ঢাকা, শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫
২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৪ শাওয়াল ১৪৪৬

ঢাকা, শুক্রবার ০৪ এপ্রিল ২০২৫
২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৪ শাওয়াল ১৪৪৬

আসামে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
আসামে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফাইল ছবি : এএফপি

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের স্থানও অন্তর্ভুক্ত। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বুধবার জানান, এর আগে একটি নিয়ম ছিল, যেখানে মন্দিরের মতো কিছু ধর্মীয় স্থানের কাছে গরুর মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল। এবার সেই নিয়ম আরো প্রসারিত করা হয়েছে। তবে রাজ্যে দোকান থেকে মাংস কিনে বাড়ি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে খাওয়া যাবে।

ভারতে মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তারা গরুকে পবিত্র মনে করে। এই কারণে দেশটিতে গরুর মাংস খাওয়া একটি সংবেদনশীল বিষয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত কয়েকটি রাজ্য গত কয়েক বছরে গরু জবাই ও গরুর মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।

ভারতের ২৮টি রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে গরু জবাই ও গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ, যার অনেকগুলোতেই বিজেপি শাসন করে। তবে এসব রাজ্যের কিছুতে মহিষের মাংস খাওয়া বৈধ।

এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন অংশে গরু নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মুসলিম মাংস ও গরু ব্যবসায়ীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

দারিদ্র্যপীড়িত দলিতদের জন্য গরুর মাংস সস্তা প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

আসামে ২০২১ সালে এমন একটি আইন কার্যকর হয়, যেখানে হিন্দু, জৈন ও শিখ সম্প্রদায়ের বাসস্থানের কাছাকাছি গরুর মাংস কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে মন্দিরের কাছেও গরুর মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী শর্মা বলেছেন, প্রকাশ্যে গরুর মাংস খাওয়ার এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আগের আইনে যোগ করা হবে।  

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, মুসলিম অধ্যুষিত সমাগুড়ি আসনে একটি উপনির্বাচনে জেতার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শর্মা ভোটারদের গরুর মাংস সরবরাহ করেছেন।

বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কংগ্রেসের আইন প্রণেতা রকিবুল হোসেন বলেন, ‘ভোটারদের গরুর মাংস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তার দলের হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’ শর্মা বুধবার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘কংগ্রেস চাইলে আমি রাজ্যে পুরোপুরি গরুর মাংস নিষিদ্ধ করতে প্রস্তুত।’

অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। তারা বলছে, এটি মানুষের পছন্দের খাবার খাওয়ার অধিকারে হস্তক্ষেপ। সর্বভারতীয় ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সদস্য হাফিজ রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘যদি তারা গোয়া বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্য রাজ্যে গরুর মাংস নিষিদ্ধ করতে না পারে, তাহলে আসামে কেন?’ উল্লেখ্য, গোয়া ও অরুণাচল প্রদেশের মতো কিছু রাজ্যে গরুর মাংস বিক্রি ও খাওয়া বৈধ, যেখানে বিজেপি শাসন করে। 

সূত্র : বিবিসি

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ

দরিদ্রতম দেশগুলোর জন্য ট্রাম্পের শুল্কনীতি ‘বিপর্যয়কর’

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
দরিদ্রতম দেশগুলোর জন্য ট্রাম্পের শুল্কনীতি ‘বিপর্যয়কর’
প্রতীকী ছবি : এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পারস্পরিক শুল্ক বিশেষভাবে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে চলেছে, ফলে তাদের শ্রমনির্ভর রপ্তানি শিল্প ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হ্রাস পাবে।

বুধবার ঘোষিত ট্রাম্পের শুল্কহার অনুযায়ী, কম্বোডিয়াকে এশিয়ার সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। পোশাক উৎপাদনের বৃহৎ দেশ বাংলাদেশকে ৩৭ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে মায়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যেখানে গত সপ্তাহের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার লেসোথোকে ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে, যা কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প যখন বলেন, ‘ওহ, দেখুন কম্বোডিয়াকে, ৯৭ শতাংশ’, তখন তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির আরোপিত শুল্কের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। এতে হাসির রোল ওঠে। তিনি আরো বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একজন কম্বোডিয়ান গড়ে দিনে প্রায় ৬.৬৫ ডলার উপার্জন করেন, যা বৈশ্বিক গড়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম।

এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রকল্পগুলো বন্ধ করার পর আরো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এই সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই মায়ানমার ও আফ্রিকাজুড়ে অনুভূত হচ্ছে, যেখানে চীন দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে। হিনরিচ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যনীতির প্রধান ডেবোরা এলমস বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়।

৪০-৫০ শতাংশ শুল্ক রাতারাতি কার্যকর হলে তা সামলানো একেবারেই অসম্ভব।’

আরো পড়ুন
ট্রাম্পের শুল্কারোপ ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে বৃহত্তম পরিবর্তন

ট্রাম্পের শুল্কারোপ ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে বৃহত্তম পরিবর্তন

 

অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেত। কারণ তারা ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এখন তারা ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, কারণ চীনে চাহিদা দুর্বল।

যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্কহার নির্ধারণ করেছে একটি ফর্মুলা অনুযায়ী, যা নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে মোট রপ্তানির সঙ্গে ভাগ করে।

এই হিসাব ২০২৪ সালের মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং পরে দুই দিয়ে ভাগ করা হয়েছে, যা ‘হ্রাসকৃত’ শুল্কহার নির্ধারণ করেছে।

এই পদ্ধতির কারণে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ও ভ্যানিলা উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় মাদাগাস্কার ৪৭ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়েছে।

আফ্রিকায় প্রভাব
দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্যমন্ত্রী পার্কস তাউ বৃহস্পতিবার বলেন, তার দল বুঝতে পারছে না কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার শুল্কহার ৬০ শতাংশ হিসাবে নির্ধারণ করল, যেখানে এখন আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। প্রিটোরিয়ার নিজস্ব হিসাবে এ হার মাত্র ৭.৬ শতাংশ।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের ভিত্তিতে বাণিজ্য ভারসাম্য ও অন্যান্য কারণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, কিন্তু বর্তমানে আমাদের জন্য এটা পরিষ্কার নয়।’

২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪.২ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল, যা তার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তাউ বলেন, লেসোথোর ওপর আরোপিত শুল্ক এই ২.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশকে ‘আক্ষরিক অর্থে ধ্বংস’ করবে, যা মূলত হীরার ও পোশাকের রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে প্রধানত হীরার রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল বতসোয়ানার ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। দেশটির খনিজসম্পদ মন্ত্রী গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এই রত্নপাথরের বিক্রির প্রচার চালানোর জন্য। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী কোকো উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ আইভরি কোস্টের ওপর ২১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

আরো পড়ুন
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে কোথায় অসুবিধায় পড়বে ভারত

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে কোথায় অসুবিধায় পড়বে ভারত

 

এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাণিজ্যনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য সংহত করতে উৎসাহিত করেছিল। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ‘আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপারচুনিটি অ্যাক্ট’ চালু করেন, যা এক হাজার ৮০০-এর বেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছিল।

চীনের প্রভাব
এশিয়ার অনেক দেশের জন্য, বিশেষ করে কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিকনির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে চীনের দিকে সরে যাচ্ছে। দেশটি তার বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ওপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

কম্বোডিয়ার প্রধান দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও যুক্তরাষ্ট্র, তবে দেশটি ইতিমধ্যে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, যা বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও কম্বোডিয়ার মোট বাণিজ্য ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার, যার অধিকাংশই কম্বোডিয়ায় উৎপাদিত পোশাক ও জুতা, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়।

এ ছাড়া পোশাক রপ্তানির জন্য মার্কিন বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশও শুল্ক কমানোর উপায় খুঁজছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের শুল্ক পর্যালোচনা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্রুততার সঙ্গে শুল্ক যৌক্তিকীকরণের বিকল্পগুলো চিহ্নিত করছে।’

২০২২ সালের সার্বভৌম ঋণখেলাপির পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকরা বলেছেন, তারা ৪৪ শতাংশ শুল্ক বহন করতে পারবে না। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার মোট রপ্তানির ২৩ শতাংশ গ্রহণ করেছিল।

বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হিসাবের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ এটি দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ভারসাম্যহীন প্রভাব ফেলছে। ওভারসিজ-চায়নিজ ব্যাংকিং করপোরেশনের এশিয়া ম্যাক্রো গবেষণা প্রধান টমি শি লিখেছেন, ‘বিশেষ করে এটি ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যেমন কম্বোডিয়া, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে পর্যাপ্ত আমদানি করার সামর্থ্য রাখে না।’

এশীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে সস্তা চীনা পণ্যের স্রোত নিয়ে উদ্বিগ্ন। এলমস বলেন, ‘চীনের পণ্যগুলোকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে, যা স্বল্প মেয়াদে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।’

মন্তব্য
বিবিসির বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের শুল্কারোপ ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে বৃহত্তম পরিবর্তন

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
ট্রাম্পের শুল্কারোপ ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে বৃহত্তম পরিবর্তন
প্রতীকী ছবি : এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছেন। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক হবে। এটি প্রতিফলিত হবে মার্কিন শুল্ক আয়ের গ্রাফের রেখায়, যা এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি—এমনকি বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের উচ্চমাত্রার রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির সময়ও না। এটি প্রকাশ পাবে রাতারাতি শেয়ারবাজারের পতনে, বিশেষ করে এশিয়ায়।

তবে এই পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন করা যাবে দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে।

মূলত এটি একটি সর্বজনীন শুল্ক, যা শুক্রবার রাতে কার্যকর হতে যাওয়া সব আমদানির ওপর ১০ শতাংশ হারে প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি ‘সবচেয়ে খারাপ অপরাধীদের’ জন্য তাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের ভিত্তিতে পাল্টা শুল্ক ধার্য করা হবে।

এ ছাড়া এশীয় দেশগুলোর ওপর শুল্কের প্রভাব হবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এটি হাজারো প্রতিষ্ঠান, কারখানা ও সম্ভবত দেশগুলোর পুরো ব্যাবসায়িক মডেল ভেঙে দেবে। বিশ্বের বৃহত্তম কম্পানিগুলোর তৈরি সরবরাহ শৃঙ্খল কিছুক্ষণের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এর অনিবার্য প্রভাব হবে উৎপাদন কার্যক্রম চীনের দিকে সরিয়ে নেওয়া।

তাহলে কি এটি শুধুই একটি বড় কৌশলগত দর-কষাকষি? মার্কিন প্রশাসন তাদের পরিকল্পিত কর হ্রাসের জন্য এই শুল্ক রাজস্ব ব্যবহার করতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

দ্রুত কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘এটি কোনো দর-কষাকষি নয়, এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা।’

আরো পড়ুন
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে কোথায় অসুবিধায় পড়বে ভারত

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে কোথায় অসুবিধায় পড়বে ভারত

 

নতুন শুল্কনীতির কাঠামো
যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘পাল্টা শুল্ক’ কাঠামো মূলত যেকোনো দেশকে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দণ্ডিত করছে, যদি সেই দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত রাখে, অর্থাৎ আমদানির তুলনায় বেশি পণ্য রপ্তানি করে। এমনকি কোনো উদ্বৃত্ত না থাকলেও ১০ শতাংশ সর্বজনীন শুল্ক আরোপ করা হবে।

এই সিদ্ধান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রকাশ করে।

প্রথমত, মার্কিন নীতির লক্ষ্য হলো তাদের বাণিজ্য ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনা। এটি বিশ্ববাণিজ্যের প্রবাহকে সম্পূর্ণ নতুন পথে প্রবাহিত করবে এবং এশিয়াকে বিশেষভাবে শাস্তিমূলক অবস্থানে ফেলবে। দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কোনো পরিবর্তন সম্ভব হয়নি বা কার্যকর হয়নি।

একটি সুস্থ বাণিজ্য ব্যবস্থায় ঘাটতি ও উদ্বৃত্ত সাধারণ বিষয়, যেখানে দেশগুলো নিজেদের উৎপাদন দক্ষতা অনুযায়ী বিশেষায়িত হয়ে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখন এই বাণিজ্যিক ভারসাম্যের মৌলিক যুক্তি সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে। কিন্তু কারখানা স্থানান্তর করতে অনেক বছর লাগবে। এশিয়ার ওপর আরোপিত ৩০-৪০ শতাংশ শুল্কের ফলে পোশাক, খেলনা ও ইলেকট্রনিকসের দাম খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
কিছু ইউরোপীয় ভোক্তা পোশাক ও ইলেকট্রনিকসের বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিধা পেতে পারে। তবে যখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছে, তখন অন্য বৃহৎ অর্থনীতিগুলো পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো দৃঢ় করতে পারে।

টেসলার বিক্রির পতন থেকে বোঝা যায়, এটি শুধু সরকারের প্রতিক্রিয়ার বিষয় নয়; বরং ভোক্তারাও এর জবাব দিতে পারেন। এটি হতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক নতুন ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধ।

ইউরোপ সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তারা আর মার্কিন ব্র্যান্ডের ভোক্তাপণ্য কিনবে না, যা এত দিন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রযুক্তি কম্পানিগুলোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া এই শুল্কবৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় মার্কিন কর্তৃপক্ষকে সুদের হার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। ফলাফল হিসেবে বিশ্বব্যাপী একটি বিশৃঙ্খল বাণিজ্যযুদ্ধ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষণটি লিখেছেন বিবিসির অর্থনীতিবিষয়ক সম্পাদক ফয়সাল ইসলাম

মন্তব্য

বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূলরেখা ভারতের : জয়শঙ্কর

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
বঙ্গোপসাগরের দীর্ঘ উপকূলরেখা ভারতের : জয়শঙ্কর
সংগৃহীত ছবি

চীন সফরে গিয়ে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের করা মন্তব্যে ভারতজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘতম উপকূলরেখা ভারতের বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। 

এনডিটিভি বলছে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘স্থলবেষ্টিত’ বলে বর্ণনা করার এবং বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের ‘সমুদ্র প্রবেশাধিকারের অভিভাবক’ হিসেবে উল্লেখ করার কয়েক দিন পর বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

আরো পড়ুন
এক রাতে ছাত্রদল নেতারসহ ৯ বাড়িতে চুরি

এক রাতে ছাত্রদল নেতারসহ ৯ বাড়িতে চুরি

 

জয়শঙ্কর বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনে (বিমসটেক) ভারতের কৌশলগত ভূমিকা তুলে ধরে, ভারতের সাড়ে ৬ হাজার কিলোমিটার উপকূলরেখা এবং বিমসটেকের পাঁচ সদস্যের সঙ্গে ভারতের ভৌগোলিক সংযোগের ওপর আলোকপাত করেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বোপরি আমাদের বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘতম উপকূলরেখা রয়েছে, যা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কিলোমিটার। ভারত শুধু পাঁচটি বিমসটেক সদস্যের সঙ্গেই সীমান্ত ভাগ করে না, তাদের বেশির ভাগকে সংযুক্তও করে। ভারতীয় উপমহাদেশ ও আসিয়ানের মধ্যে সংযোগের একটি বড় অংশও প্রদান করে।

জয়শঙ্কর বলেন, “বিশেষ করে আমাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল বিমসটেকের জন্য একটি ‘সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে’ আবির্ভূত হচ্ছে, যেখানে সড়ক, রেলপথ, পানিপথ, গ্রিড ও পাইপলাইনের অসংখ্য নেটওয়ার্ক রয়েছে।’

আরো পড়ুন
তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

 

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সচেতন যে—এই বৃহত্তর ভৌগোলিক ক্ষেত্রে পণ্য, পরিষেবা এবং মানুষের সুষ্ঠু প্রবাহের জন্য আমাদের সহযোগিতা এবং সুবিধা প্রদান একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। এই ভূ-কৌশলগত বিষয়কে মাথায় রেখে আমরা গত দশকে বিমসটেককে শক্তিশালী করার জন্য ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং মনোযোগ নিবেদিত করেছি। আমরা আরো বিশ্বাস করি যে— সহযোগিতা একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, চেরি-পিকিং (পক্ষপাতদুষ্ট) বিষয় নয়।

মন্তব্য

১৮ বছর কাটিয়েছেন বিমানবন্দরে, মেহরান কারিমি নাসেরির অদ্ভুত জীবন

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
১৮ বছর কাটিয়েছেন বিমানবন্দরে, মেহরান কারিমি নাসেরির অদ্ভুত জীবন
মেহরান কারিমি নাসেরি। ছবি : এএফপি

আমরা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার জন্য বিমানবন্দরে অবস্থান করি, হয়তো কোনো ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু কল্পনা করুন, একজন মানুষ তার জীবনের ১৮ বছর কাটিয়ে দিলেন একটি এয়ারপোর্টে! এটা কোনো গল্প নয়, বরং বাস্তব ঘটনা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ইরানি নাগরিক মেহরান কারিমি নাসেরিকে শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে আটকা পড়তে হয়। ঘটনাটি ১৯৮৮ সালের ৮ আগস্টের।

৪২ বছর বয়সী মেহরান লন্ডন যাওয়ার উদ্দেশ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবতরণ করেন। 

তার পরিকল্পনা ছিল এয়ারপোর্টে ট্রানজিট নিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়া, যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধল যখন দেখা গেল, তার কাছে বৈধ পাসপোর্ট নেই। কোনো বিমান সংস্থা তাকে লন্ডনে নিয়ে যেতে রাজি হলো না, ফলে তিনি ফ্রান্সেই আটকে গেলেন।

বিমানবন্দরে আটকে পড়া এই অদ্ভুত জীবনের ওপর একটি বই লিখেছেন ব্রিটিশ লেখক এন্ড্রু ডনকিন— ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’।

বিমানবন্দরেই তার কেটে গেছে দেড় যুগ। মেহরানের ধারণা ছিল, কয়েকদিনের মধ্যে এই জটিলতা মিটিয়ে ফেলতে পারবেন এবং তিনি যুক্তরাজ্যে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। কিন্তু সেই কয়েকদিন গড়াতে গড়াতে ১৮ বছর পেরিয়ে যায়।

তিনি বিমানবন্দর ছেড়ে যেতে চাননি, কারণ ফ্রান্সে ঢুকতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে ছিল না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, পুরো ফ্রান্সে এই বিমানবন্দরই একমাত্র জায়গা যেখানে তিনি নিরাপদ। এয়ারপোর্টের বসার বেঞ্চ, সেখানকার খাবারের দোকান আর টার্মিনালের কর্মচারীরা হয়ে ওঠেন তার নিত্যসঙ্গী।

এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা, মাইকের ঘোষণা, যাত্রীদের কোলাহল— এই সবকিছুর মধ্যেই মেহরান কাটিয়েছেন তার প্রতিদিনের জীবন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠতেন, ওয়াশরুমে যেতেন, এবং তারপর নাস্তার জন্য ম্যাকডোনাল্ডসে বসতেন।

দুপুরের খাবারও সেখানেই খেতেন।

কিন্তু এত বছর ধরে তার খরচ চলল কীভাবে? বিমানবন্দরের কর্মচারীরা তাকে খাবারের জন্য মিল ভাউচার দিতেন, যা দিয়ে তিনি প্রতিদিনের খাবার কিনতেন। বাকি সময় তিনি ডায়েরি লিখতেন— প্রতিদিন কী খেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, এমনকি সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাবলিও সেখানে লিখে রাখতেন।

এয়ারপোর্টের ডাক্তার আলফ্রেডকে বেশ কিছু এ-ফোর সাইজের কাগজ দিয়েছিলেন। আলফ্রেড তার দিনলিপি লেখার কাজে এসব কাগজ ব্যবহার করেছিলেন। প্রতিদিন সম্ভবত তিনি ২০ পাতার মতো লিখতেন। এসব করতে করতেই তার অনেক সময় চলে যেত। বাকি সময় তিনি বই পড়ে কাটাতেন। ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যাপারে তার অনেক আগ্রহ ছিল।

মেহরান কারিমি নাসেরি ১৯৯৪ সালে বিবিসিকে একটা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, এয়ারপোর্টে বাস করার মধ্যে ভালো এবং খারাপ দুটো দিকই আছে।

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে আমার অভিজ্ঞতা খুব একটা খারাপ নয়। প্রতিদিনই আমি খুব সুন্দর সময় কাটানোর চেষ্টা করেছি। অল্প কিছু জায়গার মধ্যে আমি একাই ছিলাম। সুখী হওয়ার মতো খুব বেশি কিছু ছিল না। তবে আমি আশা করি যে সবকিছুই সুন্দরভাবে শেষ হবে।’

মেহরান এক সময় বুঝতে পারেন তার নাম উচ্চারণ করা ইংরেজি ভাষাভাষীদের জন্য কঠিন। একবার তিনি ব্রিটিশ দূতাবাসে নাগরিকত্বের জন্য চিঠি লেখেন। সেখান থেকে উত্তর আসে— ‘ডিয়ার স্যার’ অথবা ‘ডিয়ার আলফ্রেড’। এই চিঠি পাওয়ার পর তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন— ‘ব্রিটিশ সরকার আমাকে নাগরিকত্ব দেয়নি, কিন্তু নাইটহুড দিয়েছে!’

কেন তিনি যুক্তরাজ্যে যেতে চেয়েছিলেন?

১৯৪৫ সালে ইরানে জন্ম নেওয়া মেহরান জীবনের বেশ কিছু সময় বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে কাটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তার মা ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। তাই তিনি যুক্তরাজ্যে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার কাছে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় বারবার তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়। 

১৯৯৯ সালে ১১ বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর ফ্রান্স তাকে শরণার্থীর মর্যাদা দেয়। কিন্তু ততদিনে তিনি বিমানবন্দরের জীবনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি সেখানে থাকতে চাইলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি, এমন একটা পরিস্থিতিতে কেউ ১১ বছর ধরে থাকতে পারে না। এটা একাধিক সরকারের ব্যর্থতার ফল।’

মেহরান কারিমি নাসেরি: সিনেমার চরিত্র হয়ে ওঠা

ব্রিটিশ লেখক এন্ড্রু ডনকিন ২০০৪ সালে তার এই আশ্চর্য কাহিনী সম্পর্কে জানতে পারেন। তার এই অদ্ভুত জীবনের ওপর ভিত্তি করে ২০০৪ সালে হলিউডে তৈরি হয় স্টিভেন স্পিলবার্গের সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন টম হ্যাঙ্কস। সিনেমার স্বত্ব বিক্রি করে মেহরান প্রায় ২.৭৫ লাখ ডলার পান। এরপর রাতারাতি তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তার সম্পর্কে লেখক এন্ড্রু ডনকিন বলেন, ‘তিনি যেন হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষ। বিমানবন্দর তার বাড়ি হয়ে গিয়েছিল। তার কাহিনী শুনে অনেকে দুঃখ পেয়েছে, আবার অনেকেই মনে করেছে তিনি ভাগ্যবান— কারণ তার সংসারের কোনো ঝামেলা নেই।’

তিনি বলেন, ‘একদিন আমি একটা ফোন পাই। ওপাশ থেকে বলা হলো— আপনি কি আজ বিকেল তিনটার মধ্যে শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে আসতে পারবেন? এমন একজন আছেন যিনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’ ডনকিন দ্রুত বিমানবন্দরে যান এবং সেখানেই পরিচয় হয় মেহরান কারিমি নাসেরির সঙ্গে।

এন্ড্রু ডনকিন বলছেন, মেহরান ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান ‌এক ব্যক্তি। তার জীবনে তাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি এমন একটা বিমানবন্দরে ছিলেন যা সবসময় ব্যস্ত। সেখানে সারাক্ষণ শব্দ হচ্ছে, মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। ফলে নানা রকমের দূষণের মধ্যে তাকে থাকতে হয়েছে। আশেপাশে যারা ছিল তাদের দিক থেকেও নানা ধরনের বিপদের ঝুঁকি ছিল। তাকে আমার খুব ভাল লেগেছিল। প্রথমবার সাক্ষাতের পর থেকেই আমাদের মধ্যে একটা ভাল সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল বলে জানান লেখক ডনকিন।

শেষ পরিণতি

২০০৬ সালে তিনি বিমানবন্দর ছেড়ে যান। এরপর ফুসফুসের সংক্রমণের কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার জিনিসপত্র প্যারিসের গৃহহীনদের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে তিনি বিমানবন্দরকে এতটাই আপন করে ফেলেছিলেন যে, ২০২২ সালে আবার ফিরে আসেন শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে। কিন্তু ফিরেও খুব বেশিদিন বাঁচেননি।  ১২ নভেম্বর, ২০২২ সালে সেখানেই মারা যান। তখন তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

এক বিরল জীবনের গল্প

মেহরান কারিমি নাসেরির জীবন যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক অদ্ভুত উদাহরণ। একদিকে তিনি ভাগ্যবান, কারণ তার কাহিনী সিনেমা ও বইয়ের মাধ্যমে অমর হয়ে গেছে। অন্যদিকে, তার জীবন একটি বিমানবন্দরের বেঞ্চে আটকে ছিল। একটি নো-ম্যানস ল্যান্ডে তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রায় দুই দশক— যে জীবন কল্পনাকেও হার মানায়।

সূত্র : বিবিসি বাংলা


 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ