নজর অর্থ দৃষ্টি। আর বদনজর মানে হলো কুদৃষ্টি বা মন্দ চাহনি। হিংসার নিকৃষ্ট স্বভাব-মিশ্রিত বিষাক্ত দৃষ্টিপাতের প্রভাবে ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে যে ক্ষতি দেখা যায় তাকে বদনজর বলা হয়। বদনজর দুইভাবে হয়—মানুষের বদনজর ও জিনের বদনজর।
নজর অর্থ দৃষ্টি। আর বদনজর মানে হলো কুদৃষ্টি বা মন্দ চাহনি। হিংসার নিকৃষ্ট স্বভাব-মিশ্রিত বিষাক্ত দৃষ্টিপাতের প্রভাবে ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে যে ক্ষতি দেখা যায় তাকে বদনজর বলা হয়। বদনজর দুইভাবে হয়—মানুষের বদনজর ও জিনের বদনজর।
বদনজরের প্রভাব বেশি পড়ে ছোট বাচ্চাদের ওপর।
বদনজরের লক্ষণ
বদনজরে আক্রান্ত ছোট বাচ্চাদের বেশ কিছু লক্ষণ ফুটে ওঠে। যেমন—শিশুরা মায়ের বুকের দুধ বা খাবার খেতে না চাওয়া, অনর্থক ভয় পাওয়া, অস্বাভাবিক কান্নাকাটি করা ইত্যাদি।
বদনজর থেকে বাঁচার আমল
বদনজরের রুকইয়া বা কোরআনি চিকিৎসা প্রধানত দুই পদ্ধতিতে করা যায়। এক. কোরআনের আয়াত বা হাদিসে বর্ণিত দোয়া লিখে গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমন্ত অবস্থায় ঘাবড়িয়ে উঠে, সে যেন ‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিং গদাবিহি ওয়া শাররি ইবাদিহি ওয়া মিন হামাযাতিশ শায়াতিনি ওয়া আই ইয়াহদরুন’ এই দোয়া পড়ে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর তাঁর উপযুক্ত সন্তানদের তা শিক্ষা দিতেন এবং ছোটদের গলায় তা লিখে লটকিয়ে দিতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৯৩; তিরমিজি, হাদিস : ৩৫২৮)
দুই. বিশেষ দোয়া বা সুরা পাঠ করে ঝাড়ফুঁক করা।
এক. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার এই দোয়া পাঠ করবে, কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। দোয়াটি এই—‘বিসমিল্লা হিল্লাজি লা-ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউং ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামাই ওয়াহুয়াস সামিউল আলীম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৮৮)
দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার করে এই দোয়া পাঠ করবে সে প্রত্যেক সৃষ্টবস্তুর অনিষ্ঠ থেকে রক্ষা পাবে, বিশেষ করে সাপ-বিচ্ছুর অনিষ্ট থেকে রেহাই পাবে। দোয়াটি হলো—‘আউযু বিকালিমা তিল্লাহিত্তাম্মাতি মিং শাররি মা খলাক।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৩২)
তিন. রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে এই দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন আর বলতেন তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.) এই দোয়ার মাধ্যমে (তাঁর সন্তানদের) ঝাড়ফুঁক করতেন। দোয়াটি হলো—‘আউযু বিকালিমা-তিল্লাহিত্তাম্মাতি মিং কুল্লি শাইতানিন ওয়াহাম্মাহ ওয়ামিং কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১৩২)
চার. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সকাল-সন্ধ্যায় তিনবার সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করবে। সব কিছুর ক্ষেত্রে তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৭৫)
সম্পর্কিত খবর
আয়াতের অর্থ : ‘তুমি কি দেখ না যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড্ডীয়মান পাখিরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই জানে তার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি এবং তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। তুমি কি দেখ না, আল্লাহ সঞ্চালিত করেন মেঘমালাকে, তৎপর তাদেরকে একত্র করেন এবং পরে পুঞ্জীভূত করেন।...আল্লাহ দিবস ও রাতের পরিবর্তন ঘটান, তাতে শিক্ষা রয়েছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য।
আয়াতগুলোতে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষা ও বিধান
১. আল্লাহর কতক সৃষ্টি মুখে তাঁর তাসবিহ পাঠ করে আর কতক তাদের অবস্থার মাধ্যমে তাসবিহ পাঠ করে।
২. তাফসিরবিদরা বলেন, আল্লাহ যে বস্তুকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করেছেন তা যথাযথ পালন করা তাঁর ইবাদত।
৩. ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্ব আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত।
৪. আল্লাহর কুদরত ও সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। কেননা এর মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায়।
৫. আয়াত থেকে প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য ও শ্রেণিবিন্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
শরিয়ত মোতাবেক চার ধরনের সম্পদে জাকাত ফরজ।
এক. ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য ও ফল-ফলাদিতে নির্দিষ্ট হারে জাকাত দিতে হয়।
দুই. নির্দিষ্ট প্রাণী যেমন—উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের ওপর নির্দিষ্ট হারে জাকাত ফরজ।
তিন. স্বর্ণ-রৌপ্যের ওপর (নিসাব পরিমাণ হলে) জাকাত ফরজ।
চার. ব্যবসায়ী পণ্য বা এমন সব বস্তু, যা দ্বারা মুনাফা অর্জন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। যেমন—ব্যবসার উদ্দেশ্যে কেনা জমি, জীবজন্তু, খাবার, পানীয়, গাড়ি ইত্যাদি সম্পদে জাকাত ফরজ।
এ ছাড়া বহু সম্পদে জাকাত ফরজ নয়। যেসব সম্পদকে জাকাত থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর তালিকা নিম্নরূপ :
১. কৃষিবহির্ভূত জমি।
২. দালানকোঠা (যেগুলো কলকারখানা, দোকান হিসেবে ব্যবহৃত হয়)।
৩. দোকানপাট।
৪. দোকানে ব্যবহৃত জিনিস যেমন—আলমারি, র্যাক, পাল্লা, বাটখারা ইত্যাদি, যা ব্যবসায়ের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৫. বসতবাড়ি-আশ্রয়-বসবাসের ঘর।
৬. কাপড়চোপড়-বস্ত্র ব্যবহারের পোশাক-পরিচ্ছদ।
৭. নারীদের ব্যবহার্য কাপড়, তা যতই মূল্যবান হোক না কেন।
৮. গৃহস্থালির তৈজসপত্র, হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসন ও সরঞ্জামাদি, আসবাব যেমন—খাট, আলমারি, চেয়ার-টেবিল (ব্যবহার করা হোক বা না হোক)।
৯. বই, পত্র-পত্রিকা, খাতা-কাগজ ও মুদ্রিত সামগ্রী ব্যবহারের শিক্ষা উপকরণ।
১০. অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ।
১১. হিসাবের বছরের মধ্যেই অর্জিত ও ব্যয়িত সম্পদ।
১২. দাতব্য সংস্থাগুলোর মালিকানায় দাতব্য কাজে ওয়াকফকৃত সম্পত্তি।
১৩. সরকারের হাতে ও মালিকানায় থাকা নগদ অর্থ, স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য সম্পদ।
১৪. এক বছর বয়সের নিচের গবাদিপশু।
১৫. পোষাপাখি ও হাঁস-মুরগি।
১৬. আরামদায়ক সামগ্রী।
১৭. যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম।
১৮. চলাচলের জন্তু যেমন—গরু, গাধা, ঘোড়া, হাতি, খচ্চর, উট ইত্যাদি।
১৯. মিল, ফ্যাক্টরি, ওয়্যার হাউস, গুদাম ইত্যাদি।
২০. অফিসের সব আসবাব, যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, ফ্যান, মেশিন, ক্যালকুলেটর ইত্যাদি সরঞ্জাম।
২১. বপন করার জন্য সংরক্ষিত বীজ।
২২. ব্যবসায়ের জন্য নয় এমন পুকুরের মাছ।
২৩. যুদ্ধে ব্যবহৃত পশু।
২৪. চলাচলের বাহন—সাইকেল, মোটরসাইকেল, ব্যবহারের গাড়ি প্রভৃতি যানবাহন।
২৫. মূল্যবান সুগন্ধি, মণিমুক্তা, লৌহ বর্ণ প্রস্তর, শ্বেতপাথর এবং সমুদ্র থেকে আহরিত দ্রব্যসামগ্রীর ওপর জাকাত নেই।
২৬. নিসাবের কম পরিমাণ অর্থ-সম্পদ।
২৭. বাণিজ্যিক দুধ উৎপাদন, কৃষি ও সেচ কাজ এবং বোঝা বহনের গরু-মহিষ।
২৮. সব ধরনের ওয়াকফকৃত সম্পত্তি।
২৯. ব্যবসায়ে খাটানো না হলে মোতি, ইয়াকুত ও অন্যান্য মূল্যবান পাথরের ওপর জাকাত নেই। (আল ফিকহ আলাল মাজাহিবিল আরবায়া, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৯৫)
৩০. সরকারি সম্পত্তির কোনো জাকাত হয় না, কেননা ধনী-গরিব নির্বিশেষে সমাজের সবাই সম্পত্তির মালিক।
৩১. দাতব্য সংস্থার সম্পদের ওপর জাকাত ধার্য হবে না, এগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদ বলে বিবেচিত না হবে।
৩২. মানবজীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য রক্ষিত টাকার জাকাত হবে না।
৩৩. মানুষের পরিশ্রম ছাড়াই জন্মে এমন সব উদ্ভিদ যেমন—বনজ বৃক্ষ, ঘাস, নলখাগড়া ইত্যাদির জাকাত হবে না।
৩৪. ব্যাংকঋণ, ধারকৃত টাকা, ব্যবসার জন্য বাকিতে আনা সামগ্রীতে জাকাত দিতে হবে না।
(সূত্র : ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাস, ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম)
পার্থিব জীবন শেষে সবাইকে পরকালে পাড়ি জমাতে হবে। সেখানে সবার কৃতকর্মের হিসাব নেওয়া হবে। তাই পাপমুক্তি ও গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করা কর্তব্য। তা ছাড়া কিয়ামতের কঠিন সময়ে পুণ্যবানদের সঙ্গে অবস্থানের দোয়া করাও মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَ كَفِّرْ عَنَّا سَيِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ رَبَّنَا وَ آتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
অর্থ : হে আমাদের রব, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করুন এবং আমাদেরকে পুণ্যবানদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে মৃত্যু দিন। হে আমাদের রব, আমাদেরকে সেসব কিছু দান করুন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি নিজ রাসুলদের মাধ্যমে আমাদের দিয়েছেন। আমাদেরকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি কখনো প্রতিশ্রুতির বিপরিত করবেন না।
মুমিনের সব আমলের প্রতিদান রয়েছে। তবে রোজার প্রতিদান মহান আল্লাহ বিশেষভাবে দেবেন। কারণ রোজার মাধ্যমে বান্দার সঙ্গে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়। হাদিস শরিফে এসেছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " قَالَ اللَّهُ كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلاَّ الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي، وَأَنَا أَجْزِي بِهِ. وَالصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ، فَلاَ يَرْفُثْ وَلاَ يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ، أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ. وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ، لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا إِذَا أَفْطَرَ فَرِحَ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِهِ
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তাঁর নিজের জন্য।