন্য বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার বিধান দিয়েছে। নামাজের ক্ষেত্রে ঘরের অভ্যন্তরীণ স্থানকে সর্বোত্তম বলেছে। এটি তাদের ইজ্জত, পর্দা ও সম্মান রক্ষার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রা.)-এর স্ত্রী উম্মে হুমাইদ একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়তে আমার ভালো লাগে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তা আমি জানি।

তবে শোন, তোমার জন্য তোমার ঘরের অভ্যন্তরে নামাজ পড়া বারান্দার কামরায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।

আবার বারান্দার কামরায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। এবং তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম, একইভাবে তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়া তোমার জন্য আমার মসজিদে এসে আমার সঙ্গে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শোনার পর তিনি পরিবারের লোকদের ঘরের ভেতরে নামাজের স্থান বানাতে বলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হলো। এরপর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই নামাজ পড়তে থাকেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২২১৭)


দোয়া ও জিকিরের আমল

বেশির ভাগ সময় নারীরা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রয়োজনীয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোয়া ও জিকির করা যায়। এতে তাঁদের আত্মিক প্রশান্তি ও ঈমানের দৃঢ়তা এনে দেয়। আল্লাহর ভালোবাসা ও রহমত লাভের পথ সুগম করে। প্রিয় নবীর প্রিয় পরিবারে সকাল-সন্ধ্যায় আমলের পরিবেশ ছিল। জুওয়াইরিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যুষে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। যখন তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন তখন তিনি নামাজের জায়গায় ছিলেন। এরপর তিনি চাশতের সময়ের পর ফিরে এলেন। তখনো তিনি বসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম তুমি সেই অবস্থায়ই আছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি তোমার নিকট থেকে যাওয়ার পর চারটি কালেমা তিনবার পাঠ করেছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সঙ্গে ওজন করলে এই কালেমা চারটির ওজনই বেশি হবে। কালেমাগুলো এই—‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিদা নাফসিহি ওয়া ঝিনাতা আরশিহি ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৫)

উন্নত আখলাক ও চরিত্র গঠন

ঘরবাড়িতে ইবাদতময় পরিবেশ তৈরিতে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত আখলাক ও চরিত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতির সবক শেখায়। এর উল্টো চিত্র হলে কখনোই ঘর কুসুম কাননের সৌরভে ভরা সম্ভব নয়। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো, অমুক মহিলা দিনে রোজা রাখে আর সারা রাত ইবাদত-বন্দেগি করে। কিন্তু সে কটু কথা বলে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো লাভ নেই—সে জাহান্নামে যাবে। আর এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো যে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে এবং যথাসাধ্য দান-সদকা করে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে জান্নাতে যাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৩০২)

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
শেয়ার
রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

রমজান মাস এবং ফরজ রোজা শেষ হলেও বছরজুড়ে বিভিন্ন রোজা রয়েছে। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সেসব রোজার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রোজার বিবরণ নিম্নরূপ—

১. এক দিন পর পর রোজা

এক দিন পর পর রোজা রাখাকে সাওমে দাউদ বলে। দাউদ (আ.) এভাবে রোজা রাখতেন।

নবী (সা.) এটিকে সর্বোত্তম রোজা বলেছেন এবং বেশি রোজা রাখতে আগ্রহীদের এভাবে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ১৮৭৮; মুসলিম, হাদিস : ২৭৯৩)         

২. সপ্তাহের রোজা

সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা রাসুল (সা.) পছন্দ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার (বান্দার) আমল (আল্লাহর কাছে) উপস্থাপিত হয়। আমি পছন্দ করি যে রোজা অবস্থায় আমার আমল উপস্থাপন হোক।

(তিরমিজি, হাদিস : ৭৪৭)

৩. মাসের রোজা

প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজাকে আইয়ামে বিজের রোজা বলে। নিয়মিতভাবে এই তিন দিনের রোজা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (বুখারি, হাদিস : ১৮৮০)

৪. আশুরার রোজা

মহররম মাসের ১০ তারিখ হলো আশুরা। রমজানের রোজা ফরজ হওয়া আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা অর্থাৎ আশুরার রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজ। (মুসলিম, হাদিস : ২৮১২)

৫. শাবান মাসের রোজা  

নবী (সা.) শাবান মাসে খুব বেশি পরিমাণে রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে বেশি রোজা পালন করেননি। তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা পালন করতেন।

(বুখারি, হাদিস : ১৮৬৯; মুসলিম, হাদিস : ২৭৭৯)

৬. শাওয়াল মাসের রোজা

রমজানের পর শাওয়াল মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখে, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন বছরজুড়ে রোজা রাখে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮১৫)

৭. জিলহজ মাসের রোজা

জিলহজ মাসের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত মোট ৯টি রোজার ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছর রোজার সমতুল্য। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৫৮)

জিলহজ মাসের নবম দিন হলো আরাফার দিন। এই দিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আশা করি আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ব ও পরের এক বছরের পাপ মোচন করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮০৩)

৮. মানতের রোজা

রোজাসহ কোনো কিছুর মানত করলে তা পূরণ হলে মানতকারীর ওপর রোজা পালন করা অপরিহার্য। নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে নির্দিষ্ট দিনে আর অনির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে যেকোনো দিনে রোজা পালন করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের উচিত মানতকে পুরা করা।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৯)

৯. কাজা রোজা

যৌক্তিক ও সংগত কারণে রমজানের রোজা আদায় করতে না পারলে পরে তার কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে। আর কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পুরো করবে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)

১০. কাফফারার রোজা

স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাজাসহ কাফফারা হিসেবে লাগাতার ৬০টি রোজা রাখতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (সা.) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিসে তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, রমজানে রোজা অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার দাস মুক্তির সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে পারবে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। (বুখারি, হা: ১৮৩৪; মুসলিম, হা: ২৬৫১)

এ হাদিস থেকে স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারার বিধান প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজের কাফফারায় রোজা পালন করার বিধান রয়েছে।

মন্তব্য

রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
শেয়ার
রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

চলে গেল বছরের সেরা মাস ‘রমজান’। রমজানের বিদায়ে মসজিদে মুসল্লির ভিড় দেখা যাচ্ছে না! রমজানের বিদায়ে কি নামাজও হলো বিদায়? রমজানের পর অনেকে নামাজ ছেড়ে দেন, এটা দুঃখজনক! বরং সারা বছর রমজানের অর্জনগুলো চর্চায় রাখতে হবে। যেমন—

১. ধর্মভীরুতা : রমজান মানুষের মধ্যে ‘তাকওয়া’ (ধর্মভীরুতা) সৃষ্টি করেছিল। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো, যেমন ভয় করা উচিত এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।

’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১০২)

আয়াতে বর্ণিত ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো’ এবং ‘মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না’ বাণীদ্বয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লামা বায়যাভির (রহ.) মতে, তাকওয়ার সোপান তিনটি—(ক) শিরক থেকে বিরত থাকা (খ) সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা (গ) পাপের ভয়ে বৈধ কাজও পরিহার করা।

২. ধৈর্য : রমজান মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। শান্তিতে, সংগ্রামে, রোগ-যন্ত্রণায়, দুঃখ-শোক, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় তথা জীবনের সব প্রতিকূল ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনন্ত সংগ্রাম করাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের প্রতীক।

সুরা বাকারার  ১৫৫ ও ১৫৬ নম্বর আয়াতে ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রের বর্ণনা আছে : (ক) ভয়, (খ) ক্ষুধা, (গ) সম্পদহানি, (ঘ) প্রাণহানি, (ঙ) শস্যহানি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা ধৈর্যশীল থাকে অভাব-অভিযোগে, রোগশোকে এবং রণক্ষেত্রে...’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭৭)

মুফতি মুহাম্মদ শফির (রহ.) মতে, ধৈর্য বা সবর তিন প্রকার—

১.   নফসকে (প্রবৃত্তি) হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা।

২.   আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা।

৩.   যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা।

৩. সহানুভূতি : হাদিসের ভাষায় সহানুভূতির মাস রমজান। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো এবং সহিষ্ণুতায় পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করো; সহিষ্ণুতার বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ২০০)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও ধর্মভীরুতায় একে অন্যকে সহযোগিতা (প্রতিযোগিতা) করবে... আল্লাহকে ভয় করে চলো...’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

৪. পাপ পরিহার : রমজান মানুষের ষড়রিপুর বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় নবীর (স.) ভাষায় ‘রোজা ঢালস্বরূপ’। অথচ সিয়াম সাধনার দ্বারাও যারা মিথ্যা পরিহারের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন ‘তাদের পানাহার পরিত্যাগের কোনোই মূল্য নেই।

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘তোমরা মিথ্যার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা, মিথ্যা পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি)

৫. কথাবার্তায় সংযম : রোজা মানুষকে কথাবার্তায় সংযমী করে। আমরা যা কিছু বলি, যা কিছু করি মহান আল্লাহ সবই জানেন, দেখেন, বোঝেন এবং বলেন ‘মানুষ যে কথাই বলুক না কেন তার কাছে একজন দৃষ্টিপাতকারী প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া করা কুফরি।’ (বুখারি)

এখন ভাবা উচিত রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে কতটুকু?

৬. তাওবা : তাওবার মাস রমজান। তাওবার গুরুত্ব অপরিসীম। রমজানের শিক্ষা, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না...’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান দোষ-ত্রুটিপূর্ণ ও অপরাধী, আর অপরাধীর মধ্যে ওই সব লোক উত্তম, যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি)

৭. দোয়া : দোয়া কবুলের মাস রমজান। আমাদের কর্তব্য, সারা বছর সমর্পিতচিত্তে দোয়া করা। দোয়া অর্থ ডাকা বা চাওয়া। মহান আল্লাহর বাণী ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৬)

পবিত্র কোরআন-হাদিসে ও বুজুর্গাণের বহুল চর্চিত-পরীক্ষিত আমলে দোয়ার শক্তির ধারণা মেলে। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)

৮. তিলাওয়াত : রমজানে আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করেছি। রমজানের পরও উচিত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস বজায় রাখা। পবিত্র কোরআন ও রমজানের প্রাণোচ্ছাসে মুজাদ্দিদ আলফিসানির (রহ.) নিবেদন :

‘এ আবে হায়াত থেকে পিপাসা চাহি না মিটাতে কভু

এর মাঝে যেন হরদম মোর তৃষ্ণা বাড়ান প্রভু।’

মন্তব্য

৩ আমলের মাধ্যমে রমজানের আমলের ধারাবাহিকতা

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
শেয়ার
৩ আমলের মাধ্যমে রমজানের আমলের ধারাবাহিকতা

ঈমান ও আমলের প্রশিক্ষণকাল ছিল পবিত্র রমজান। রমজানে মুমিন পুণ্যের অনুশীলন করে এবং বছরের অন্য দিনগুলোতে সে অনুসারে আমল করে। যে ব্যক্তি নেক আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে প্রকৃতপক্ষে সে-ই রমজানের শিক্ষা ধারণ করতে পেরেছে।

ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক কেন

মুমিন কোনো আমল শুরু করার পর তা ত্যাগ করে না।

কেননা তা ত্যাগ করার অর্থ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা। এ ছাড়া মহানবী (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি (সা.) কোনো আমল করলে তা নিয়মিতভাবে করতেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৮)
মুমিনের ইবাদত মৃত্যু পর্যন্ত

ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম।

আর এটাই মুমিনজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাই মৃত্যু পর্যন্ত মুমিন ইবাদতের প্রতি যত্নশীল থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৯)

আমল ছেড়ে দেওয়া নিন্দনীয়

কোনো আমল শুরু করার পর তা  ত্যাগ করা নিন্দনীয়।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রা.) বলেন, আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আবদুল্লাহ! অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না। সে তাহাজ্জুদ আদায় করত, অতঃপর তাহাজ্জুদ ত্যাগ করেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫২)

শৈথিল্য শয়তানকে প্রলুব্ধ করে

আমল শুরু করার পর কেউ তাতে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে শয়তান প্রলুব্ধ হয় এবং ব্যক্তি শয়তানের শিকারে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদেরকে সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমি দিয়েছিলাম নিদর্শন, অতঃপর সে তাকে বর্জন করে, পরে শয়তান তার পেছনে লাগে। আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।

’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৫)

যেভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, তিন কাজের মাধ্যমে মুমিন আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে। তা হলো—

১. আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা : মুমিন নিজের ওপর আস্থা না রেখে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে এবং আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় তাঁর কাছে সাহায্য কামনা করবে। পবিত্র কোরআনে দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করবেন না এবং তোমার কাছে থেকে আমাদেরকে করুণা দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত প্রার্থী। কাজেই আমাকে এক পলকের জন্যও আমার নিজের কাছে সোপর্দ করবেন না এবং আমার সব কিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে দিন। আর আপনিই একমাত্র ইলাহ।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৫০৯০)

২. সর্বোচ্চ চেষ্টা করা : আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার পাশাপাশি মুমিন তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখবে। কেননা যে ব্যক্তি নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় চেষ্টা করবে, তার জন্য আল্লাহর অঙ্গীকার হলো, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে থাকেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)

৩. পুণ্যবানদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা : প্রবাদ রয়েছে, সৎসঙ্গে সর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। অর্থাৎ পুণ্যবানদের সান্নিধ্য মানুষকে পুণ্যের কাজে উদ্বুদ্ধ করে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মানুষ আল্লাহওয়ালা ও নেককার মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও এবং যারা রুকু করে তাদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৪৩)

ধারাবাহিকতা রক্ষার পুরস্কার জান্নাত

কোনো নেক আমল শুরু করার পর তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বিশেষত ঈমান ও আমলের ওপর দৃঢ়তার পুরস্কার জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা ফরমায়েশ করো। এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩০-৩২)

আল্লাহ সবাইকে আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষার তাওফিক দিন। আমিন।

 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ