গত মঙ্গলবার ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া ক্লাবে ‘২০০৯ সালে পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদাতবরণকারী শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান যেসব কথা বলেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি, মারামারি ও কাটাকাটি করলে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। এই দেশ আমাদের সবার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি।
সবাইকে সংগঠিত থাকতে হবে
- সেনাপ্রধানের সতর্কবার্তা

তাঁর এই বলিষ্ঠ উচ্চারণ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। গত আগস্টে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা।
রাজনীতিতে অর্থ আর পেশিশক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবে বাংলাদেশ এক চরম দুঃসময় পার করে এসেছে। রাজনীতিতে আদর্শ, জনকল্যাণ, আত্মত্যাগ ও নৈতিকতা ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত সাড়ে পাঁচ দশকে সময় যত গড়িয়েছে, ততই যেন রাজনীতি আদর্শ থেকে দূরে সরে গেছে। প্রধান দলগুলোতে গণতন্ত্রচর্চাহীনতার সুযোগে সুযোগসন্ধানীরা ঢুকে পড়ে। স্বজনপ্রীতি আর প্রশ্রয়নির্ভর রাজনীতিতে ছিল না জবাবদিহির বালাই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিষয়টি স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল, সেটি হচ্ছে পরস্পরের প্রতি বিষোদগার। সেনাপ্রধান তাঁর বক্তব্যে সেই বিষয়টির প্রতিও সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তা-চেতনার বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই দেশ ও জাতির দিকে খেয়াল করে যেন এক থাকতে পারি। কেবল এক থাকলেই এ দেশ উন্নত হবে, সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরো সমস্যার মধ্যে পড়ে যাব। ওই দিকে আমরা যেতে চাই না।’
সেনাপ্রধানের এই সতর্কবার্তা প্রণিধানযোগ্য। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে হাত দেয়। এই সংস্কারপ্রক্রিয়া নিয়ে সেনাপ্রধান বলেছেন, নির্বাচনের আগে যেসব সংস্কার করা প্রয়োজন, অবশ্যই সরকার সেদিকে খেয়াল করবে।
রাওয়া ক্লাবে দেওয়া সেনাপ্রধানের বক্তব্যের প্রতিটি কথা দেশের সচেতন মানুষকে নাড়া দিয়েছে। তাঁর পরামর্শ এই সময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।
সম্পর্কিত খবর

আরো সহজলভ্য করা হোক
- চীনে বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্যসেবা

বলতে দ্বিধা নেই, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অনেকেরই আস্থা কম। ফলে প্রতিবছর অনেক রোগী ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকায়ও চিকিৎসা নিতে যায়। সংখ্যাটি ভারতেই সর্বাধিক। কারণ সহজে ও কম খরচে সেখানে চিকিৎসা করানো যেত।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কুনমিংয়ে যে চারটি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে সেখানকার সেরা তিনটি হাসপাতাল। এগুলো হলো—দ্য ফার্স্ট পিপলস হসপিটাল অব ইউনান প্রভিন্স, দ্য ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হসপিটাল অব কুনমিং মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি এবং ফাওয়াই ইউনান হসপিটাল, চায়নিজ একাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস।
চীনের এই সহযোগিতা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন নাগরিক অবশ্যই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখে।
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়ন করতে হবে, যাতে ধনী-দরিদ্র সবাই উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে পারে। এর আগ পর্যন্ত চীনের এই সেবা আরো সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আমাদের সতর্ক হতে হবে
- মায়ানমারে ভয়াবহ ভূমিকম্প

মায়ানমারে গত শুক্রবার ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৭। গতকাল বুধবার পর্যন্ত মায়ানমারে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার। আহতের সংখ্যা আরো বেশি।
ভূমিকম্পের পরপরই চীন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের উদ্ধারকর্মীরা মায়ানমারে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছেন। নানাভাবে মায়ানমারকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
নিকট অতীতে বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু বড় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ২০২৩ সালে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, জাপানে নিকট ভবিষ্যতে অতি বড় ধরনের একটি ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে, যাতে মারা যেতে পারে প্রায় তিন লাখ মানুষ।
ভূমিকম্পের কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়ার সক্ষমতা এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। তাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধানতম উপায় হচ্ছে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ভবন তৈরি করা। বাস্তবে দেখা যায়, ভূমিকম্প ছাড়াই বাংলাদেশে অনেক বহুতল ভবন হেলে বা ধসে পড়ে। অথচ জাতিসংঘের এক জরিপের ভিত্তিতে আমাদের রাজধানী ঢাকাকে রাখা হয়েছে ভূমিকম্পের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর তালিকায়। বিজ্ঞানীদের মতে, ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে এখানকার ৬০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধসে পড়তে পারে। উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। মাথার ওপরে যেভাবে বিদ্যুতের তারের জঞ্জাল, ঘরবাড়িতে গ্যাসের পাইপলাইন ছড়িয়ে রয়েছে, তাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হতে পারে। তাই এখানে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও অনেক বেশি।
আমাদের ভবিষ্যতের কথা আমাদেরই ভাবতে হবে। এ কারণে নতুন ভবন তৈরির ক্ষেত্রে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। পুরনো যেসব ভবন সংস্কারের মাধ্যমে ভূমিকম্প প্রতিরোধী করা সম্ভব, সেগুলোকে দ্রুত সংস্কার করতে হবে। বেশি পুরনো ও অনিরাপদ ভবনগুলো ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতার উন্নয়ন করতে হবে।

নতুন উচ্চতায় দুই দেশের সম্পর্ক
- প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর

বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার চীন। পদ্মা সেতু, পায়রা বিদ্যুৎ হাব, রেলসংযোগসহ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে চীনের সহায়তায়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সেই সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন জলবিদ্যুৎ, পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ হ্রাস, নদী খনন, পানিসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে।
এশিয়ার বোয়াও ফোরামের মহাসচিবের আমন্ত্রণে অধ্যাপক ইউনূস গত ২৬ ও ২৭ মার্চ চীনের হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন।
শুক্রবার বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেনশিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহবান জানান।
আমরা আশা করি, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরো জোরদার হবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীন আগামী দিনগুলোতে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হোক
- পবিত্র ঈদুল ফিতর

দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম এই ঈদুল ফিতর। প্রতিবছর ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবাই শরিক হয় এই আনন্দ উৎসবে। যে যার সাধ্যমতো এই দিনটি আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে থাকে।
দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে প্রত্যেক মুসলমান নৈতিক, আত্মিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধির শিক্ষায় পরিশীলিত হয়। তাকওয়ার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন জীবন শুরুর উদ্দীপনা পায়।
ঈদুল ফিতর একাধারে আনন্দোৎসব ও ইবাদত। এই আনন্দ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা প্রাপ্তির, জাহান্নাম থেকে মুক্তির। এই আনন্দ সিয়াম-কিয়ামের শুকরিয়া ও কৃতজ্ঞতার। এই আনন্দে নেই কোনো পাপ-পঙ্কিলতা। এই আনন্দে কেবলই সওয়াব ও পূর্ণতা। ধীরে ধীরে এই আনন্দ সবার মাঝে সঞ্চারিত হতে থাকে। এই দিনে হতদরিদ্র, এতিম, দুস্থ, নিঃস্ব ও ছিন্নমূল মানুষের মুখেও হাসি ফোটে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীরাও এ সময় ব্যস্ত হয়ে পড়েন সমান তালে। ঈদ উপলক্ষে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা তাঁরাও ভোগ করেন। এভাবেই সর্বজনীন হয়ে ওঠে ঈদ।
ঈদ মুসলমানদের জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, সম্প্রীতি-সৌভ্রাতৃত্ব শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষও। এই উৎসবের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসলমান একে অপরের আরো কাছাকাছি আসে। শুধু মুসলমান নয়, অন্যান্য ধর্মের মানুষের সঙ্গেও আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। পবিত্র রমজান আমাদের চিত্তশুদ্ধির যে শিক্ষা দিয়েছে, ঈদুল ফিতর হচ্ছে সেই শিক্ষা কাজে লাগানোর দিন। আজ একটি দিনের জন্য হলেও ধনী-গরিব সবাই দাঁড়াবে এক কাতারে। ভুলে যেতে হবে সব বৈষম্য, সব ভেদাভেদ। হিংসা, বিদ্বেষ ও হানাহানি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে। শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে সারা বিশ্বে মুসলমানদের মর্যাদা ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। ইসলাম যে প্রকৃত অর্থেই শান্তির ধর্ম, সেটি প্রমাণ করতে হবে।
ঈদের সামাজিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। রোজা ও ঈদের সময় দরিদ্রদের প্রতি সমবেদনা ও সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায়। বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলে ঈদ। ঈদ মানে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি। আমাদের ঘরে ঘরে ফিরে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি। সুদৃঢ় হোক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য। সবার ঘরে পৌঁছে যাক ঈদের সওগাত। আমাদের অসংখ্য পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা, বিপণনকর্মী, শুভানুধ্যায়ীসহ সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।