ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৬৭ সালের আগে এই অঞ্চলে পহেলা বৈশাখে ঘটা করে নববর্ষ উদ্যাপনের রীতি ছিল না। সেকালের বাংলা সাহিত্য ও ঢাকার ইতিহাস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপনের সরব উপস্থিতি থাকলেও সেখানে বাংলা নববর্ষের দেখা পাওয়া ভার। অনেক খুঁজে পেতে বাসন্তী গুহঠাকুরতার ‘কালের ভেলায়’ গ্রন্থে সেকালের বৈশাখ সম্পর্কে জানা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘মা পহেলা বৈশাখে নতুন কাপড় নিজের লুকিয়ে জমানো টাকা থেকে আমাদের কিনে দিতেন।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন
পুরান ঢাকা থেকে নতুন ঢাকা
- একদা দোকানি-ব্যাপারির হালখাতা আর গৃহস্থের ঘরে রান্নাঘরের দুটি ভালোমন্দের আয়োজনের মাঝে সীমাবদ্ধ পহেলা বৈশাখ আজ ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়েছে রঙে-রসে বিচিত্ররূপে। আর মাত্র দুই দিন পরেই পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের বর্ণিল উদ্যাপনের প্রাক্কালে পুরান ঢাকার সেই ‘হালখাতা’ নতুন কলেবরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ আর চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় কিভাবে রূপান্তরিত হয়েছে তা তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন হোসাইন মোহাম্মদ জাকি
notdefined

বৈশাখ উদ্যাপনের ইতিকথা
বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন প্রবর্তিত হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ
‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক্ যাক্ যাক্
এসো এসো’
এই গানের মধ্য দিয়েই নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয় রমনার বট (অশ্বত্থ) মূলে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নববর্ষ উদ্যাপনের প্রথম আয়োজন হয়েছিল ১৯১৭ সালে, প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালে। উদ্যাপনের অংশ হিসেবে নয়; বরং যুদ্ধে ব্রিটিশদের জয় কামনা করে হোম কীর্তন ও পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। ১৯৩৮ সালেও এ রকম উদ্যাপন দেখা যায়। অতঃপর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত। ঢাকায় রমনার বটমূলে (অশ্বত্থ) ছায়ানটের উদ্যোগে বর্ষবরণের ঐতিহ্য সূচিত হয়। একটা সময় ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু যেখানে ছিল ‘চৈত্র সংক্রান্তি’, সেখানে ‘পহেলা বৈশাখ’ চলে এলো পাদপ্রদীপের আলোয়। ঐতিহ্যের এই উদ্ভাবনটি পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিপরীতে বাঙালিদের জন্য খুব জরুরি ছিল। এর মাধ্যমে নববিকশিত শহুরে ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে স্বাদেশিক চেতনার প্রসার ঘটেছিল। ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান, ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মদ আজিম বখেশর কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “পহেলা বৈশাখ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে অনেকখানি। একসময় এটা ছিল মূলত মুসলমান ব্যবসায়ীদের উৎসব এবং হিন্দু ধর্মালম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান। উভয় ধর্মের ব্যবসায়ীরাই হালখাতা অনুষ্ঠান করত। ব্যবসায়ীরা ছোট বাচ্চাদের ডেকে ডেকে মিষ্টি খাওয়াত। পাটুয়াটুলীর কালাচাঁদ গন্ধবণিক ও সীতারাম ভাণ্ডার, নবাবপুরের মরণ চাঁদ, চকবাজারের আলাউদ্দিন সুইটমিট ও ফরাশগঞ্জের মিষ্টির দোকানগুলো নববর্ষের দু-তিন দিন আগে থেকেই রমরমা থাকত। নওয়াবপুরের রথখোলা মোড়ে ৩০ চৈত্র মেলা হতো। আর পহেলা বৈশাখের দিন লোহারপুলে মেলা হতো। এটাকে চিলপূজার মেলা বলত। যানজটের জন্য পরবর্তী সময় এই মেলা ধুপখোলার মাঠে স্থানান্তরিত হয়। চৈত্রসংক্রান্তিতে ‘শিব গৌড়ীর নাচ’ দেখার সুযোগ হতো। হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হতো। পুরুষরাই শিব ও গৌড়ী সাজত আর ঢাকের তালে তালে নাচত। নাচের পরে বাড়ির কর্তারা নাচদলকে কিছু সম্মানি দিত।” জীবন বীণার সেই সুর থেমে গেছে। মেলার সেই জীবনী শক্তিও ফুরিয়েছে।
ছবি : শেখ হাসান
পান্তা-ইলিশ বিতর্ক
‘চৈত্রে রান্ধে, বৈশাখে খায়’ বলে পুরান ঢাকায় একটা কথা চালু রয়েছে। দরিদ্র মানুষের রাতে খাওয়ার পর অবশিষ্ট ভাত রাখার কোনো উপায় থাকে না। তাই পানি দিয়ে পরবর্তী সকালের খাবার তৈরি হয়। আলুভর্তা, পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ পোড়া ইত্যাদি দিয়ে পান্তা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। ১৯৮৩ সালে রমনার বটমূলে (অশ্বত্থ) পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পান্তার সংযোজন ঘটে। কিন্তু এর সঙ্গে ইলিশ সংযুক্ত করায় ঘটে বিপত্তি। বৈশাখ মাসে আইন ভেঙে ইলিশের জোগান দিতে গিয়ে ইলিশ হয়ে পড়ে দুর্মূল্য। অবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে। তিনি এ সময়টা ইলিশ দিয়ে পান্তা না খেয়ে অন্য কিছু দিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নতুন দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মযহারুল ইসলাম বাবলার কাছে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের জমিদাররা একসময় পহেলা বৈশাখের দিন ‘পুণ্যাহ’ বা খাজনা আদায়ের ‘উৎসব’ পালন করতেন, আর ব্যবসায়ীরা আয়োজন করতেন হালখাতার। আর্থ-সামাজিকভাবে যাদের অবস্থান ‘ঋণাত্মক’ মেরুতে, তাদের বেলায় ধুমধামের সঙ্গে নববর্ষ পালনের সুযোগ যে ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। কালের পরিক্রমায় এখন জনসংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে ঐতিহ্যের বাণিজ্যিক আবাদ ও বিপণনে এগিয়ে এসেছে নয়া জমানার মুক্তবাজার ব্যবস্থা। পহেলা বৈশাখে এখন ফতুয়া-শাড়ির বাজার ঈদ-পূজার বাজার থেকে নেহায়েত কম কিছু নয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়। কিন্তু সেটা আমাদের মতো এত আড়ম্বরপূর্ণ নয়। ভারতীয় মুসলমানরা হিন্দুয়ানি উৎসব মনে করে নববর্ষ পালন থেকে দূরে সরে থাকলেও এ দেশের মুসলমানদের আচরণ এ ক্ষেত্রে বেশ অসাম্প্রদায়িক।”
চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে শুরু হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’, যা পরবর্তী সময় ১৯৯৬ সালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই শোভাযাত্রায় থাকে বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম। থাকে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বহনকারী নানা উপকরণ, রংবেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মতো পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এ প্রসঙ্গে ঢাকা গবেষক ও সাংবাদিক আনিস আহামেদ বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান যেন ঢাকার হারিয়ে যাওয়া চৈত্রসংক্রান্তিকে নতুন করে ফিরে পাওয়া, বিবর্তিত নতুন সংস্করণ। সেকালে চৈত্রসংক্রান্তিতে মুখোশ পরে সং সাজার চল ছিল। এ উপলক্ষে আশপাশের অধিবাসীদের কাছ থেকে অনেক উপঢৌকনও পাওয়া যেত। তবে শব্দদূষণ ও নিরাপত্তার কথা ভেবে এই বছর ‘ভুভুজেলা’ নামে পরিচিত উচ্চ শব্দের বাঁশি বাজানো এবং মুখোশ দিয়ে মুখ ঢাকা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
নগর ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে নববর্ষ
বাংলাভাষীদের মতোই দেশের নানা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষও প্রায় একই সময় মেতে ওঠে বাংলা নববর্ষ পালনে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, ওড়িশা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হয়। পৃথিবীর আরো নানা দেশে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হয়ে থাকে। মূলত প্রবাসী বাঙালিরা সেসব দেশে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করে থাকেন। ওমানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ডাক্তার দম্পতি মুহাম্মদ শাহ্ জাহান ও বেবী রুনু মুস্তাফার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আসন্ন নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য তাঁরা পুরো পরিবারের পোশাক গামছা দিয়ে তৈরি করেছেন।
বাঙালি ‘বৈচিত্র্যবিলাসী, নতুনত্ব পিয়াসী’ আবার ‘ঐতিহ্যপ্রেমী’ও। উৎসব নিয়ে বাঙালির সমকালীন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আশাপূর্ণা দেবীর ‘ঢেউ গুনছি সাগরের’ প্রন্থে। তাঁর ভাষায়, ‘বাঙালি ঝালেও থাকে, অম্বলেও থাকে। বাঙালির হৃদয় মন্দিরে সব দেশের সব জাতির সব ঐতিহ্যের প্রতীক পতাকাগুলো পতপত করে উড়তে থাকে। সময়কালে সেই পতাকার দড়ি টেনে তার নিচে সমবেত হয়। তাই তার নানাবিধ উৎসব দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কবিগুরুর উদাত্ত মন্ত্রে ধ্বনিত, ‘নব বৎসরে করিলাম পণ লব স্বদেশের দীক্ষা’, এ নিয়ে এখন আর কে ভাবে? বছরের প্রথম দিনটিতে একটু ভালোমন্দ খেলে, একটু নতুন বস্ত্র পরিধান করলে সারা বছরটি ভালো কাটে—বাঙালি সমাজে এই সংস্কারটুকু ছিল দূর্বাঘাসের মতো। এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহীরুহের তুল্য। শাখা-প্রশাখার কী বিস্তার। আসলে আমরা এখন সব বিষয়েই বাড়তির পথে। জামা-কাপড়ের বাজারের বাড়বাড়ন্ত! আমাদের ঐশ্বর্য বাড়ছে, আরাম বিলাসিতার উপকরণ বাড়ছে, লোভ বাড়ছে, দুর্নীতি বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সাংস্কৃতিক উৎসব। এই কাল, এই যুগ আমাদের সব কিছুকে বাড়তির পথে ঠেলে দিলেও দিনে দিনে তলে তলে নিঃশব্দে লোপাট করে নিচ্ছে একটি জিনিস। সে হচ্ছে ‘হৃদয়’। সেখানে ক্রমেই ঘাটতি, কমতি, খামতি।” এবার নববর্ষে তাই প্রার্থনা হোক, আমরা যেন আমাদের হারানো হৃদয়টিকে আবার ফিরে পাই। আমরা যেন নিঃস্ব হতে হতে দেউলে হয়ে না যাই।
প্রথম দিন তিতা খেলে সারা বছর মিঠা যাবে
আনিস আহামেদ
ঢাকা গবেষক ও সাংবাদিক
পহেলা বৈশাখে ঢাকায় আজকাল যেই ধরনের উৎসব দেখা যায়, একটা সময় এর স্বরূপটা ছিল ভিন্ন। তখন এই উৎসবটা ছিল বাজারনির্ভর, ব্যবসায়ীকেন্দ্রিক, হালখাতাভিত্তিক। চৈত্র মাসের মধ্যে ওই বছরের বকেয়া পরিশোধ করতে হতো ক্রেতাদের। সময় সময় কিছুটা ছাড় পাওয়া যেত। ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। লালবাগ কেল্লার দক্ষিণ পাশের চড়ে চৈত্রের শেষ দুই দিনে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হতো। রকমারি ব্যবসায়ীদের অবিক্রীত মালগুলো কম মূল্যে সেখানে বিক্রি হতো। মেলা থেকে বেলিফুল ও মাখনা কিনে বাড়ি নেওয়ার রেওয়াজ ছিল। ঢাকার পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারা দুই ভাগ হয়ে কবির লড়াইয়ে মেতে উঠতেন। প্রথম দিন তিতা খেলে সারা বছর মিঠা যাবে, এমন একটা সংস্কার থেকে তিতা পাটশাক আর পান্তা খাওয়ার প্রচলন ছিল পহেলা বৈশাখে। কালের পরিক্রমায় পুরান ঢাকার সেই সংস্কৃতি আজ বিলীন। শুধু হালখাতা রয়েছে ধুঁকে ধুঁকে।
সম্পর্কিত খবর