চাকরি, লেখাপড়া, যুদ্ধ-বিপর্যয় থেকে আত্মরক্ষা ও উন্নত জীবন লাভের আশায় মুসলিম দেশ থেকে বহু মুসলিম অমুসলিম দেশে পাড়ি জমায়। তাদের অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদে অমুসলিম দেশে বসবাস করে। আবার কেউ কেউ অমুসলিম দেশের নাগরিকত্বও গ্রহণ করে। অমুসলিম দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো মুসলিম পরিচয় রক্ষা করা, বিশেষত অমুসলিম দেশে বসবাসকারী মুসলিম পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানদের অনেকেই ইসলাম ও ইসলামী জীবনধারা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, মুসলিম পরিচয় ত্যাগ করছে, যা খুবই উদ্বেগজনক।
মুসলিম পরিচয় যেভাবে সুরক্ষিত হয়
আতাউর রহমান খসরু

মুসলিম পরিচয় বহনের গুরুত্ব
একজন মুসলমানের জন্য মুসলিম পরিচয় বহন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে তা অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ কোরো না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)
আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির জীবনই মুসলমানের জীবন।
পূর্ণ পরিচয় বহন করা আবশ্যক
মুসলমানের জন্য আবশ্যক হলো পরিপূর্ণরূপে ইসলামকে ধারণ করা। আংশিক পরিচয় ধারণ এবং আংশিক ত্যাগ করা গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না।
আয়াতের ব্যাখ্যায় মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘তোমরা একই ধর্মাচার মেনে চলো, পরিপূর্ণ ইসলাম মান্য করো এবং তার ওপর দৃঢ় থাকো।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৩/৩৯২)
পরিবার রক্ষায় চাই বিশেষ পরিকল্পনা
অমুসলিম দেশের ইসলামবিমুখ সমাজে পরিবারের সদস্যদের দ্বিন ও ইসলাম রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক। যেমন—পরিবারে দ্বিনচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, শিশুদের প্রয়োজনীয় দ্বিনি শিক্ষা নিশ্চিত করা, পরস্পরকে দ্বিন পালনে উৎসাহিত করা ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতারা, যারা অমান্য করে না তা যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন।
আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা আবশ্যক
ইসলাম মা-বাবা ও অভিভাবককে সন্তান-সন্তুতি ও অধীনদের দ্বিনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার গুরুদায়িত্ব দিয়েছে। কেউ যদি এই দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে তাহলে পরকালে তাঁকে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক নবজাতক ফিতরতের (ইসলামের) ওপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অগ্নি উপাসকে পরিণত করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৮৫)
মুসলিম পরিচয় রক্ষার উপায়
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুসলিম পরিচয় রক্ষার কয়েকটি উপায় বর্ণনা করা হলো। যার মূলকথা হলো, ইসলাম ও মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা অন্তরে ধারণ করা এবং হীনম্মন্যতার শিকার না হওয়া। যেমন—
১. ইসলামই আলো : সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির জন্য ইসলামই আলো। ইসলাম ছাড়া আলোকিত জীবনযাপন সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায়, এর (কোরআন) দ্বারা তিনি তাদের শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। তাদের সরল পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১৬)
২. ইসলামই পূর্ণাঙ্গ : পৃথিবীতে যত দ্বিন ও ধর্ম আছে তার মধ্যে আল্লাহ ইসলামকেই পূর্ণতা দান করেছেন। তাই ইসলামকেই ধারণ করতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বিন মনোনীত করলাম।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩)
৩. মুসলমানই শ্রেষ্ঠ জাতি : মুমিন অন্তরে এই বিশ্বাস লালন করে যে মুসলমানই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। তাই মুসলিম পরিচয় ধারণ করা লজ্জার নয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহতে বিশ্বাস করো।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)
৪. আল্লাহর আনুগত্য সর্বত্র : মুমিন আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে ইসলামের পরিচয় ধারণ করে। আল্লাহর আনুগত্য দেশে ও প্রবাসে সর্বত্র আবশ্যক। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো, মন্দ কাজের পরপরই ভালো কাজ করো, তাতে মন্দ দূরীভূত হয়ে যাবে এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৭)
৫. দৃঢ়তাই সাফল্য : প্রতিকূল পরিবেশে ঈমান ও ইসলামকে আঁকড়ে ধরা এবং তার ওপর দৃঢ় থাকাই সাফল্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন পথ দেখায় সেই পথের দিকে, যা সুদৃঢ় ও সত্কর্মপরায়ণ মুমিনদের জন্য সুসংবাদ দেয় যে তাদের জন্য আছে মহাপুরস্কার।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)
৬. সুপথে চলার সুফল নিজের : সুপথে চলতে কষ্ট হলেও এর সুফল ব্যক্তি নিজেই ভোগ করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সৎপথ অনুসরণ করে, সে সৎপথ অনুসরণ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য। আর কেউ ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করলে তুমি বলো, আমি তো কেবল সতর্ককারীদের জন্য একজন।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ৯২)
৭. পরকালই প্রকৃত ঠিকানা : মুমিনের প্রকৃত ঠিকানা পরকাল। তাই সে পার্থিব স্বার্থের জন্য পরকালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। আল্লাহ বলেন, ‘কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দাও, অথচ আখিরাতই উত্কৃষ্টতর এবং স্থায়ী।’ (সুরা : আলা, আয়াত : ১৬-১৭)
পরিচয় ত্যাগের ক্ষতি
কোরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে মুসলিম পরিচয় ত্যাগ করার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪০৩১)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘দাড়ি-চুলের শুভ্রতাকে পরিবর্তন করো, আর ইহুদিদের অনুকরণ কোরো না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫০৭৩)
মনে রাখতে হবে, কোনো অমুসলিম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইসলাম ও ইসলামের পরিচয় ত্যাগের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। কেননা তারা মুসলিমদের ঈমানহারা না করা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হয় না। পবিত্র এই বাস্তবতায় তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ কতই না চমৎকার বলেছেন, ‘ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তোমার প্রতি কখনো সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করো। বলো, আল্লাহর পথনির্দেশই প্রকৃত পথনির্দেশ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২০)
আল্লাহ সবাইকে স্বদেশে ও প্রবাসে ঈমান ও ইসলাম রক্ষা করে চলার তাওফিক দিন। আমিন।
সম্পর্কিত খবর

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়
মুফতি আতাউর রহমান

আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা। প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহও তাঁর বান্দাকে ভালোবাসবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৪)
আল্লাহর ভালোবাসার গুরুত্ব
শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) এক ফাতাওয়ায় বলেছেন, ‘মুমিনের জন্য হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা ওয়াজিব।
১. আল্লাহর ভালোবাসা ঈমানের দাবি : মুমিনের ঈমানের দাবি হলো আল্লাহকে ভালোবাসা। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা পেয়ে যায় : ১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সব কিছু অপেক্ষা বেশি প্রিয় হবে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৮৭)
২. আল্লাহর ভালোবাসা মুমিনের
বৈশিষ্ট্য : আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা লালন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মুমিন তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।
৩. ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে লেখেন, ‘আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তরের শক্তি, আত্মার খোরাক ও চোখের প্রশান্তি। সেটা এমন জীবনীশক্তি, যা থেকে যে বঞ্চিত হয় সে যেন প্রকৃতার্থেই মৃত। আল্লাহর ভালোবাসাই ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা।’ (মাদারিজুস সালিকিন : ৩/৮)
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়
কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়গুলো বর্ণনা করা হলো—
১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য : মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো।
২. ভালো কাজ করা : মহান আল্লাহ সেসব মানুষকে ভালোবাসেন, যারা সৎকর্মপরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সৎ কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)
৩. দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জন করা : যারা পূতঃপবিত্র থেকে ভালোবাসে এবং যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। দেহের পবিত্রতা হলো বাহ্যিক নাপাকি থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)
৪. আল্লাহভীতি অর্জন করা : যাপিত জীবনে আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৬)
৫. আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : আল্লাহর ওপর আস্থাশীল বান্দাদের আল্লাহ ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
৬. নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভে সাহায্য করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৩)
৭. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)
৮. ন্যায়বিচার করা : আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)
আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল
শরিফ আহমাদ

ঘরবাড়ি প্রত্যেক মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। দিনশেষে ক্লান্তির শেষ ঠিকানা। ঘরে ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে পরিবারে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে। পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
ঈমান-আকিদা পরিশুদ্ধ করা
নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধ রাখা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা ঈমান-আকিদা সঠিক না হলে কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।
নামাজের স্থান নির্দিষ্ট করা
ইসলাম নারীদের জন্য বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার বিধান দিয়েছে। নামাজের ক্ষেত্রে ঘরের অভ্যন্তরীণ স্থানকে সর্বোত্তম বলেছে। এটি তাদের ইজ্জত, পর্দা ও সম্মান রক্ষার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রা.)-এর স্ত্রী উম্মে হুমাইদ একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়তে আমার ভালো লাগে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তা আমি জানি।
আবার বারান্দার কামরায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। এবং তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম, একইভাবে তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়া তোমার জন্য আমার মসজিদে এসে আমার সঙ্গে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শোনার পর তিনি পরিবারের লোকদের ঘরের ভেতরে নামাজের স্থান বানাতে বলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হলো। এরপর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই নামাজ পড়তে থাকেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২২১৭)
দোয়া ও জিকিরের আমল
বেশির ভাগ সময় নারীরা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রয়োজনীয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোয়া ও জিকির করা যায়। এতে তাঁদের আত্মিক প্রশান্তি ও ঈমানের দৃঢ়তা এনে দেয়। আল্লাহর ভালোবাসা ও রহমত লাভের পথ সুগম করে। প্রিয় নবীর প্রিয় পরিবারে সকাল-সন্ধ্যায় আমলের পরিবেশ ছিল। জুওয়াইরিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যুষে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। যখন তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন তখন তিনি নামাজের জায়গায় ছিলেন। এরপর তিনি চাশতের সময়ের পর ফিরে এলেন। তখনো তিনি বসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম তুমি সেই অবস্থায়ই আছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি তোমার নিকট থেকে যাওয়ার পর চারটি কালেমা তিনবার পাঠ করেছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সঙ্গে ওজন করলে এই কালেমা চারটির ওজনই বেশি হবে। কালেমাগুলো এই—‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিদা নাফসিহি ওয়া ঝিনাতা আরশিহি ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৫)
উন্নত আখলাক ও চরিত্র গঠন
ঘরবাড়িতে ইবাদতময় পরিবেশ তৈরিতে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত আখলাক ও চরিত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতির সবক শেখায়। এর উল্টো চিত্র হলে কখনোই ঘর কুসুম কাননের সৌরভে ভরা সম্ভব নয়। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো, অমুক মহিলা দিনে রোজা রাখে আর সারা রাত ইবাদত-বন্দেগি করে। কিন্তু সে কটু কথা বলে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো লাভ নেই—সে জাহান্নামে যাবে। আর এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো যে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে এবং যথাসাধ্য দান-সদকা করে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে জান্নাতে যাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৩০২)

রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত
ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা

রমজান মাস এবং ফরজ রোজা শেষ হলেও বছরজুড়ে বিভিন্ন রোজা রয়েছে। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সেসব রোজার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রোজার বিবরণ নিম্নরূপ—
১. এক দিন পর পর রোজা
এক দিন পর পর রোজা রাখাকে সাওমে দাউদ বলে। দাউদ (আ.) এভাবে রোজা রাখতেন।
২. সপ্তাহের রোজা
সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা রাসুল (সা.) পছন্দ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার (বান্দার) আমল (আল্লাহর কাছে) উপস্থাপিত হয়। আমি পছন্দ করি যে রোজা অবস্থায় আমার আমল উপস্থাপন হোক।
৩. মাসের রোজা
প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজাকে আইয়ামে বিজের রোজা বলে। নিয়মিতভাবে এই তিন দিনের রোজা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (বুখারি, হাদিস : ১৮৮০)
৪. আশুরার রোজা
মহররম মাসের ১০ তারিখ হলো আশুরা। রমজানের রোজা ফরজ হওয়া আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।
৫. শাবান মাসের রোজা
নবী (সা.) শাবান মাসে খুব বেশি পরিমাণে রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে বেশি রোজা পালন করেননি। তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা পালন করতেন।
৬. শাওয়াল মাসের রোজা
রমজানের পর শাওয়াল মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখে, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন বছরজুড়ে রোজা রাখে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮১৫)
৭. জিলহজ মাসের রোজা
জিলহজ মাসের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত মোট ৯টি রোজার ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছর রোজার সমতুল্য। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৫৮)
জিলহজ মাসের নবম দিন হলো আরাফার দিন। এই দিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আশা করি আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ব ও পরের এক বছরের পাপ মোচন করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮০৩)
৮. মানতের রোজা
রোজাসহ কোনো কিছুর মানত করলে তা পূরণ হলে মানতকারীর ওপর রোজা পালন করা অপরিহার্য। নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে নির্দিষ্ট দিনে আর অনির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে যেকোনো দিনে রোজা পালন করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের উচিত মানতকে পুরা করা।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৯)
৯. কাজা রোজা
যৌক্তিক ও সংগত কারণে রমজানের রোজা আদায় করতে না পারলে পরে তার কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে। আর কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পুরো করবে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)
১০. কাফফারার রোজা
স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাজাসহ কাফফারা হিসেবে লাগাতার ৬০টি রোজা রাখতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (সা.) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিসে তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, রমজানে রোজা অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার দাস মুক্তির সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে পারবে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। (বুখারি, হা: ১৮৩৪; মুসলিম, হা: ২৬৫১)
এ হাদিস থেকে স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারার বিধান প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজের কাফফারায় রোজা পালন করার বিধান রয়েছে।

রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়
মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

চলে গেল বছরের সেরা মাস ‘রমজান’। রমজানের বিদায়ে মসজিদে মুসল্লির ভিড় দেখা যাচ্ছে না! রমজানের বিদায়ে কি নামাজও হলো বিদায়? রমজানের পর অনেকে নামাজ ছেড়ে দেন, এটা দুঃখজনক! বরং সারা বছর রমজানের অর্জনগুলো চর্চায় রাখতে হবে। যেমন—
১. ধর্মভীরুতা : রমজান মানুষের মধ্যে ‘তাকওয়া’ (ধর্মভীরুতা) সৃষ্টি করেছিল। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো, যেমন ভয় করা উচিত এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।
আয়াতে বর্ণিত ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো’ এবং ‘মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না’ বাণীদ্বয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লামা বায়যাভির (রহ.) মতে, তাকওয়ার সোপান তিনটি—(ক) শিরক থেকে বিরত থাকা (খ) সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা (গ) পাপের ভয়ে বৈধ কাজও পরিহার করা।
২. ধৈর্য : রমজান মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। শান্তিতে, সংগ্রামে, রোগ-যন্ত্রণায়, দুঃখ-শোক, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় তথা জীবনের সব প্রতিকূল ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনন্ত সংগ্রাম করাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের প্রতীক।
মুফতি মুহাম্মদ শফির (রহ.) মতে, ধৈর্য বা সবর তিন প্রকার—
১. নফসকে (প্রবৃত্তি) হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা।
২. আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা।
৩. যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা।
৩. সহানুভূতি : হাদিসের ভাষায় সহানুভূতির মাস রমজান। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো এবং সহিষ্ণুতায় পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করো; সহিষ্ণুতার বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ২০০)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও ধর্মভীরুতায় একে অন্যকে সহযোগিতা (প্রতিযোগিতা) করবে... আল্লাহকে ভয় করে চলো...’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
৪. পাপ পরিহার : রমজান মানুষের ষড়রিপুর বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় নবীর (স.) ভাষায় ‘রোজা ঢালস্বরূপ’। অথচ সিয়াম সাধনার দ্বারাও যারা মিথ্যা পরিহারের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন ‘তাদের পানাহার পরিত্যাগের কোনোই মূল্য নেই।
প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘তোমরা মিথ্যার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা, মিথ্যা পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি)
৫. কথাবার্তায় সংযম : রোজা মানুষকে কথাবার্তায় সংযমী করে। আমরা যা কিছু বলি, যা কিছু করি মহান আল্লাহ সবই জানেন, দেখেন, বোঝেন এবং বলেন ‘মানুষ যে কথাই বলুক না কেন তার কাছে একজন দৃষ্টিপাতকারী প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)
প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া করা কুফরি।’ (বুখারি)
এখন ভাবা উচিত রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে কতটুকু?
৬. তাওবা : তাওবার মাস রমজান। তাওবার গুরুত্ব অপরিসীম। রমজানের শিক্ষা, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না...’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান দোষ-ত্রুটিপূর্ণ ও অপরাধী, আর অপরাধীর মধ্যে ওই সব লোক উত্তম, যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি)
৭. দোয়া : দোয়া কবুলের মাস রমজান। আমাদের কর্তব্য, সারা বছর সমর্পিতচিত্তে দোয়া করা। দোয়া অর্থ ডাকা বা চাওয়া। মহান আল্লাহর বাণী ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৬)
পবিত্র কোরআন-হাদিসে ও বুজুর্গাণের বহুল চর্চিত-পরীক্ষিত আমলে দোয়ার শক্তির ধারণা মেলে। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)
৮. তিলাওয়াত : রমজানে আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করেছি। রমজানের পরও উচিত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস বজায় রাখা। পবিত্র কোরআন ও রমজানের প্রাণোচ্ছাসে মুজাদ্দিদ আলফিসানির (রহ.) নিবেদন :
‘এ আবে হায়াত থেকে পিপাসা চাহি না মিটাতে কভু
এর মাঝে যেন হরদম মোর তৃষ্ণা বাড়ান প্রভু।’