একজন গল্পকার শুধু চরিত্র সৃষ্টি করেন না, বরং জীবনের টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলোকে কাগজের পাতায় বন্দি করেন, পাঠককে নিয়ে যান বাস্তবতার গভীরে কিংবা কল্পনার অতল গহ্বরে। মোস্তফা মামুন সেই বিরল গল্পকারদের একজন, যিনি গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরও অনেক গল্পের সন্ধান দেন এবং জীবনের চেনা-অচেনা পরতগুলোর মধ্যে থেকে গল্প তুলে আনতে তিনি ওস্তাদ।
এবারের বইমেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘সেরা দশ গল্প’। নাম শুনেই বোঝা যায়, এটি লেখকের নিজস্ব নির্বাচিত গল্পের এক সংকলন।
কিন্তু কেন এই দশ? এগারো বা বারো কেন নয়? কিংবা পনেরো? লেখকের ভাষায়, গল্প বাছাই সবসময়ই এক দোদুল্যমান দ্বন্দ্ব। যেকোনো সৃষ্টিশীল মানুষের মতোই তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন, গল্পের তালিকা যত বড় হবে, ততই নতুন কোনো গল্পের জন্য জায়গা করে দেওয়ার ইচ্ছা আসবে।
বইয়ের সূচনা হয়েছে ‘পলাতক বীর’ দিয়ে— এক পালিয়ে বেড়ানো মানুষের গল্প, যা কেবল একজনের নয়, বরং বহু মানুষের, হয়তো সবারই। পালিয়ে যাওয়াটাই কি আসল সমস্যা, নাকি যারা থেকে যায়, তাদের নিয়েই সমস্যা? এই প্রশ্ন লেখক ছুঁড়ে দেন পাঠকের দিকে, আর পাঠক নিমগ্ন হয়ে যান গল্পের গভীরে।
এরপর আছে ‘পিস্তলধারী পাওনাদার’, যা একসময় সংকলনে ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ নামে স্থান পেয়েছিল। লেখক নিজেই স্বীকার করেন, সেকেন্ড ইন কমান্ডদের প্রতি তাঁর আলাদা ভালোবাসা আছে। যারা সামনে আসে না, অথচ সামনে থাকা মানুষটিকে তৈরি করে, এই গল্প যেন তাদেরই প্রতি এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধা।
‘সালাম’ এবং ‘আমার ভাই তোমার ভাই’— দুটি গল্পই রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রচিত, যেখানে নিষ্ঠুরতার বাস্তবতা, ক্ষমতার গোলকধাঁধা আর মানবিকতার ক্ষীণ আলোকরশ্মি পাশাপাশি হেঁটে চলে।
তারপর আছে ‘বেকার মামা’ এবং ‘বুলেট ভাইয়ের সমিতি’। লেখক কিশোরদের জন্য বহু গল্প লিখেছেন, কিন্তু এই দুটি গল্পকে তিনি ঠিক কিশোর সাহিত্য বলতে রাজি নন। এটি বেকারত্বের সামাজিক ব্যাখ্যা দেয়, আবার বুলেট ভাইয়ের মতো চরিত্র দিয়ে বন্ধুত্বের পাগলামিকে স্বীকৃতি দেয়।
অতিপ্রাকৃত গল্পের সার্থকতা যদি হয় ভীতিসঞ্চার, তাহলে ‘গল্পের খাতা’ ও ‘রাজসঙ্গী’ সেই কাজটি ভালোভাবেই করেছে। লেখকের মতে, ভূতের গল্প লিখতে গেলে ভয় পাওয়ার দরকার হয় না, কিন্তু পাঠক যদি ভয় পায়, সেটাই গল্পের সাফল্য।
আর প্রেমের গল্প? সেটাও আছে— ‘গয়না’। গয়না যেমন ভালোবাসার প্রতীক, তেমনই ভবিষ্যতের নিরাপত্তারও। এই গল্পে ভালোবাসা কি আদৌ হারিয়ে যায়? নাকি আমরা হারিয়ে যাওয়ার একটা অনুভূতি নিয়ে বাঁচতে ভালোবাসি?
সবশেষে ‘মেয়ের বাবা’। সুজন নামের এক চরিত্র, যে এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেয়ের বাবা হয়ে ওঠে— অথচ তার মেয়ে নেই! এই গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক মায়াময় বিস্ময় পাঠককে আবেগে ডুবিয়ে দেবে।
মোস্তফা মামুন কেবল গল্প লেখেন না, তিনি গল্প বলেন। তাঁর গল্পের ভাষা সাবলীল, চরিত্রগুলো বাস্তবের এতটাই কাছাকাছি যে মনে হয়, এদের কোথাও না কোথাও দেখা হয়েছে। তাঁর লেখায় হাস্যরসের সূক্ষ্ম মোচড় আছে, আছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ আর গভীর মানবিক অনুভূতি।
বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, মূল্য ৪৫০ টাকা। প্রথম ফ্ল্যাপেই লেখা আছে— গল্পের সন্ধান আর গল্প শোনানোর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু নেই। মোস্তফা মামুন সেই আনন্দকেই দুই মলাটের মধ্যে বন্দি করেছেন। এখন শুধু পাঠকের অপেক্ষা— এই আনন্দে শরিক হওয়ার জন্য!