শুক্রবার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জান্তা আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্যের জন্য বিরল অনুরোধ করেছে এবং ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এএফপির সাংবাদিকরা জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংকে নাইপিদোর একটি হাসপাতালে আসতে দেখেছেন, যেখানে মধ্য মায়ানমারে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
জান্তার মুখপাত্র জাও মিন তুন হাসপাতালে এএফপিকে বলেন, ‘আমরা চাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মানবিক সাহায্য প্রদান করুক।’ হতাহতের সংখ্যা এখনও প্রকাশ পায়নি তবে বিচ্ছিন্ন সামরিক সরকার সাহায্যের জন্য আবেদন করছে।
যেটা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে খুব কমই করে থাকে দেশটি। এ ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা বৃহৎ পরিসরে সাহায্যের জন্য আবেদন করছে।
জান্তা এক বিবৃতিতে বলেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছয়টি এলাকায় জরুরি অবস্থা কার্যকর রয়েছে। সেগুলো হলো, সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, উত্তর-পূর্ব শান রাজ্য, নেপিদো এবং বাগো।
জাও মিন তুন বলেছেন, মান্দালয়, নেপিদো এবং সাগাইং-এর রোগীদের জন্য রক্তদানের প্রয়োজন।
এদিকে এ ঘটনায় দেশটির রাজধানী নেপিডোর বিভিন্ন সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এএফপির সাংবাদিকদের বর্ণনা দিয়েছেন, মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে অংশবিশেষ খসে পড়েছে।
নেপিডো শহরে ২০ লেন পর্যন্ত প্রশস্ত রাস্তা আছে।
এএফপির সাংবাদিকেরা বলেছেন, ভূমিকম্পের কারণে শহরের বিভিন্ন সড়কে ফাটল তৈরি হয়েছে।
ভূমিকম্পের সময় এএফপির সাংবাদিকদের একটি দল নেপিডোর জাতীয় জাদুঘরে অবস্থান করছিল। তারা বলেছেন, ভূমিকম্পের সময় ভবনের ছাদ থেকে অংশবিশেষ ভেঙে পড়ে এ। ভবনে অবস্থানকারী কর্মীরা দৌড়ে বের হয়ে যান।
তাদের কেউ কেউ কাঁপছিলেন এবং কারো কারো চোখে ছিল পানি। কেউ কেউ প্রিয়জনদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। প্রায় আধা মিনিট ধরে কম্পন চলেছে। ভূমিকম্পের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মায়ানমার ফায়ার সার্ভিসেস বিভাগের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করার জন্য ইয়াঙ্গুনে অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং ঘুরে দেখছি। এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।’ মায়ানমারের প্রাচীন রাজকীয় রাজধানী মান্দালয় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলোতে ধসে পড়া ভবন এবং শহরের রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে পোস্টগুলো যাচাই করতে পারেনি।
শহরের একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে বলেছেন, ‘সবকিছু কাঁপতে শুরু করলে আমরা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। আমি আমার চোখের সামনে একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। শহরের সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে এবং কেউ ভবনের ভেতরে ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছে না।’
শহরের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী থেত নাইং ওও রয়টার্সকে বলেছেন, ‘একটি চায়ের দোকান ধসে পড়েছে এবং ভেতরে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছে। আমরা ভেতরে যেতে পারিনি, পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’ তৃতীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, শহরের একটি মসজিদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চীনের সিনহুয়া সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, মায়ানমারের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম ইউনান প্রদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
ইয়াঙ্গুনে যোগাযোগ করা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দেশের বৃহত্তম শহরের ভবনগুলো থেকে অনেক লোক দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল। থাইল্যান্ডের তুলনায় মায়ানমারে ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে দেশটিতে সাত মাত্রার ছয়টি ভূমিকম্প আঘাত হানে যার সবগুলোই ছিল সাগাইং ফল্টের কাছে। ভূপৃষ্ঠের নিচের ওই ফাটল দেশটির মাঝ বরাবর চলে গেছে। থাইল্যান্ড মূলত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল নয়। কিন্তু সেখানে অনুভূত হওয়া প্রায় সব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হয় প্রতিবেশী মিয়ানমার। ব্যাংককের ভবনগুলোর শক্তিশালী ভূমিকম্প সহ্য করার ক্ষমতাসম্পন্ন নয়, এ কারণে সেখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অকাঠামোগত ক্ষতি হতে পারে।
সূত্র : এএফপি