পটুয়াখালীর গলাচিপার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যেন মিশে রয়েছে রাবনাবাদ নদীটি। নদীটি উপজেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে একপ্রান্ত পটুয়াখালীর সঙ্গে মিশেছে, অপর প্রান্ত বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। সেই অনাদিকাল থেকে গলাচিপার মৎস্য বাণিজ্য আর কৃষি পণ্য পরিবহনের বেশিরভাগই রামনাবাদ দিয়েই হয়ে আসছে।
রাবনাবাদ তীরভূমির মাটি কেটে বাঁধ দিয়ে দখল চলছে।
আবার কেউ কেউ নদীর তীরে জেগে ওঠা নতুন চরের মাটি কেটে বাঁধ দিচ্ছেন। অনেকেই সেখানে চাষ করছেন তরমুজ। কেউ কেউ নির্মাণ সামগ্রী রেখে তীর দখল করে আছেন। এভাবে বেদখল হয়ে যাচ্ছে নদীর তীরভূমি। ভূমি কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে নদীর তীরভূমি দখল চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নদীর তীর ভরাট করে দখল করায় শীত মৌসুমে বড় নৌকাগুলো চলতে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রাণ আর পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিবেশ কর্মীদের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি রাবনাবাদ নদী তীরভূমি দখলের স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করে এমন মন্তব্য করেছেন।
তারা বলছেন, নদীর তীরভূমি দখল এভাবে দখল আইনসঙ্গত নয়।
আরো পড়ুন
ঈদের ছুটি শেষে চেনা রূপে রাজধানী
সম্প্রতি পরিবেশকর্মীরা সরেজমিন গিয়ে দেখতে পান, গলাচিপা শহরের লঞ্চঘাট সংলগ্ন রাবনাবাদ নদীর তীরভূমি ঘেঁসে এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এভাবে লঞ্চঘাট সংলগ্ন পূর্ব দিকে রাবনাবাদ নদীর তীরভূমি অধিকাংশ বেদখল হয়ে গেছে। সেখানে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। প্রকাশ্যে নদীর তীরভূমির মাটি কেটে এভাবে নদীর চর দখল করলেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাঁধা দেওয়া হয়নি।
চরের মাটি কেটে নদীর তীরভূমিতে বাঁধ দিয়ে তরমুজের আবাদ করেছেন সাঈদ তালুকদার। জানতে চাইলে তরমুজ চাষী সাঈদ জানান, গোলখালী ইউপি সদস্য তাসমিন আক্তার ঝুমুর তার স্ত্রী। উপজেলা প্রশাসন থেকে নদীতীরের তিন একর জমি এ বছর তার স্ত্রী বন্দোবস্ত নিয়ে তরমুজ চাষ করেছেন। তীরভূমির মাটি কেটে বাঁধ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাঁধ না দিলে জোয়ারের পানিতে খেত নষ্ট হবে, এ কারণে বাঁধ দিয়েছি।’
আরো পড়ুন
ঈদের ছুটি শেষে খুলল সরকারি অফিস
নদীতীরের বাসিন্দারা জানান একসময়ের খরস্রোতা রাবনাবাদ নদীটি এখন অনেকটা শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীতীর ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা এখন তীরভূমি ঘেঁষে বাঁধ দিয়ে তরমুজ চাষসহ নির্মাণ সামগ্রীর মালামাল রাখছেন। এতে করে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নদী তীরে চর পড়ে ছোট হচ্ছে রাবনাবাদ নদী।
উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের সার্ভেয়ার হারুন-অর-রশিদ জানান, চলতি বছরের গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক নোটিশে গলাচিপা খেয়াঘাট ও লঞ্চঘাট সংলগ্ন ১০৯ নম্বর জেএলভুক্ত বদরপুর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের জমির বিপরীতে খাস (রাজস্ব) আদায় সাপেক্ষে খাসজমি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ভূমি কার্যালয় থেকে মো. আব্বাস হাওলাদার, দিপঙ্কর ও সোহেল শাহ কামাল গাজী, মো. বাহাদুর শাহ গংদের অনুকূলে প্রদানকৃত খাসজমি ব্যবহারের অনুমতিপত্র বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু বন্দোবস্ত বাতিল করলেও নদীর তীরভূমির বাঁধ এখনো অপসারণ করা হয়নি। ইতিমধ্যে এই জমিতে আবাদ করা তরমুজ উঠে গেছে।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘নদীতীর সীমানা (ফোরসোর) বিশেষ করে বন্দর এলাকায় বাইরে থাকাকে ৫ ফুট এবং ভেতরে থাকবে ৩০ ফুট। এ ছাড়াও উঁচু জোয়ারকালীন পানির সর্বশেষ যে সীমানা থাকবে তার পর থেকে ৫০ ফুটের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে তাকে অনুপ্রবেশকারী বলা হবে। ফোরসোর আইন অনুযায়ী এই সীমানার মধ্যে সরকার বন্দোবস্ত দিতে পারে না।’
বেলা’র বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন বলেন, ‘প্রবাহমান নদী কিংবা খালের তীর ভূমি থেকে মাটি কেটে এভাবে বাঁধ নির্মাণ কেউ করতে পারে না। এটা আইনগতভাবে অবৈধ। বন্দোবস্তের মাধ্যমে নদী তীরভূমিতে কিছু বাঁধ দেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে ভূমি কার্যালয় থেকে বাঁধের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে বেশ কিছু বন্দোবস্ত বাতিল করেছে। বাতিলকৃত ওই জমির এখন বাঁধ কেটে নদীর তীরভূমি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।’
আরো পড়ুন
আরাফাত রহমানের শাশুড়ির মৃত্যুতে তারেক রহমানের শোক
গলাচিপা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাছিম রেজা জানান, নদীর তীরভূমির মাটি কেটে বাঁধ দেওয়ার খবর তারা জানতেন না। তবে বিষয়টি জানার পর নদীর তীরভূমি থেকে মাটি কাটা বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভূমি কর্মকর্তাদের বিষয়টি খোঁজ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাঁধ দেওয়ার ঘটনার সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘কৃষি অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে স্থানীয় কৃষকদের অস্থায়ীভাবে তরমুজ চাষের জন্য নদীচরের কিছু জমি লিজ দেওয়া হয়েছিল। তারা তরমুজ চাষের সুবিধার জন্য নদীর তীরে বাঁধ দিয়েছেন। তরমুজ ফলন সংগ্রহ শেষে ওই বাঁধ অপসারণের কথা। নদীতীরে বাঁধ দেওয়ার আইনগত অধিকার তাদের নেই। তাই বেশ কয়েকজনের লিজ বাতিল করা হয়েছে।’