পরকীয়ার অভিযোগ তুলে প্রবাসীর স্ত্রী ও যুবককে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের ক্ষতস্থানে লবণ-মরিচ লাগিয়ে দেয় স্থানীয়রা। মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) সকালে বামরাইলে তাদের দুজনকে এক রশিতে বেঁধে মারধর করা হয়। ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নে ঘটেছে।
আটকরা হলেন- গৌরনদী উপজেলার পালরদী এলাকার যুবক ও উজিরপুরের বামরাইল গ্রামের সৌদি প্রবাসীর স্ত্রী।
আরো পড়ুন
একসঙ্গে দেখা গেল পলাতক সাবেক ৪ মন্ত্রীকে
ওই নির্যাতনের একটি ভিডিও মঙ্গলবার বিকেলের দিকে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের ভিডিওয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুইজনের আর্তনাদ শোনা যায়। দুজনকে ঘীরে সেখানে নির্যাতনের দৃশ্য অন্তত ২০জন শিশু আর নারী দেখছিলেন।
তাদের রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি। সেই ভিডিও কালের কণ্ঠের কাছে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, মঙ্গলবার সকালে উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনার পর ‘অনৈতিক কার্যকলাপের’ অভিযোগে তাদের দুজনের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের করে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে তাদের বরিশাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
বিচারক রাত ৯টার দিকে তাদের জামিনে মুক্তি দেন। ফলে আদালতের গারদখানা থেকে রাতেই তারা মুক্তি পান। আগামী রবিবার তাদেরকে পুনরায় আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মারধরের শিকার ওই যুবক (২৫) বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা এবং অপরজন উজিরপুর উপজেলার এক প্রবাসীর স্ত্রী। দুজনের সঙ্গেই কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক কথা বলেছেন।
তাদের মধ্যে গৃহবধূ বলছেন, ইতোপূর্বে তাকে এক যুবক ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। এ নিয়ে রমজানে পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে সালিশ মীমাংসা হয়েছিল। তার আগে দুই চোরকে হাতেনাতে তিনি ধরে ছিলেন। তখন চোরের সহযোগিরা তাকে মারধর করে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনায় তিনি উজিরপুর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছিলেন। পুলিশ ঘটনার পর সরেজমিনে এসেছিল। মূলত এই দুটি ঘটনার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে ‘অনৈতিক কার্যকলাপের’ অভিযোগে অভিযুক্তরাই তাদের অমানবিক নির্যাতন করেছেন।
আরো পড়ুন
হাসনাত-সারজিসের উদ্দেশে আবু সাঈদের বাবার নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার
ওই গৃহবধূ আরো বলেন, প্রতিবেশী ভাসাই ফরাজী প্রথমে তার হাত-পা রশি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে ফেলেন। পরে একইভাবে যুবককে খুটির সঙ্গে বাঁধা হয়। দুজনকে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে প্রতিবেশী মনোয়ার হোসেন ফরাজীর ঘরের মধ্যে তাদের আটকে রেখে প্রায় তিন ঘণ্টা মারধর করা হয়েছে। আরিফ ফরাজী, মিজানুর রহমান ফরাজী, সোহেল ফরাজী, ওমর ফরাজী, খায়রুল ফরাজী তাদেরকে মারধর করেন।
ওই গৃহবধু আরো বলেন, জামিন পেয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। তার শরীরের এমন কোন স্থান ফাঁকা নেই যেখানে পুরুষরা তাকে কিল-ঘুষি আর লাঠি দিয়ে আঘাত করেনি। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উজিরপুর থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা তার সঙ্গে হাসপাতালে এসে ঘটনার বর্ণনা শুনেছে। এমনতি তারা পুরো বিষয়টি লিখে নিয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় মামলা দায়ের হয়নি।
অভিযুক্ত যুবক কালের কণ্ঠকে বলেন, মনোয়ার হোসেন ফরাজীর ঘরের মধ্যে তাদের আটকে রাখেন। এক পর্যায়ে অপত্তিকর ভিডিও ধারনের হুমকি দেন। একই সঙ্গে মারধর করেন। তখন মুঠোফোনে তার বাবার সঙ্গে হামলাকারীরা কথা বলিয়ে দেন। সে অনুযায়ী ওই যুবকের বাবা তাদের নগদ এক লাখ ১০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। একই সঙ্গে তার সাথে থাকা মুঠোফোন আর পাঁচ লাখ টাকা মূল্যেও মোটরসাইকেলটি রেখে দেয়। তার কাছ থেকে কিছুই নেওয়া হয়নি বলে তার ভিডিও তারা ধারণ করে রাখে।
খায়রুল ফরাজী, মনোয়ার হোসেন ফরাজী সাংবাদিকদের জানান, নারীর চরিত্র খারাপ। এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছিলেন। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানালে ওই নারী খায়রুল ফরাজীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ তুলেছিলেন। এ নিয়ে ২৯ মার্চ দুপুরের দিকে খায়রুলের বাসার উঠানে সালিশ মীমাংসা হয়েছিল। সেখানে থানার দুই পুলিশ আলমগীর হোসেন ও জাহিদ হোসেন, স্থানীয় খলিল ফরাজীসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। মঙ্গলবার ওই নারী পুনরায় তার ঘরে অপরিচিত এক যুবককে ঢুকতে দেন। তখন ওই যুবককে ধরে চড় থাপ্পর দিয়ে পুলিশে দেয়া হয়। স্থানীয়রাই তাদেরকে অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য বেঁধে রেখেছিল। টাকা নেয়ার কথা তারা অস্বীকার করেন।
আরো পড়ুন
কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে হাজতির মৃত্যু
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম বলেন, স্থানীয়রা দুজনকে একটা বাড়িতে আটকে রেখে খবর দিলে তারা তাদের থানায় নিয়ে আসেন। পুলিশ বাদী হয়ে অনৈতিক কার্যকালাপের অভিযোগ এনে মামলা করে দুজনকে আদালতে পাঠিয়েছিল। রাতেই তারা জামিন পেয়েছেন। ওই গৃহবধূর সঙ্গে পুলিশ বুধবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে কথা বলেছে। তার পরিবারকে থানায় এসে মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়েছে। ভিডিওটি তিনি দেখেছেন বলে স্বীকার করে বলেন, এটি অমানবিক। ঘটনার পর তাদেরকে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।