ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেসে পরিচয় হয়েছিল এক তরুণী ও রিফাত নামে এক যুবকের। হয়তো মেয়েটি বিশ্বাস করেছিল, সে নিরাপদ। হয়তো মনে করেছিল, এই ছেলেটি তার বন্ধু হতে পারে। কিন্তু সেই বিশ্বাস যে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ, তা সে টের পায়নি।
দৃষ্টিপাত
আর কতদিন এমন বর্বরতা চলবে?

আনিসুর বুলবুল

রিফাত তাকে কথা দিয়ে ভুলিয়ে এক স্টেশনে নামায়। সেখানে অপেক্ষায় ছিল তার আরও দুই বন্ধু। তিনজন মিলে মেয়েটিকে টেনে নিয়ে যায় এক অন্ধকার, গোপন জায়গায়। সারারাত ধরে চলে পাশবিক নির্যাতন।
মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত মেয়েটি বুঝতে পেরেছিল, সে আর ফিরবে না। তার কষ্ট, তার চিৎকার, তার শেষ আর্তনাদ—কেউ শোনেনি। বরং সেই বিভীষিকাময় রাতের ভিডিও তারা গর্বের সঙ্গে মোবাইলে তুলে রাখে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই নিথর হয়ে যায় মেয়েটি। ঠান্ডা, নিস্তেজ শরীরটা তাদের কাছে তখন আর কিছুই না—একটা ঝামেলা। সেই ঝামেলা সরিয়ে ফেলতে তারা লাশটি রেললাইনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, এক চুরির ঘটনায় অপ্রত্যাশিতভাবে ফাঁস হয়ে যায় তাদের পৈশাচিক কাহিনি।
রিফাত ধরা পড়ে ইজিবাইক চুরির অভিযোগে।
সেখানে সংরক্ষিত ছিল সেই রাতের ভয়ংকর ভিডিও—এক অসহায় মেয়েকে বেঁধে রেখে নির্যাতনের দৃশ্য!
রিফাত প্রথমে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু পুলিশের চাপ বাড়তেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক লোমহর্ষক সত্য।
পরদিন পুলিশ রেললাইন থেকে যে ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার করেছিল। একটি পরিবার, যাদের মেয়ে নিখোঁজ ছিল, তারা সেটি নিজেদের মেয়ের লাশ মনে করে দাফন করেছিল। কিন্তু এখন জানা গেছে, সেটি তাদের মেয়ের দেহ ছিল না।
তাহলে, আসল মেয়েটি কোথায়? আর যে মেয়েটিকে দাফন করা হলো, সে কে?
প্রতিদিন হারিয়ে যায় কত মেয়ে, কত শিশু, কত মানুষ! রেললাইন, নদী, সড়কের পাশে পড়ে থাকে কত নামহীন লাশ, যার জন্য কেউ কাঁদে না।
এই ঘটনা শুধু একটি হত্যার গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের ভয়ঙ্কর এক আয়না। যেখানে বিশ্বাস প্রতারণা হয়ে যায়, যেখানে মানুষত্ব হিংস্রতায় মিশে যায়, যেখানে অসংখ্য পরিবার অপেক্ষা করে—ফেরার কোনো আশাই না রেখে।
একটি মেয়ে বিশ্বাস করেছিল, সে নিরাপদ। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, রেললাইনের ওপর ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা এক দেহের মতো।
আর কত? আর কতদিন এমন বর্বরতা চলবে?
সম্পর্কিত খবর

অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন তামিম!
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার তামিম ইকবাল খেলার মাঠে আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়েন । তারকা এই ক্রিকেটারের জন্য হেলিকপ্টার আনা হলেও তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হওয়ায় তাকে নিকটস্থ কেপিজে ফজিলাতুন্নেছা বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কার্ডিয়াক টিম তাকে দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে পরবর্তীতে হার্টে ২টি রিং পরান। বর্ণনায় যেটি চিকিৎসক হিসেবে বুঝলাম, তামিম ইকবাল ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক বা Acute Coronary Syndrome এ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তাকে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে মেডিক্যাল পরিভাষায় তাকে বলা হয় প্রাইমারি পিসিআআই অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক আক্রান্ত রোগীকে দ্রুততম সময়ে বিশেষায়িত ক্যাথল্যাবে নিয়ে গিয়ে তাৎক্ষণিক এনজিওগ্রাম করে কালপ্রিট ভ্যাসেল (দায়ী রক্তনালী) তে রিং বা স্টেন্ট পরিয়ে দেয়া হয়।
উন্নত বিশের এই চিকিৎসাটি এখন বাংলাদেশে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে।
সেই সঙ্গে আমি আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই –কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিয়াক টিম উন্নত চিকিৎসা দিয়ে কাদের সাহেবকে বাঁচিয়েছিলেন। তখন উপমহাদেশের প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন ডা. দেবী শেঠি এসে এদেশের হৃদরোগ চিকিৎসার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন এবং ওবায়দুল কাদেরের প্রদত্ত চিকিৎসায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। প্রশ্ন হচ্ছে –যে দুটো মানুষের কথা বলা হলো তারা দুজনেই এদেশের ভিআইপি। তাই তারা ভিআইপি এবং দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা পেয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। একজন সাধারণ মানুষের হার্ট অ্যাটাক হলে তিনি কোথায় যাবেন? কি চিকিৎসা নিবেন? তার জন্য তো আর হেলিকপ্টার চলে আসবে না।
আনন্দের সংবাদ হচ্ছে - বাংলাদেশে অর্ধ শতাধিক কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে যেখানে হৃদরোগের সকল চিকিৎসা ও সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এক সময় একটা এঞ্জিওগ্রাম করার জন্য কমপক্ষে পাশের দেশ ভারতে যেতে হতো। অথচ আজ বাংলাদেশে এঞ্জিওগ্রাম, এঞ্জিওপ্লাস্টি (রিং পরানো), বাইপাস সার্জারি, ভাল্ভ সার্জারি এমনকি বুক না কেটে মিনিমাল ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি (MICS) সফলতার সাথে প্রতিদিন সম্পন্ন হচ্ছে।
তবুও আকস্মিক মৃত্যু থেমে নেই। এর একমাত্র কারণ একিউট মায়োকার্ডিয়ান ইনফরকশন অথবা ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। হৃদরোগে আকস্মিক মৃত্যু, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যান, যার ৫৪ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী। এছাড়াও, তামাক ব্যবহার ও বায়ুদূষণ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়; দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর ২৪ শতাংশের পেছনে তামাক এবং ২৫ শতাংশের পেছনে বায়ুদূষণ দায়ী। সারা বিশ্বে সাডেন ডেথের মূল কারণ এটি। আন্তর্জাতিকভাবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১%। এর মধ্যে, তামাকের কারণে হৃদরোগে বছরে ১৯ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
বুকে ব্যথা, চোয়ালে ব্যথা, ঘাম হওয়া, মাথা ঝিম ঝিম করা, অবসন্নতার মতো উপসর্গ হতে পারে অথবা কোন উপসর্গ ছাড়াই আকস্মিক হার্ট বিকল হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। হার্ট এর অসুখ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন না, পথিমধ্যেই মারা যান। মানুষের আশীর্বাদে তামিম ইকবাল নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন। তাহলে এরকম দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? প্রথম কথা হচ্ছে বুকে ব্যথা হলে গ্যাসের ব্যথা মনে করে কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে হৃদরোগের সকল সাপোর্ট আছে এমন হাসপাতালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে হবে। ঢাকার বাইরের কিছু কিছু বিভাগীয় শহরে ক্যাথল্যাব ও কার্ডিয়াক সার্জারির সুবিধা আছে। বাংলাদেশে বেসরকারি হেলিকপ্টার যৌক্তিক মূল্যে অত্যন্ত সহজলভ্য। মনে রাখতে হবে হার্টের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি বুকে ব্যথা নিয়ে সঠিক সময়ে কোন কার্ডিয়াক হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন তাহলে বেঁচে যাবার সম্ভাবনা অনেকখানি।
তাহলে করণীয় কি? উত্তর একটাই নিয়মিত হেলথ চেকআপ। আপনার দেহে উপসর্গ থাকুক আর না থাকুক বছরে কমপক্ষে দুইবার হেলথ চেকআপ করতে হবে। এছাড়া সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস, ওজন কমানো, ধূমপান ও তামাক জাতীয় পণ্য বর্জনের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে এদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে মিডিয়া ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং হৃদরোগের সচেতনতামূলক হেলথ টিপস প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ অধিক সচেতম হবে বলে আমি মনে করি। সবশেষে প্রিয় তামিম ইকবালের সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরে আবার চার– ছক্কার মূর্ছনায় উদ্বেলিত হোক এদেশের কোটি ভক্তের হৃদয় – এই প্রত্যাশায় রইলাম।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতাল, মহাখালি, ঢাকা

সূর্যসন্তানরা কি পথ হারিয়েছেন?
- অদিতি করিম

বাংলাদেশে অভূতপূর্ব একটি জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন জুলাই বিপ্লবের সূর্যসন্তানরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কয়েকজন অকুতোভয় তরুণ অসম্ভবকে ‘সম্ভব’ করেছিলেন। এ দেশ নিয়ে অনেকেই আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ চিরস্থায়ীভাবে একটা স্বৈরাচারের কবলে থাকা দেশে পরিণত হবে এমন শঙ্কায় যারা নীরবে নিভৃতে হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন, তাদের জন্য সঞ্জীবনী হিসেবে দেখা দিয়েছিলেন জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধারা।
দেশবাসীর প্রত্যাশা তরুণরা তাঁদের স্বপ্নের মতো করে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবেন। তরুণরা বাংলাদেশ তাঁদের মতো করে সাজাবেন। তাঁরা সবাইকে পথ দেখাবেন। আমরা যদি বাংলাদেশের ইতিহাস দেখি তাহলে দেখব যে তরুণরাই বারবার এ দেশের ইতিহাসের বাঁক বদল করছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থান এবং চব্বিশের বিপ্লব সবকিছুই আসলে তরুণদের অবদান।
আমরা জুলাই বিপ্লবের পরপর দেখলাম যে তারুণ্য রাষ্ট্র সংস্কার এবং দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করল। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে তাদের অভিযাত্রা অব্যাহত রাখল। এ পদক্ষেপগুলো অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু হঠাৎ সংবিধানের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হলো কিছু তরুণ। বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি হলেন আলংকারিক প্রধান। তিনি রাষ্ট্রের প্রথম ব্যক্তি। তাকে একটি বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া অপসারণ করা যায় না। এ ধরনের অপসারণ একটি বড় ধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। তা ছাড়া ড. ইউনূসসহ উপদেষ্টাম লীকে শপথবাক্য পাঠ করিয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি। কাজেই রাষ্ট্রপতির বৈধতা স্বীকার করে নেওয়ার পর আবার তাকে অপসারণের চিন্তা একটি সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এ রকম পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ কয়েকটি একটি বড় দল দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করে। তারা তরুণদের শেষ পর্যন্ত বোঝাতে সক্ষম হয় যে এটি সাংবিধানিক পন্থা নয়। এরপর তরুণরা ফিরে আসে। এ নিয়ে কম জল ঘোলা হয়নি। এ ধরনের অতি আবেগ আর যা-ই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ইতিবাচক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় ধীরস্থিরভাবে। আইন এবং সংবিধান মেনে। সেখানে অতি উৎসাহ বা আবেগের জায়গা নেই। একটি বিপ্লব আবেগনির্ভর আকাক্সক্ষা। সেখানে জীবন বাজি রেখে সবকিছু করা যায়। কিন্তু যখন রাষ্ট্র পরিচালনার কাজটি সমঝোতা এবং বিধিবিধানের মধ্যে থেকে করতে হয়। জুলাই বিপ্লবের তরুণদের বোঝানোর দরকার ছিল। কিন্তু যারা তাদের অভিভাবক তারা এ বাস্তবতা তরুণদের ঠিকমতো বোঝাতে পারেননি। এরপর হঠাৎই ডিসেম্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র দেওয়ার দাবি উত্থাপিত হয়। তারা সমাজমাধ্যমে নাও অর নেভার বলে ঘোষণা দিয়ে ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে বলে জানালেন। সে সময় তাদের এ তৎপরতা আবার জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। আবার দেশে কী হতে যাচ্ছে, অস্থিতিশীলতা হচ্ছে কি না এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এ বিভ্রান্তির প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আবার বোঝানো হয়। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং যোগাযোগের পর শেষ পর্যন্ত জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র করা হয়নি। তারা সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর সরকার এখন এটিকে রাজনীতির মাঠে নিয়ে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকার এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সাংবিধানিক ধারার বাইরে গিয়ে দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র দেওয়ার পক্ষে নয়। ফলে রাজনৈতিকভাবেই জুলাই ঘোষণাপত্রের মৃত্যু ঘটেছে। ছাত্রদের সংগঠন এনসিপিও এ নিয়ে তেমন জোরালো দাবি এখন আর করে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। বিপ্লবের আকাক্সক্ষার ধারকদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল গঠন হতেই পারে। সেটি ইতিবাচক। আমরা তরুণদের নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এ রাজনৈতিক দল গঠনের পরপরই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। তাদের কিছু কিছু অপরিপক্বতা এবং ছেলেমানুষি নতুন রাজনৈতিক দল সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, তারা প্রথমে গণপরিষদ নির্বাচন চান। গণপরিষদ নির্বাচন কেন হবে, কীভাবে হবে জাতির কাছে এটা একটি বড় প্রশ্ন। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোড অব কন্ডাক্ট বা নিয়মতান্ত্রিক বিধিবিধান থাকে। একটি রাজনৈতিক দলের সবাই সব কথা বলতে পারেন না। একটি গণতন্ত্র এবং বিধিবদ্ধ নিয়মকানুনের অধীনেই রাজনৈতিক দলকে চলতে হয়। কিন্তু গত এক মাসে আমরা লক্ষ করেছি জাতীয় নাগরিক পার্টির অফুরন্ত সম্ভাবনার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের সবাই কথা বলছেন। যে-যার মতো ফ্রিস্টাইলে কথা বলছেন। একটি রাজনৈতিক দল এভাবে নেতৃত্বহীন অবস্থায় থাকতে পারে না। যে-যার মতো করে কথা বলতে পারে না। জাতীয় নাগরিক পার্টির দুজন অন্যতম নেতা সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলতে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা দলের কেন্দ্রীয় কমিটি বা শীর্ষ নেতার অনুমতির বাইরে গিয়ে কি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? এটি কি দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল নয়? এ ধরনের বৈঠকের পর তিনি দলীয় ফোরামে আলোচনা না করে ফেসবুকে পুরো ঘটনার বিবরণ দিলেন তাঁর মতো। যে বিবরণটি পুরোপুরি সত্য নয় বলে জানালেন তাঁরই সহকর্মী। যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির একজন নেতা। একটি দলের ভিতরে অন্যতম শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে এ রকম পাল্টাপাল্টি অবস্থান সমাজমাধ্যমে দলের ইমেজ বৃদ্ধি করবে, নাকি এটি দলকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে?
আমরা লক্ষ্য করলাম হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং সারজিসের ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে দলের ভিতরেই নানা রকম মতামত এবং ক্ষোভ। অর্থাৎ দলের ভিতরেই বিষয়টি নিয়ে এখন নেতিবাচক আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে হাসনাত আবদুল্লাহর এ অতিকথন এবং অতিবিপ্লব একদিকে যেমন রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির ম্যাচুরিটি বা পরিপক্বতা ক্ষুণ্ন করেছে, তেমন নেতা হিসেবে হাসনাত বা সারজিস কিংবা অন্যরা কতটুকু প্রস্তুত সে প্রশ্নটিও উঠেছে। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য থাকবে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসবে। ক্ষমতায় এলে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম অংশ হলো সশস্ত্র বাহিনী, দেশে সার্বভৌমত্বের প্রতীক সশস্ত্র বাহিনীকে সব বিতর্ক থেকে দূরে রাখাটা রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার। রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। সবকিছু নিয়ে দায়িত্বহীন মন্তব্য কোনো রাজনৈতিক নেতার কাজ না। কিন্তু এখানে হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস যেভাবে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তা দুর্ভাগ্যজনক। দ্বিতীয়ত. একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন জায়গায় যাবেন, বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন এবং সেসব অনানুষ্ঠানিক কথাগুলো কোনো সময় অযাচিতভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়। তাহলে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশন বা রাজনৈতিক দরকষাকষি সম্ভব হয় না। রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মেশেন এবং বিভিন্ন ধরনের দরকষাকষি করেন। এখন কেউ যদি দরকষাকষির হিসাবটা জনগণের কাছে প্রকাশ করে দেন, তাহলে কেউ কি তাদের বিশ্বাস করবে? সেনানিবাসের ঘটনা নিয়ে হাসনাত এবং সারজিস যে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন তা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি করবে। এর ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তাদের সঙ্গে নিশ্চিন্তে খোলা মনে কথা বলতে রাজি হবেন না। এটি জাতীয় নাগরিক পার্টিরও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে একটি বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করবে। তৃতীয়ত. একটি রাজনৈতিক দলকে সবার সঙ্গে সহাবস্থান এবং সমতা নিয়ে চলতে হয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি কোনো বিপ্লবী সংগঠন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল। যে দলটি সবে কাজ শুরু করেছে। কাজেই এ রাজনৈতিক দলকে সবার আস্থা অর্জন করতে হবে। সবার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। তারা যেভাবে সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিছেন, যেভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন তা একটি বাজে দৃষ্টান্ত। এর ফলে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা অনাস্থা এবং দূরত্ব তৈরি হবে। এটি বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য কখনোই ইতিবাচক নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো এ ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা এখন পর্যন্ত মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দেশ পরিচালনার জন্য কতটুকু সক্ষম এবং যোগ্য সে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছেন। সাধারণ মানুষ মনে করে তারা জুলাই বিপ্লব করেছেন এজন্য তাদের স্যালুট করতে হবে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের বিচক্ষণতা দরকার তাদের তা আসতে অনেক বাকি। আমার মনে হয় জুলাই বিপ্লবের পর সূর্যসন্তানরা কেউ কেউ দিশাহারা হয়ে যাচ্ছেন। এখনো সময় আছে তাদের বুঝতে হবে তাদের সামনে দীর্ঘ পথ রয়েছে। তাদের অনেক শিখতে হবে, জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং তার পরে তারা জাতীয় রাজনীতিতে একটা অবদান রাখতে পারবেন। নইলে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে জুলাই বিপ্লবের সূর্যসন্তানদের স্বপ্ন।
অদিতি করিম : নাট্যকার ও কলাম লেখক
Email : auditekarim@gmail.com

একাত্তর থেকে চব্বিশ : সমরে-সগর্বে শহীদ জিয়া
- অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান

সদ্যপ্রয়াত কবি হেলাল হাফিজ তাঁর ‘একটি পতাকা পেলে’ কবিতায় বলেছেন, -‘কথা ছিল একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখব না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা। কথা ছিল একটি পতাকা পেলে ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস, ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন, -পেয়েছি, পেয়েছি’। এই কবিতায় খুবই সহজ করে হেলাল হাফিজ স্বাধীনতার মূল যে চেতনা তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর মতে স্বাধীনতা সাধারণের মধ্যে এক অসামান্য প্রাপ্তি।
২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। জাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন।
বলা হয়, প্রকৃতি তার শূন্যস্থান পূরণ করে নেয়। সেটি সময় কিংবা মানুষ দিয়ে। মার্চ ২৫ কালরাতেই মুজিবের শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। তাঁর নাম জিয়াউর রহমান। এদিন রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন তিনি। এর আগের দিন চট্টগ্রাম শহরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। অস্ত্রবোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে পৌঁছতে না পারে, সেজন্য রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হয় বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই ব্যারিকেড সরানোর কাজ। রাত ১১টায় চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া আকস্মিকভাবে সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ পাঠান এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য।
এরপর মেজর জিয়া অষ্টম ব্যাটালিয়নের অফিসার, জেসিও জওয়ানদের জড়ো করেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে, তখন রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিট। তিনি ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ডাক দিলেন। উচ্চারণ করলেন, ‘ডব জবাড়ষঃ’। উপস্থিত সহযোদ্ধাদের সামনে যুদ্ধের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন তিনি।
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যান মেজর জিয়া। বেতারকর্মীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। কিন্তু কী বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। এদিকে বেতারকর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন, আর পনেরো মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ভাষণ দেবেন। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তিনি তৈরি করেন তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। সেটা তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে পাঠ করেন। ইথারে ছড়িয়ে পড়ে এই ঘোষণাটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বেতারে ধরা পড়ে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। বিশ্ব ও দেশবাসী জেনে যায় বাংলাদেশ নামক এক নতুন দেশের কথা। এই ঘোষণাটি কয়েক দিন ধরে কিছুক্ষণ পরপর প্রচারিত হতে থাকে।
মূলত এটি ছিল মেজর জিয়ার বুদ্ধিদীপ্ত সময়োপযোগী সাহসী সিদ্ধান্ত। সেদিন তিনি এভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে সাধারণ মানুষ প্রতিরোধযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না। তিনি যদি সেদিন ‘উই রিভোল্ট’ বলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্রোহের ডাক না দিতেন তা হলে প্রেক্ষাপট ভিন্নও হতে পারত। অথচ রাজনৈতিক কারণে এখন অনেকেই তাঁর সেই সাহসী সিদ্ধান্ত আর স্বাধীনতার ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত বোধ করেন।
১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে। লাল-সবুজের পতাকায় শোভিত হয় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখন্ড। তারপর দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান আবার ফিরে যান সামরিক ব্যারাকে।
এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য তা হলো, যুদ্ধে যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত না হতো তাহলে নিশ্চিত ফাঁসিতে ঝুলতে হতো জিয়াউর রহমানকে। যাঁর ডাকে সাত কোটি জনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এটিই হতো তাঁর ফাঁসির জন্য একমাত্র কারণ। জিয়াউর রহমান বুঝেশুনেই সেদিন এই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধার জীবনে এর চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর কিছুই হতে পারে না। রাজনীতি ও ইতিহাস গবেষকরা বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর মুহূর্তে মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক এই আত্মপ্রকাশই একটি স্বাধীন দেশের জন্য প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। সেদিন তিনি যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার স্বীকৃতি রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর গোপন দলিলেও। তিনি যেভাবে যে ভাষায় বক্তব্যটি দিয়েছিলেন সিআইএ সেভাবেই সেটি সংরক্ষণ করে। পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ভারতের রাষ্ট্রপতি মোরারজি দেশাইও জিয়াউর রহমানকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া তাঁর এই কীর্তির কথা নথিবদ্ধ রয়েছে ১৯৮২ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের ১৫ খন্ডেও। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণা সিআইএর মতো লন্ডনের গার্ডিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যম লিপিবদ্ধ করে রাখে। এমনকি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির এক সেমিনারে বক্তৃতার এক স্থানে বলেন, ‘শেখ মুজিব এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান, যার সুযোগ এখনো আছে।’ ‘ইন্ডিয়া সিকস’ (ওহফরধ ঝববশং) নামক বইতে ইন্দিরা গান্ধীর এ বক্তব্যটি সংকলিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ভারত সফরকালে দিল্লিতে জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি জিয়াকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আপনার’। যুদ্ধদিনের সফল সমাপ্তির পর দেশের ক্ষমতার মসনদে বসেন শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ৯ মাস দেশের বাইরে থেকে তিনি যুদ্ধদিনের বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেননি। তাই তো ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে তিনি অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েন। খুব দ্রুতই তার চারপাশে সুবিধাবাদী আর অসৎ লোকে ছেয়ে যায়। রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি ছোট্ট দেশকে দুর্নীতিবাজরা অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরে। শুরু হয় লুটপাটের মহোৎসব। অর্থব্যবস্থা মুখথুবড়ে পড়ে। চারদিকে শুরু হয় শোষণ আর নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পাশাপাশি কেড়ে নেওয়া হয় মানুষের রাজনৈতিক অধিকারও। যে শোষণ-নির্যাতন আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রাম সেটি যেন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় শেখ মুজিবুর রহমানের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ রাতারাতি পরিচিতি পায় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এখানেও ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ঘটনার পথপরিক্রমায় তিনি এ দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। এর পরের ইতিহাস একটি বৈপ্লবিক বাংলাদেশের। গণতন্ত্র আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার পর তিনি দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে গতিশীল করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর সবুজবিপ্লব দেশের কোটি কোটি অভুক্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। ফিরে সেই মাঠ ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুর সোনালি সময়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়ার পরিচিতি গড়ে ওঠে একজন ‘ভিশনারি লিডার’ হিসেবে। একটি উন্নত অগ্রগামী বাংলাদেশের সত্যিকারের স্বপ্নদ্রষ্টা তিনি।
নিবন্ধটি শেষ করতে আবারও আসতে হলো কবি হেলাল হাফিজের পতাকার কাছে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আমরা একটি স্বাধীন ভূখন্ড, একটি লাল-সবুজের পতাকা অর্জন করলাম। সেই থেকে আজ ২০২৫ সাল। মাঝখানে কেটে গেছে ৫৫ বছর। দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশ তার গন্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
সর্বশেষ কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেনের পরম্পরায় হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেসের সেই পাওয়ার আনন্দটুকুও যেন হারিয়ে যায়। গুম-খুন আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ আখ্যান রচনা করেন শেখ মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা। অবশেষে নাগরিকের মর্যাদা হারিয়ে প্রজা বনে যাওয়া এ দেশের কোটি কোটি মানুষের ঘুম ভাঙে চব্বিশের মধ্য জুলাইয়ে। নিপীড়ক রাষ্ট্রে গড়ে ওঠে প্রতিরোধের অপ্রতিরোধ্য দেয়াল। জিতে যায় জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। হেরে যায় শোষক শ্রেণি। দেশ ছেড়ে আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা পালিয়ে যায়। এই পালিয়ে যাওয়া মানে পরাজয়। একাত্তর ও চব্বিশের পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর প্রতি এ দেশের সাধারণ মানুষের সীমাহীন ঘৃণা থাকবেই।
♦ লেখক : অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দৃষ্টিপাত
এবার কি সত্যিই বদলাবে পরিস্থিতি?

আনিসুর বুলবুল

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবার শক্ত হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব সচিব, বিভাগীয় প্রধান, মহাপরিচালক, নির্বাহী পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে এই নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্তের পর ২০ মার্চ এই নির্দেশনা জারি করা হয়। চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কে জনমনে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ধারণা রয়েছে এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্নীতি একটি দেশের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু নির্দেশনা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু তাই নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। যদি নির্দেশনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর কোনো মূল্য থাকবে না। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা যেন কোনোভাবেই পার পেয়ে না যায়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু বরখাস্ত করাই যথেষ্ট নয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নিতে হবে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা নিলেই কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা যাবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। তবে শুধু সরকারের একার পক্ষে এই লড়াই জয় করা সম্ভব নয়। এই লড়াইয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরব হতে হবে, তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে। শুধু সরকারি নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে আমাদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সরকারের এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশে দুর্নীতির মাত্রা কমবে, সরকারি সেবার মান বাড়বে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার এই সংকল্পে আমরা সবাই একযোগে কাজ করব—এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।