আধিপত্য বিস্তার ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নিয়ে নরসিংদীর রায়পুরায় গেল ছয় মাসে দুজন জনপ্রতিনিধিসহ ১৩ জন খুন হয়েছে। এর মধ্যে আটজন প্রাণ হারায় গুলিতে। উপজেলার চরাঞ্চলের শ্রীনগর ইউনিয়নে একই দিনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় নারী ও শিশুসহ ছয়জন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও পরে থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র চলে গেছে জেল পালানো আসামি ও সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর হাতে, যা এখনো পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
সর্বশেষ ২৬ জানুয়ারি উপজেলার চরাঞ্চলে আগ্নেয়াস্ত্র ও পুলিশের ভেস্ট পরে সংঘর্ষে জড়ায় সাবেক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানের অনুসারীরা। আগে থেকেই চরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণে দেশি অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা জানায় প্রশাসন। গেল ছয় মাসে উপজেলার শ্রীনগরে ছয়জন, চান্দেরকান্দিতে দুজন, বাঁশগাড়ীতে দুজন, মরজাল, নিলক্ষা ও অলিপুরা ইউনিয়নে একজন করে নিহত হয়। নিহত ওই ১৩ জনের মধ্যে গুলিতে আটজন মারা গেছে। অন্য পাঁচজনকে টেঁটাবিদ্ধ, কুপিয়ে, মারধর ও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে হত্যা করা হয়।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতা কম থাকার সুযোগে ৫ আগস্টের পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে চরাঞ্চল গঠিত। এখানে প্রায়ই আধিপত্য ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দুটি পক্ষ।
সেখানে টেঁটার বদলে বর্তমানে বেড়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার।
গেল বছরের ২২ আগস্ট উপজেলার চরাঞ্চলের শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়দাবাদে স্থানীয় দলিললেখক সোহেল মিয়া ও আবু হানিফ জাকারিয়ার মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়। নিহতরা হলো ওই ইউনিয়নের বাঘাইকান্দির বাসিন্দা আনিছ, সিদ্দিক, ফিরোজা বেগম, সায়দাবাদের বাসিন্দা আমির হোসেন, বাদল ও জুনায়েদ মিয়া। এ ঘটনার এক মাস পর ২৮ সেপ্টেম্বর মরজাল ইউনিয়ন ছাত্রদলকর্মী জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেন একই ইউনিয়নের নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা। এরপর ২৪ নভেম্বর অলিপুরা ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরনগরে একটি পেঁয়াজক্ষেত থেকে অটোরিকশাচালক কামরুজ্জামানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
১ ডিসেম্বর উপজেলার বাঁশগাড়ীতে প্রতিপক্ষের কিল-ঘুষিতে মৃত্যু হয় পল্লী চিকিৎসক আব্দুল্লাহর। ওই ঘটনার চার দিন পর ৫ ডিসেম্বর উপজেলার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নের নজরপুরে প্রতিপক্ষের হামলায় ইউপি সদস্য মানিক মিয়া ও সাবেক মহিলা ইউপি সদস্য কল্পনা বেগম নিহত হন।
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২৬ জানুয়ারি চরাঞ্চলে বাঁশগাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রাতুল হাসান জাকির ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল হকের অনুসারীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়। ওই সময় সাবেক চেয়ারম্যানের অনুসারী আলমগীর হোসেন আলম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আগ্নেয়াস্ত্র ও নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে লুট হওয়া পুলিশের ভেস্ট পরে সংঘর্ষে নেমে আহত হন বর্তমান চেয়ারম্যানের অনুসারী রুবেল মিয়া। একই রাতে নিলক্ষা ইউনিয়নে মেঘনা নদী থেকে হাত-পা বাঁধা ট্রলারচালক হাবি মিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হলেও হোতাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
নরসিংদী জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হাসানুজ্জামান সরকার বলেন, ৫ আগস্টের পর বালু ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এলাকার মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
চরাঞ্চলে ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে একটি থানা গঠন এবং শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে অপরাধ কমে আসবে বলে জানান চানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোমেন সরকার।
রায়পুরা থানার ওসি আদিল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা সেনাবাহিনী ও র্যাবের সহযোগিতা চেয়েছি। অস্ত্র ও আসামি গ্রেপ্তারে শিগগিরই চরাঞ্চলে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, খবর পেয়েছি কারগার থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র চরাঞ্চলে আছে। শিগগিরই যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে একটি সেনা ক্যাম্প স্থাপনসহ রায়পুরা থানা ও তিনটি ফাঁড়িতে পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে।