বদলে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা!

  • ► সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরাই হবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্নভাবে সহায়তাকারীদের ‘যুদ্ধ সহায়ক’ করার প্রস্তাব
  • ► মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন বয়স ১২ বছর ৬ মাসের বদলে ১৩
  • ► বয়সের ভিত্তি ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বরের বদলে ২৬ মার্চ
খায়রুল কবির চৌধুরী
খায়রুল কবির চৌধুরী
শেয়ার
বদলে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা!

মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫৩ বছর পর আরেকবার পরিবর্তন আসতে পারে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়। প্রস্তাবিত নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারীরাই হবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিরা, মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী, শিল্পীসমাজসহ যারা মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন তাদের যুদ্ধ সহায়ক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সর্বনিম্ন বয়সেও পরিবর্তন আসতে পারে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন বয়স হতে পারে ১৩ বছর।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ সালের জামুকা আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ২০ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজমকে চেয়ারম্যান করে পরবর্তী তিন বছরের জন্য ১১ সদস্যবিশিষ্ট জামুকা কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুনর্গঠনের পর গত ২৪ নভেম্বর জামুকার ৯১তম সভা এবং ২ ডিসেম্বরের মুলতবি সভায় এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পার হলেও এখনো মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল ও বিতর্কমুক্ত তালিকা হয়নি। একাধিকবার বদলানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞাও। এ অবস্থাকে জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অসম্মানজনক বলছেন তাঁরা।

সূত্র বলছে, জামুকা আইন সংস্কার ও বিধিমালা প্রণয়ন করে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নতুন করে সংস্কার করা হবে।

জামুকার ৯১তম সভার আলোচ্যসূচিতে জামুকার আইন বদলে অধ্যাদেশ করার বিষয়টিও ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবর্তিত সংজ্ঞাসহ একটি সংশোধিত খসড়াও তৈরি করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। সংশোধিত খসড়া ও সংজ্ঞা নিয়ে আরো যাচাই-বাছাই ও বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে এটি উপদেষ্টা পরিষদে যাবে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম কালের কণ্ঠকে বলেন, জামুকার আইনে অ্যাবসুলেটলি কিছু দলীয় ন্যারেটিভ আছে।

এটা নৈর্ব্যক্তিক একটা অবস্থান থেকে হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। রণাঙ্গনে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন যারা, তাঁরা চান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খ্যাত হতে। আর মুক্তিযুদ্ধে নানান সহায়ক শক্তি ছিল। ওখানে (মুক্তিযোদ্ধার বিদ্যমান সংজ্ঞায়) ঢালাওভাবে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় নিয়ে আসা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনগুলোর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। এটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সে জন্য আমরা যারা যেভাবে ভূমিকা রেখেছেন ওইভাবেই উল্লেখ করতে চাই। তাদের ভাতা নিয়েও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, আমরা রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছি, আমরা সেই মর্যাদা চাচ্ছি। এই পরিবর্তনগুলো হবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তাব দেব। পরে উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নেবে।

জামুকা আইন সংশোধনের পর অধ্যাদেশ করে এর জন্য বিধিও প্রস্তুত করা হবে জানিয়ে উপদেষ্টা আরো বলেন, জামুকা আইন হয়েছে, আইন প্রয়োগের বিধি হয়নি। বিধি না হওয়ার ফলে জামুকায় তুঘলকি কাজগুলো হয়েছে। বিধি থাকলে তো কোনো না কোনোভাবে কেউ কারো প্রতি দায়ী থাকত। জামুকা কি করে? তারা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করে সরকারকে সুপারিশ করে। সরকার সুপারিশকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট করবে ও ভাতা দেবে। তাহলে মন্ত্রণালয়ের কাজ কী? তাদের কোনো কাজ নেই গেজেট করা ছাড়া। ফলে বিধিবদ্ধ থাকলে এই নৈরাজ্য হতে পারত না।

 

বিদ্যমান সংজ্ঞার সঙ্গে প্রস্তাবিত সংজ্ঞার তুলনা

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠনের সময় করা সেই সংজ্ঞায় মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদেরই মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়েছে। পরে ২০১৬ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক গেজেটের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন যুগোপযোগী করার পর জাতীয় সংসদে পাস করা হয়।

২০২২ সালে হওয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিল (জামুকা) আইনেও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়। সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে গ্রামেগঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে দখলদার ও হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে তারা বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।

সংজ্ঞায় রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের পাশাপাশি বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী বাংলাদেশি নাগরিক, মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী-দূত, মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) বা এমপিএ (মেম্বার অব প্রভিনশিয়াল অ্যাসেম্বলি) যারা পরে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে গণ্য হয়েছেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা গণ্য হবেন।

এ ছাড়া দখলদার ও হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিতা সব নারী (বীরাঙ্গনা), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলা-কুশলী, দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় এবং মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া মেডিক্যাল টিমের ডাক্তার, নার্স ও সহকারীদেরও মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়েছে।

এদিকে সূত্র মতে, প্রস্তাবিত খসড়ার সংজ্ঞায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখা অন্যদের যুদ্ধ-সহায়ক নাম দিয়ে শ্রেণিভুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধার বর্তমান সংজ্ঞায় থাকা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণায় সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়টিও বাদ যেতে পারে নতুন সংজ্ঞায়।

 

 

সাড়ে ১২ নয়, ১৩ হতে পারে মুক্তিযোদ্ধার বয়স

বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন বয়স ১২ বছর ছয় মাস। ২০১৮ সালের এক পরিপত্রের মাধ্যমে এই বয়স নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর যেসব মুক্তিযোদ্ধার বয়স ন্যূনতম ১২ বছর ছয় মাস, ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে নতুন সংজ্ঞায় মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন বয়স ১৩ করা হতে পারে এবং বয়সের ভিত্তি ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বরের বদলে ২৬ মার্চ হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নির্যাতিতা নারী বা বীরাঙ্গনার ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বয়সসীমা প্রযোজ্য হবে না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংজ্ঞা নির্ধারণ

প্রস্তাবিত খসড়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দদ্বয়কেও সংঘায়িত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত বাংলাদেশের জনগণের সমতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতের যে চেতনা তাই হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

 

যা বলছেন মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্টজনরা

স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও তালিকা চূড়ান্ত না করতে পারায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্টজনরা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে মুক্তিযুদ্ধের ৫৩ বছর পরও একটা পরিপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়নি। একইভাবে এটাও দুর্ভাগ্যজনক যে ৫৩ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই তালিকা পরিপূর্ণ করার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রচেষ্টা নিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, মুক্তিযোদ্ধা যারা বেঁচে আছেন সবাই সত্তরোর্ধ্ব, বয়োবৃদ্ধ। এর আগেও বিভিন্ন সরকারের আমলে যাচাই-বাছাই হয়েছে, এতে করে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। আমি আশা করব, নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের নামে মুক্তিযোদ্ধারা যেন আবারও হয়রানির শিকার না হন তা নিশ্চিত করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জেড আই খান পান্না বলেন, আমি আইনটা দেখে পরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাই, এখনই নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, রাজাকারসহ স্বাধীনতাবিরোধীরা ছাড়া সবাই মুক্তিযোদ্ধা। অস্ত্র ছিল না। তা না হলে সাড়ে চার কোটি মানুষই হাতে অস্ত্র তুলে নিত। যুদ্ধ সহায়করাও মুক্তিযোদ্ধা।

 

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

ছুটির ঘোষণা

শেয়ার
ছুটির ঘোষণা

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৩০-৩১ মার্চ ও ১ এপ্রিল কালের কণ্ঠ বন্ধ থাকবে। তাই ৩১ মার্চ এবং ১-২ এপ্রিল পত্রিকা প্রকাশিত হবে না। পবিত্র ঈদুল ফিতর ১ এপ্রিল হলে ৩ এপ্রিলও পত্রিকা প্রকাশিত হবে না। তবে ঈদের ছুটিতে কালের কণ্ঠ অনলাইন চালু থাকবে।

সম্পাদক

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

শ্রমসচিবের গাড়ির সামনে টিএনজেড গ্রুপের শ্রমিক-কর্মচারীরা

শেয়ার
শ্রমসচিবের গাড়ির সামনে টিএনজেড গ্রুপের শ্রমিক-কর্মচারীরা

বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে টিএনজেড গ্রুপের শ্রমিক-কর্মচারীরা গতকাল বিজয়নগরে শ্রমসচিবের গাড়ির সামনে বসে পড়েন।ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরের দেশে জরুরি অবস্থা জারির উসকানি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
কালের কণ্ঠ ডেস্ক
শেয়ার
ব্যারিস্টার তানিয়া আমীরের দেশে জরুরি অবস্থা জারির উসকানি

দেশে জরুরি অবস্থা জারির উসকানি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই উসকানি দেন।

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের মনে কী আছে (হোয়াটস অন বাংলাদেশস আর্মি চিফস মাইন্ড?) শিরোনামে ইন্ডিয়া টুডেতে একটি সংবাদ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। সেখানে মূলত সেনাপ্রধান বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বেন কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা বিবিসি ও রয়টার্সের সাবেক সাংবাদিক সুবির ভৌমিকের লেখায় বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একজন রক্ষণশীল ও পেশাদার কর্মকর্তা, যিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন। তাঁর সহকর্মীরা জানান, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশে সামরিক শাসন কার্যকর নয়। ইতিহাস, বিশেষ করে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কঠোর দমন-পীড়ন না চালাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতিসংঘ সতর্ক করেছিল এবং তা কার্যকর হয়েছিল।

তবে ওয়াকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি গুলি চালানোর অনুমতি দেননি এবং শেখ হাসিনা ও তাঁর উপদেষ্টাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন।

সম্প্রতি কিছু ব্লগার ও অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা অভিযোগ করেছেন, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ভারতের প্রতি অনুগত এবং তিনি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছেন। তবে সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠরা বলেন, তিনি কোনো গোষ্ঠীর অনুগত নন, বরং তিনি পেশাদার ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অনুকরণ করে রাজনীতির বাইরে থাকতে চান।

এদিকে সেনাপ্রধান চাইলে দেশে জরুরি অবস্থা জারিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সমর্থন দিতে পারেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিয়া আমীর।

আওয়ামী লীগপন্থী এই আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন; আর এ ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতে পারেন। এর ফলে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে দ্রুত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবেন। সেনাবাহিনী সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন করতে পারবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারবে।

তবে তানিয়া আমীরের এমন মন্তব্য উড়িয়ে দিয়েছেন সেনা কর্মকর্তারা।

এক সেনা কর্মকর্তা ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, তিনি (সেনাপ্রধান) সেনা ও বাইরের সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চান। তিনি সেনা কর্মকর্তা ও অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা না করে তাড়াহুড়া করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। কারণ তিনি একটি ঐকমত্য চান।

অন্যদিকে এক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল, যাঁর অধীনে সেনাপ্রধান আগে চাকরি করেছেন, তিনি বলেন, যদি মনে হয় তাঁকে (সেনাপ্রধান) সরিয়ে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তাহলে তিনি কঠোর ভূমিকা পালন করবেন।

ইন্ডিয়া টুডের সংবাদ বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান সম্প্রতি আফ্রিকা সফর শেষে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করবেন না, যা আমি করতে চাই না। এতে বোঝা যায়, তিনি কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হতে পারেন, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। তাঁর বাবা ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম কিনেছিলেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের জন্য।

মন্তব্য

রমজানে সহনীয় পণ্যের দামে স্বস্তিতে রোজা পার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার
রমজানে সহনীয় পণ্যের দামে স্বস্তিতে রোজা পার

প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা বাজার অস্থিতিশীল করে তোলেন। রমজান এলেই মাছ-মাংস, শাক-সবজি থেকে শুরু করে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে বাড়তে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়। বিশেষ করে রোজার ভোগ্যপণ্য হিসেবে পরিচিত ছোলা, খেজুর, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বছরের পর বছর ধরে এমন চিত্রই দেখে আসছে দেশবাসী।

তবে এবার ভিন্ন চিত্র। এবার রোজার ভোগ্যপণ্যের বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল। ভোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার রজমানে পণ্যের দাম সবচেয়ে কম। বেশির ভাগ খাদ্যপণ্যই ক্রেতাসাধারণের হাতের নাগালে রয়েছে।

রমজান মাসে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি এবং পণ্যের দাম কমানোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে এবার রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে অসাধু ব্যবসায়ীদের যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল তা এখন ভেঙে গেছে। এ ছাড়া এ বছর রমজান সামনে রেখে ট্যাক্স-ভ্যাট কমার পাশাপাশি পণ্য আমদানি বেড়েছে, যার সুফল মিলছে বাজারে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি বাড়ানো ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোজ্যতেল, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, আলু, খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে আমদানিতে উৎসাহ বাড়ায় এবার ব্যাপক হারে ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছেন আমদানিকারকরা। এতে গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমে বিক্রি হয়েছে ছোলা, পেঁয়াজ, চিনি, দেশি রসুন, আলু ও আদাসহ কয়েকটি পণ্য। সবজি ও মুরগির বাজারেও কিছুটা স্বস্তি ছিল। 

এবার রমজানে পেঁয়াজ ও আলু গত বছরের তুলনায় অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া বেশির সবজি গত বছরের তুলনায় অনেকটাই কম দামে বিক্রি হয়েছে। রমজানে ইফতারসামগ্রীর বাজারেও তেমন বাড়াবাড়ি নেই। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত তদারকি জোরদার করায় সবজির বাজার সিন্ডিকেট কাঁচা মরিচ ও বেগুনের দাম বাড়াতে পারেনি।

গত রমজানে রাজধানীর খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ কেজি ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। এবার বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে। আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়, যা গত বছর রমজানে বিক্রি হয় ৪০ টাকা কেজি। পাকা টমেটো কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছর বিক্রি হয় মানভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। এখন ঈদ ঘিরে মুরগির দাম বাড়লেও রোজার শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত অনেকটাই সহনীয় দরেই এবার মুরগি বিক্রি হয়। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। ঈদ উপলক্ষে এখন মুরগির দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় ব্রয়লার মুরগি কেজি ২১০ থেকে ২২০ টাকা এবং সোনালি মুরগি কেজি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর রোজায় ব্রয়লার মুরগি কেজি ছিল ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা, রোজার আগে আগে যা ২৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। দাম কমে চিনি কেজি ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, গত বছরের রমজানের তুলনায় এ বছর বেশির ভাগ পণ্যের দাম কমেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় রয়েছে গম, ডাল, মুরগি, ডিম, মাছ, সয়াবিন, পামঅয়েল, চিনি, লবণ, আলু, টমেটো, মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও হলুদ।

বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় এবার রমজানে বাজারে পণ্যের দাম সহনীয়।

এদিকে এবার রোজায় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকারের একাধিক সংস্থা মাঠে আছে। সংস্থাগুলো হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মনিটরিং টিম। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিও করা হচ্ছে।

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ