কোরআনের বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারীর শাস্তি

আসআদ শাহীন
আসআদ শাহীন
শেয়ার
কোরআনের বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর অবমাননাকারীর শাস্তি

যারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে গালি দেয় এবং তাঁর অবমাননা করে তাদের কোরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কিরাম, সমগ্র মুসলিম উম্মতের ঐকমত্যে সুস্পষ্ট কাফির ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগে যারা নবীকে কষ্ট দিয়েছিল, তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল শাস্তিস্বরূপ তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। নিম্নে ইসলামী আইনে নবী অবমাননার শাস্তির বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হলো—

কোরআনের দৃষ্টিতে শাতিমে রাসুল কাফির

কোরআনের বেশ কয়েকটি স্থানে ‘শাতিমে রাসুল কাফির ও মুরতাদ’ এই মর্মে ইঙ্গিত রয়েছে, যার কয়েকটি নিম্নরূপ :

১. যে ব্যক্তি নবী ও ধর্মের অবমাননা করে সে কাফির ও মুরতাদ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন : ‘তাদের (অর্থাৎ মুনাফিকদের) মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং (তাঁর সম্পর্কে) বলে, সে তো আপাদমস্তক কান (কান কথা শুনে)।

বলে দাও, তোমাদের পক্ষে যা মঙ্গলজনক, সে তারই জন্য কান। সে আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে এবং মুমিনদের কথা বিশ্বাস  করে।  তোমাদের  মধ্যে যারা (বাহ্যিকভাবে) ঈমান এনেছে, তাদের জন্য সে রহমত (সুলভ আচরণকারী)। যারা আল্লাহর রাসুলকে কষ্ট দেয়, তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত আছে।
’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬১)

২. অন্য আয়াতে এসেছে, ‘তারা কি জানে না, কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতা করলে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, যাতে সে সর্বদা থাকবে? এটা তো চরম লাঞ্ছনা!’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৩)

৩. আরেক আয়াতে এসেছে, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের প্রতি ইহকালে ও পরকালে অভিসম্পাত করেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অবমাননাকর শাস্তি।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)

উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয়, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কষ্ট দেয় বা অবমাননা করে সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দেয় বা অবমাননা করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে কষ্ট দেয় বা অবমাননা করে সে কাফির। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪; আস সাইফুল মাসলুল, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৭০)

হাদিসের আলোকে শাতিমে রাসুলকে হত্যার নির্দেশ

যে ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে অসম্মান করে, নবীর সম্মানহানি করে এবং অবমাননাকর মনোভাব পোষণ করে সেও কাফির।

জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, নবী (সা.) একবার বলেন, ‘কে আছ যে কাব ইবনু আশরাফের (হত্যার) দায়িত্ব নেবে? কেননা সে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুল (সা.)-কে কষ্ট দিয়েছে।’ মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা (রা.) বলেন, ‘হ্যাঁ।’ অতঃপর তিনি তাকে হত্যা করে ফেলেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫১০- ৩০৩১)

আলী (রা.) বলেন, এক ইহুদি নারী নবী (সা.)-কে গালাগাল করত এবং তাঁর সম্পর্কে মন্দ কথা বলত। একদা জনৈক ব্যক্তি তাকে গলা টিপে হত্যা করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার রক্তপণ বাতিল বলে ঘোষণা করেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৩৬২)

উলামায়ে কিরাম বলেছেন, শাতিমে রাসুলকে হত্যা করার ব্যাপারে এটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। (আকদিয়াতু রাসুলুল্লাহ (সা.), খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৭)

ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে গালি দেয় তাকে হত্যা করার বিধান রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পরও বলবৎ আছে; বরং আগের চেয়ে অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা-৯৪)

ইতিহাসবেত্তারা লিখেছেন, নবী (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে খাতালের দুই নারী ক্রীতদাসীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন; যারা নবী করিম (সা.)-কে তিরস্কার করে লেখা ইবনে খাতলের কবিতা গাইতেন। তাদের একজনের নাম ফারতানা এবং অন্যজনের নাম কারিনা বা অর্ণিব। আর তাদের মধ্যে একজনকে হত্যা করা হয়েছিল এবং ফারতানা ঈমান এনেছিল, সে জন্য তার ওপর থেকে হত্যার আদেশ শিথিল করা হয়েছিল এবং সে উসমান (রা.)-এর শাসনামল পর্যন্ত জীবিত ছিল। এই দুই দাসীকে হত্যার আদেশ একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে নবী অবমাননার অপরাধের কারণে তাদের হত্যার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা-১১০)

মুসআব ইবনে সাদ (রা.) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) সবাইকে নিরাপত্তা দান করেন, কিন্তু চারজন পুরুষ ও দুজন নারী ছাড়া। তিনি তাদের সম্পর্কে বলেন, তাদের যেখানে পাবে হত্যা করবে, যদিও তারা কাবার পর্দা ধরে থাকে। তারা হলো ইকরিমা ইবন আবু জাহল, আবদুল্লাহ ইবনে খাতাল, মিকয়াস ইবন সুবাবা, আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারাহ। আবদুল্লাহ ইবনে খাতালকে কাবার গিলাফের সঙ্গে লটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেল এবং তাকে হত্যা করার জন্য দুই ব্যক্তি ছুটে গেল। একজন হলো সাঈদ ইবনে হুরায়স, অন্যজন আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.)। সাঈদ ছিলেন জাওয়ান, তিনি আগে গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। আর মিকয়াস ইবনে সুবাবাকে লোকেরা বাজারে পেল এবং তারা তাকে হত্যা করল..। (নাসাঈ, হাদিস : ৪০৬৭)

সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈনদের ঐকমত্য

নবী অবমাননার শাস্তি হত্যা এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কিরাম একমত এবং বহু ঘটনা দ্বারা এই ঐকমত্য প্রমাণিত। ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, কোনো মাসআলায় এর চেয়ে বেশি সুস্পষ্ট ঐকমত্যের প্রমাণ করা সম্ভব নয় এবং কোনো একজন সাহাবায়ে কিরাম বা তাবেঈদের কেউ এই ইস্যুতে সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈনদের ঐকমত্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা-২০০)

শাতিমে রাসুলের ব্যাপারে ইসলামী আইনশাস্ত্রের চিন্তাধারা

শাতিমে রাসুলকে হত্যার ব্যাপারে ইসলামী আইনশাস্ত্রের বিজ্ঞ আইনবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নে তুলে ধরা হলো—

আবু বকর আল জাসসাজ (রহ.) বলেন, মুসলমানদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো বিরোধ নেই যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নবী (সা.)-কে গালি দেয় সে মুরতাদ এবং তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। (আহকামুল কোরআন, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-৮৬)

ইমাম ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন, মাতাল বা পাগল ব্যক্তির ধর্মত্যাগ বৈধ নয়, তবে নবীকে গালি দেওয়ার কারণে সে মুরতাদ হয়ে যায়। তাই তাকে (মুরতাদ হিসেবে) হত্যা করা ওয়াজিব এবং তার এ অপরাধ (কখনোই) ক্ষমাযোগ্য নয়। (আল আশবাহ ওয়া আন নাজায়ির, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৯১)

ইবনে আবেদীন আশ শামী (রহ.) বলেন, মাতাল বা পাগল ব্যক্তির ধর্মত্যাগ বৈধ নয়, তবে নবীকে গালি দেওয়ার কারণে সে মুরতাদ হয়ে যায়। তাই তাকে (মুরতাদ হিসেবে) হত্যা করা ওয়াজিব এবং তার এ অপরাধ (কখনোই) ক্ষমাযোগ্য নয়। (ফাতওয়ায়ে শামী, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-২২৪)

ইমাম মালেক (রহ.) ও মদিনার সব আলেমের আকিদা এই যে যদি কোনো অমুসলিম নবী (সা.)-কে অপমান করে, গালি দেয় বা অবমাননা করে, তাহলে তাকেও হত্যা করা ওয়াজিব। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা-৪)

ইমাম ইবনে মুনজির ও ইমাম আল-খাত্তাবি (রহ.) ইমাম শাফেঈ (রহ.) সম্পর্কে লিখেছেন যে শাতিমে রাসুলকে হত্যা করা হবে। (আস সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা-৮)

ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে গালি দেয় তার শাস্তি হলো তাকে হত্যা করা। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ইসলামকে অবমাননা করে এবং তা অবজ্ঞার সঙ্গে উল্লেখ করে তারও শাস্তি হত্যা। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৪৭)

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, যদি কেউ নবী (সা.)-কে গালি দেয় বা তাঁর শানে বেয়াদবি কিংবা কটূক্তি করে তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সে মুসলিম হোক বা কাফির। আর আমার অভিমত হলো তাকে হত্যা করা ওয়াজিব, তার তাওবা গ্রহণযোগ্য নয়। (আস সাইফুল মাসলুল আলা মান শাব্বার রাসুল, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩৩৮)

যে ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর সম্মানের অবমাননা করে, গালি দেয় বা তাঁর শানে বেয়াদবি ও কটূক্তি করে কিংবা ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে সে কাফির এবং তাকে হত্যা করা মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

শরিফ আহমাদ
শরিফ আহমাদ
শেয়ার
ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

ঘরবাড়ি প্রত্যেক মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র।‌ দিনশেষে ক্লান্তির শেষ ঠিকানা। ঘরে ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে পরিবারে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে। পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

সুন্দর মন-মানসিকতায় ঘরগুলো দুনিয়ায় জান্নাতের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাই এ বিষয়ে সব নারী-পুরুষের সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ঈমান-আকিদা পরিশুদ্ধ করা

নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধ রাখা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা ঈমান-আকিদা সঠিক না হলে কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।

তবে নারীদের ঈমান-আকিদা শুদ্ধ রাখার গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ তারা পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের অন্যতম স্তম্ভ। বিশুদ্ধ ঈমান আমলের অধিকারীদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উত্কৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব।
’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)

নামাজের স্থান নির্দিষ্ট করা

ইসলাম নারীদের জন্য বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার বিধান দিয়েছে। নামাজের ক্ষেত্রে ঘরের অভ্যন্তরীণ স্থানকে সর্বোত্তম বলেছে। এটি তাদের ইজ্জত, পর্দা ও সম্মান রক্ষার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রা.)-এর স্ত্রী উম্মে হুমাইদ একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়তে আমার ভালো লাগে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তা আমি জানি।

তবে শোন, তোমার জন্য তোমার ঘরের অভ্যন্তরে নামাজ পড়া বারান্দার কামরায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।

আবার বারান্দার কামরায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। এবং তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম, একইভাবে তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়া তোমার জন্য আমার মসজিদে এসে আমার সঙ্গে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শোনার পর তিনি পরিবারের লোকদের ঘরের ভেতরে নামাজের স্থান বানাতে বলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হলো। এরপর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই নামাজ পড়তে থাকেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২২১৭)


দোয়া ও জিকিরের আমল

বেশির ভাগ সময় নারীরা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রয়োজনীয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোয়া ও জিকির করা যায়। এতে তাঁদের আত্মিক প্রশান্তি ও ঈমানের দৃঢ়তা এনে দেয়। আল্লাহর ভালোবাসা ও রহমত লাভের পথ সুগম করে। প্রিয় নবীর প্রিয় পরিবারে সকাল-সন্ধ্যায় আমলের পরিবেশ ছিল। জুওয়াইরিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যুষে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। যখন তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন তখন তিনি নামাজের জায়গায় ছিলেন। এরপর তিনি চাশতের সময়ের পর ফিরে এলেন। তখনো তিনি বসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম তুমি সেই অবস্থায়ই আছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি তোমার নিকট থেকে যাওয়ার পর চারটি কালেমা তিনবার পাঠ করেছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সঙ্গে ওজন করলে এই কালেমা চারটির ওজনই বেশি হবে। কালেমাগুলো এই—‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিদা নাফসিহি ওয়া ঝিনাতা আরশিহি ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৫)

উন্নত আখলাক ও চরিত্র গঠন

ঘরবাড়িতে ইবাদতময় পরিবেশ তৈরিতে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত আখলাক ও চরিত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতির সবক শেখায়। এর উল্টো চিত্র হলে কখনোই ঘর কুসুম কাননের সৌরভে ভরা সম্ভব নয়। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো, অমুক মহিলা দিনে রোজা রাখে আর সারা রাত ইবাদত-বন্দেগি করে। কিন্তু সে কটু কথা বলে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো লাভ নেই—সে জাহান্নামে যাবে। আর এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো যে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে এবং যথাসাধ্য দান-সদকা করে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে জান্নাতে যাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৩০২)

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
শেয়ার
রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

রমজান মাস এবং ফরজ রোজা শেষ হলেও বছরজুড়ে বিভিন্ন রোজা রয়েছে। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সেসব রোজার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রোজার বিবরণ নিম্নরূপ—

১. এক দিন পর পর রোজা

এক দিন পর পর রোজা রাখাকে সাওমে দাউদ বলে। দাউদ (আ.) এভাবে রোজা রাখতেন।

নবী (সা.) এটিকে সর্বোত্তম রোজা বলেছেন এবং বেশি রোজা রাখতে আগ্রহীদের এভাবে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ১৮৭৮; মুসলিম, হাদিস : ২৭৯৩)         

২. সপ্তাহের রোজা

সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা রাসুল (সা.) পছন্দ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার (বান্দার) আমল (আল্লাহর কাছে) উপস্থাপিত হয়। আমি পছন্দ করি যে রোজা অবস্থায় আমার আমল উপস্থাপন হোক।

(তিরমিজি, হাদিস : ৭৪৭)

৩. মাসের রোজা

প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজাকে আইয়ামে বিজের রোজা বলে। নিয়মিতভাবে এই তিন দিনের রোজা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (বুখারি, হাদিস : ১৮৮০)

৪. আশুরার রোজা

মহররম মাসের ১০ তারিখ হলো আশুরা। রমজানের রোজা ফরজ হওয়া আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা অর্থাৎ আশুরার রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজ। (মুসলিম, হাদিস : ২৮১২)

৫. শাবান মাসের রোজা  

নবী (সা.) শাবান মাসে খুব বেশি পরিমাণে রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে বেশি রোজা পালন করেননি। তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা পালন করতেন।

(বুখারি, হাদিস : ১৮৬৯; মুসলিম, হাদিস : ২৭৭৯)

৬. শাওয়াল মাসের রোজা

রমজানের পর শাওয়াল মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখে, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন বছরজুড়ে রোজা রাখে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮১৫)

৭. জিলহজ মাসের রোজা

জিলহজ মাসের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত মোট ৯টি রোজার ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছর রোজার সমতুল্য। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৫৮)

জিলহজ মাসের নবম দিন হলো আরাফার দিন। এই দিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আশা করি আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ব ও পরের এক বছরের পাপ মোচন করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮০৩)

৮. মানতের রোজা

রোজাসহ কোনো কিছুর মানত করলে তা পূরণ হলে মানতকারীর ওপর রোজা পালন করা অপরিহার্য। নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে নির্দিষ্ট দিনে আর অনির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে যেকোনো দিনে রোজা পালন করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের উচিত মানতকে পুরা করা।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৯)

৯. কাজা রোজা

যৌক্তিক ও সংগত কারণে রমজানের রোজা আদায় করতে না পারলে পরে তার কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে। আর কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পুরো করবে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)

১০. কাফফারার রোজা

স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাজাসহ কাফফারা হিসেবে লাগাতার ৬০টি রোজা রাখতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (সা.) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিসে তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, রমজানে রোজা অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার দাস মুক্তির সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে পারবে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। (বুখারি, হা: ১৮৩৪; মুসলিম, হা: ২৬৫১)

এ হাদিস থেকে স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারার বিধান প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজের কাফফারায় রোজা পালন করার বিধান রয়েছে।

মন্তব্য

রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
শেয়ার
রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

চলে গেল বছরের সেরা মাস ‘রমজান’। রমজানের বিদায়ে মসজিদে মুসল্লির ভিড় দেখা যাচ্ছে না! রমজানের বিদায়ে কি নামাজও হলো বিদায়? রমজানের পর অনেকে নামাজ ছেড়ে দেন, এটা দুঃখজনক! বরং সারা বছর রমজানের অর্জনগুলো চর্চায় রাখতে হবে। যেমন—

১. ধর্মভীরুতা : রমজান মানুষের মধ্যে ‘তাকওয়া’ (ধর্মভীরুতা) সৃষ্টি করেছিল। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো, যেমন ভয় করা উচিত এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।

’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১০২)

আয়াতে বর্ণিত ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো’ এবং ‘মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না’ বাণীদ্বয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লামা বায়যাভির (রহ.) মতে, তাকওয়ার সোপান তিনটি—(ক) শিরক থেকে বিরত থাকা (খ) সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা (গ) পাপের ভয়ে বৈধ কাজও পরিহার করা।

২. ধৈর্য : রমজান মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। শান্তিতে, সংগ্রামে, রোগ-যন্ত্রণায়, দুঃখ-শোক, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় তথা জীবনের সব প্রতিকূল ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনন্ত সংগ্রাম করাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের প্রতীক।

সুরা বাকারার  ১৫৫ ও ১৫৬ নম্বর আয়াতে ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রের বর্ণনা আছে : (ক) ভয়, (খ) ক্ষুধা, (গ) সম্পদহানি, (ঘ) প্রাণহানি, (ঙ) শস্যহানি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা ধৈর্যশীল থাকে অভাব-অভিযোগে, রোগশোকে এবং রণক্ষেত্রে...’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭৭)

মুফতি মুহাম্মদ শফির (রহ.) মতে, ধৈর্য বা সবর তিন প্রকার—

১.   নফসকে (প্রবৃত্তি) হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা।

২.   আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা।

৩.   যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা।

৩. সহানুভূতি : হাদিসের ভাষায় সহানুভূতির মাস রমজান। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো এবং সহিষ্ণুতায় পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করো; সহিষ্ণুতার বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ২০০)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও ধর্মভীরুতায় একে অন্যকে সহযোগিতা (প্রতিযোগিতা) করবে... আল্লাহকে ভয় করে চলো...’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

৪. পাপ পরিহার : রমজান মানুষের ষড়রিপুর বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় নবীর (স.) ভাষায় ‘রোজা ঢালস্বরূপ’। অথচ সিয়াম সাধনার দ্বারাও যারা মিথ্যা পরিহারের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন ‘তাদের পানাহার পরিত্যাগের কোনোই মূল্য নেই।

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘তোমরা মিথ্যার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা, মিথ্যা পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি)

৫. কথাবার্তায় সংযম : রোজা মানুষকে কথাবার্তায় সংযমী করে। আমরা যা কিছু বলি, যা কিছু করি মহান আল্লাহ সবই জানেন, দেখেন, বোঝেন এবং বলেন ‘মানুষ যে কথাই বলুক না কেন তার কাছে একজন দৃষ্টিপাতকারী প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া করা কুফরি।’ (বুখারি)

এখন ভাবা উচিত রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে কতটুকু?

৬. তাওবা : তাওবার মাস রমজান। তাওবার গুরুত্ব অপরিসীম। রমজানের শিক্ষা, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না...’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান দোষ-ত্রুটিপূর্ণ ও অপরাধী, আর অপরাধীর মধ্যে ওই সব লোক উত্তম, যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি)

৭. দোয়া : দোয়া কবুলের মাস রমজান। আমাদের কর্তব্য, সারা বছর সমর্পিতচিত্তে দোয়া করা। দোয়া অর্থ ডাকা বা চাওয়া। মহান আল্লাহর বাণী ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৬)

পবিত্র কোরআন-হাদিসে ও বুজুর্গাণের বহুল চর্চিত-পরীক্ষিত আমলে দোয়ার শক্তির ধারণা মেলে। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)

৮. তিলাওয়াত : রমজানে আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করেছি। রমজানের পরও উচিত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস বজায় রাখা। পবিত্র কোরআন ও রমজানের প্রাণোচ্ছাসে মুজাদ্দিদ আলফিসানির (রহ.) নিবেদন :

‘এ আবে হায়াত থেকে পিপাসা চাহি না মিটাতে কভু

এর মাঝে যেন হরদম মোর তৃষ্ণা বাড়ান প্রভু।’

মন্তব্য

৩ আমলের মাধ্যমে রমজানের আমলের ধারাবাহিকতা

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
শেয়ার
৩ আমলের মাধ্যমে রমজানের আমলের ধারাবাহিকতা

ঈমান ও আমলের প্রশিক্ষণকাল ছিল পবিত্র রমজান। রমজানে মুমিন পুণ্যের অনুশীলন করে এবং বছরের অন্য দিনগুলোতে সে অনুসারে আমল করে। যে ব্যক্তি নেক আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে প্রকৃতপক্ষে সে-ই রমজানের শিক্ষা ধারণ করতে পেরেছে।

ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক কেন

মুমিন কোনো আমল শুরু করার পর তা ত্যাগ করে না।

কেননা তা ত্যাগ করার অর্থ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা। এ ছাড়া মহানবী (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ ওই আমলকে ভালোবাসেন, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। তিনি (সা.) কোনো আমল করলে তা নিয়মিতভাবে করতেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩৬৮)
মুমিনের ইবাদত মৃত্যু পর্যন্ত

ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের মাধ্যম।

আর এটাই মুমিনজীবনের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাই মৃত্যু পর্যন্ত মুমিন ইবাদতের প্রতি যত্নশীল থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের ইবাদত করো মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৯)

আমল ছেড়ে দেওয়া নিন্দনীয়

কোনো আমল শুরু করার পর তা  ত্যাগ করা নিন্দনীয়।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস (রা.) বলেন, আমাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আবদুল্লাহ! অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না। সে তাহাজ্জুদ আদায় করত, অতঃপর তাহাজ্জুদ ত্যাগ করেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৫২)

শৈথিল্য শয়তানকে প্রলুব্ধ করে

আমল শুরু করার পর কেউ তাতে শৈথিল্য প্রদর্শন করলে শয়তান প্রলুব্ধ হয় এবং ব্যক্তি শয়তানের শিকারে পরিণত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদেরকে সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমি দিয়েছিলাম নিদর্শন, অতঃপর সে তাকে বর্জন করে, পরে শয়তান তার পেছনে লাগে। আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।

’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৫)

যেভাবে ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, তিন কাজের মাধ্যমে মুমিন আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে। তা হলো—

১. আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা : মুমিন নিজের ওপর আস্থা না রেখে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে এবং আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষায় তাঁর কাছে সাহায্য কামনা করবে। পবিত্র কোরআনে দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! সরল পথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করবেন না এবং তোমার কাছে থেকে আমাদেরকে করুণা দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার রহমত প্রার্থী। কাজেই আমাকে এক পলকের জন্যও আমার নিজের কাছে সোপর্দ করবেন না এবং আমার সব কিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে দিন। আর আপনিই একমাত্র ইলাহ।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৫০৯০)

২. সর্বোচ্চ চেষ্টা করা : আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার পাশাপাশি মুমিন তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু অব্যাহত রাখবে। কেননা যে ব্যক্তি নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় চেষ্টা করবে, তার জন্য আল্লাহর অঙ্গীকার হলো, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে থাকেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)

৩. পুণ্যবানদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা : প্রবাদ রয়েছে, সৎসঙ্গে সর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। অর্থাৎ পুণ্যবানদের সান্নিধ্য মানুষকে পুণ্যের কাজে উদ্বুদ্ধ করে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে মানুষ আল্লাহওয়ালা ও নেককার মানুষের সান্নিধ্য গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও এবং যারা রুকু করে তাদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৪৩)

ধারাবাহিকতা রক্ষার পুরস্কার জান্নাত

কোনো নেক আমল শুরু করার পর তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বিশেষত ঈমান ও আমলের ওপর দৃঢ়তার পুরস্কার জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের কাছে অবতীর্ণ হয় ফেরেশতা এবং বলে, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার জন্য আনন্দিত হও। আমরাই তোমাদের বন্ধু দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে যা কিছু তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমরা ফরমায়েশ করো। এটা ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু আল্লাহর পক্ষ থেকে আপ্যায়ন।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩০-৩২)

আল্লাহ সবাইকে আমলের ধারাবাহিকতা রক্ষার তাওফিক দিন। আমিন।

 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ