আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা তথা যৌন মেলামেশা এ রোগ ছড়ানোর অন্যতম কারণ। তা ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক, তোয়ালে ব্যবহারের মাধ্যমে অথবা জীবাণুযুক্ত কোনো বস্তুর সংস্পর্শে এলে মাংকিপক্স ছড়াতে পারে। মাংকিপক্স আক্রান্তের সর্দি-কাশি থেকেও এই রোগ ছড়াতে পারে। আক্রান্ত প্রাণীকে স্পর্শ করা অথবা আক্রান্ত বন্য প্রাণীর মাংস ভালোভাবে রান্না না করে খেলে এই রোগ হতে পারে।
মাংকিপক্সে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৬ থেকে ১৩ দিনের মধ্যে, ক্ষেত্রবিশেষে ৫ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর নয় এবং লক্ষণগুলো সাধারণত ১৪-২১ দিন স্থায়ী হয়। মাংকিপক্সে আক্রান্ত রোগীর শুরুতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, মাথা ব্যথা, মাংসপেশি ব্যথা, পিঠে ব্যথা, অত্যধিক ক্লান্তি ও অবসাদগ্রস্ততা, দুর্বলতা প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে দেখা দেয়।
প্রথমে মুখে এবং পরে শরীরের অন্যান্য অংশে বেদনাদায়ক ফুসকুড়ি বা গুটি বসন্তের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। গুটি বসন্তের সঙ্গে মাংকিপক্সের প্রধান পার্থক্য হলো, মাংকিপক্সে আক্রান্ত ব্যক্তির লসিকাগ্রন্থি (গলায়, বগলে ও কুঁচকিতে কিছু গ্রন্থি) ফুলে যায়, যা গুটি বসন্তে দেখা যায় না। সাধারণত প্রথম লক্ষণ শুরু হওয়ার ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে রোগীর শরীরে লাল র্যাশ দেখা দিতে পারে। এগুলো সাধারণত মুখে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়ায়।
র্যাশগুলো ধীরে ধীরে ফুসকুড়িতে পরিণত হয় এবং কিছুদিনের মধ্যে সেখানে পুঁজ জমতে পারে। সম্প্রতি মাংকিপক্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যৌনাঙ্গ ও পায়ুপথের আশপাশে ফুসকুড়ি সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা গেছে। এ ফুসকুড়িগুলো পরে ফোসকায় পরিণত হয় এবং প্রচুর পরিমাণে চুলকানি ও ব্যথা হয়।
মাংকিপক্সের উপসর্গ প্রকাশ পেলে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে। সাধারণত ২ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে এগুলো নিজে থেকেই শুকিয়ে যায় এবং রোগী সুস্থ হয়ে যায়। এ রোগের উপসর্গগুলো সাধারণত মৃদু আকারে প্রকাশ পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে শিশু, গর্ভবতী বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এ রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাংকিপক্সের কারণে শরীরে কিছু জটিলতা দেখা যায়। যেমন : শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে (ফুসফুস, ব্রেন ও চোখ) ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে। চোখের কর্নিয়ায় ইনফেকশন ছড়িয়ে গেলে রোগী দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলতে পারে।
তাই কারো শরীরে ফুসকুড়ি এবং সঙ্গে জ্বর, অবসাদগ্রস্ততা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাংকিপক্স ভাইরাসের পরীক্ষা করাতে হবে। মাংকিপক্স শনাক্তের ক্ষেত্রে পিসিআর পরীক্ষাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এ ক্ষেত্রে ত্বকের ক্ষতস্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ েছাড়া বায়োপসির মাধ্যমেও এ রোগটি নির্ণয় করা সম্ভব। মাংকিপক্স ভাইরাসে পুরোপুরি নিশ্চিত আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই শরীরের ফুসকুড়ি ঝরে যাওয়া পর্যন্ত আলাদা স্থানে অবস্থান করতে হবে এবং সব ধরনের শারীরিক মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে হবে। মাংকিপক্স রোগের প্রকোপ কমাতে চিকিৎসকের দেওয়া পরামর্শ মেনে চলতে হবে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির সেবাদানকারীকে অবশ্যই যথাসম্ভব নিজেকে সুরক্ষার কলাকৌশল অবলম্বন করতে হবে।
মাংকিপক্সে আক্রান্ত হলে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এমনকি কোনো বাচ্চা এ রোগে আক্রান্ত হলে তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে বাচ্চাদের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণের হার একেবারেই কম। এই ভাইরাস এতই বিরল যে এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের সুস্থ করার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। নেই কোনো সঠিক ওষুধ। তাই সব রোগের ক্ষেত্রেই চিকিৎসা থেকে রোগ প্রতিরোধ করা উত্তম। কিছু সাধারণ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে মাংকিপক্স থেকে বেঁচে যাওয়া সম্ভব।
যেভাবে মাংকিপক্সের সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকবেন
১. যেসব প্রাণীর মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় (ইঁদুর, বেজি, কাঠবিড়ালি, বানর) তাদেরকে স্পর্শ করবেন না। এ ছাড়া যেকোনো অসুস্থ, বন্য বা মৃত প্রাণী স্পর্শ করা থেকে দূরে থাকবেন।
২. মাংকিপক্সের উপসর্গ রয়েছে, এমন ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থেকে কথা বলা এবং শারীরিক সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকবেন।
৩. আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক, তোয়ালে ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত না করে স্পর্শ করবেন না।
৪. কম রান্না করা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
৫. কোনো পরিবারে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা কক্ষে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সময় পিপিই ব্যবহার করবেন এবং পরিবারের সবাই মাস্ক ব্যবহার করবেন।
৬. যেহেতু শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এ রোগটি ছড়িয়ে থাকে, তাই অবশ্যই সার্জিক্যাল মাস্ক পরিধান করবেন।
৭. এ ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের মতোই নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অথবা হ্যান্ডস্যানিটাইজার দিয়ে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করবেন। বিশেষ করে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন মানুষ বা প্রাণীর সংস্পর্শে গেলে সঙ্গে সঙ্গে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলবেন।
৮. যে ভ্যাকসিন দিয়ে গুটি বসন্ত সমূলে উৎপাটন করা হয়েছিল, একই ভ্যাকসিন মাংকিপক্স থেকেও প্রায় ৮০ শতাংশ সুরক্ষা দেয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে।
মাংকিপক্স নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের দেশে এখনো এই ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, যেন এই রোগের বাহক আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে। এ ব্যাপারে আমাদের বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এবং করোনায় মেনে চলা সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আমরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধেও সুরক্ষিত থাকতে পারব।