মুমিনের প্রতিটি কাজ হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়। তাই প্রতিটি কাজেই মহান আল্লাহর নির্দেশ নবীজি (সা.)-এর সুন্নত মোতাবেক পালন করা আমাদের সবার দায়িত্ব। দৈনন্দিন ইবাদত থেকে শুরু করে আমাদের চালচলন, কথাবার্তায়ও নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ আবশ্যক। কেননা পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মুমিনের চালচলের দিকনির্দেশনাও রয়েছে।
চলাফেরায় নম্রতা অবলম্বনের গুরুত্ব
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা

পবিত্র কোরআনে সন্তানের প্রতি লোকমান হাকিম (আ.)-এর কিছু উপদেশ বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর জমিনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না’। (সুরা : লোকমান, আয়াত : ১৮)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ দুটি পরিভাষা ব্যবহার করেছেন।
‘মুখতাল’ মানে হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যে নিজেই নিজেকে বড় কিছু মনে করে। আর ‘ফাখুর’ তাকে বলে, যে নিজের বড়াই করে অন্যের কাছে।
মানুষের চালচলনে অহংকার, দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ তখনই অনিবার্য হয়ে ওঠে, যখন তার মাথায় নিজের শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস ঢুকে যায় এবং সে অন্যদেরকে নিজের বড়াই ও শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাতে চায়। (ফাতহুল কাদির)
আর যখন মানুষকে অন্যকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করাতে চায়, তখনই তার চালচলনেও অস্বাভাবিক ভঙ্গি ফুটে ওঠে। অন্যদের বক্তিদের দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে গিয়ে গোমড়া মুখে দম্ভ পায়ে হেঁটে চলে। কেউ সালাম দিলে সালামের উত্তর না দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে একটি বিরক্তির দৃষ্টি দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। কেউ আবার আরেকটু একধাপ এগিয়ে না দেখার ভান করেই চলে যায়।
(আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৪৯)
আবু জার (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ন্যায়সংগত ও কল্যাণকর কাজের কোনো বিষয়কেই যেন তোমাদের কেউ তুচ্ছ মনে না করে। সে (ভালো করার মতো) কিছু না পেলে অন্তত তার ভাইয়ের সঙ্গে যেন হাসিমুখে মিলিত হয়। ... (তিরমিজি, হাদিস : ১৮৩৩)
এর চেয়ে আত্মঘাতী কাজ হলো, দম্ভভরে হাঁটা বা যানবাহন চালানো। দাম্ভিক অঙ্গভঙ্গিতে হেঁটে যেমন মানুষ তার বড়ত্বের জানান দিতে চায়, তেমনি আক্রমণাত্মক গতিতে যানবাহন চালিয়ে পথচারীদের কলিজা কাঁপিয়েও মানুষ তার দম্ভের বহিঃপ্রকাশ করে। যা মহান আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর জমিনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো জমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড়সমান পৌঁছতে পারবে না।’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৭)
আহ মহান আল্লাহর এই বাণী যদি কেউ একবার উপলব্ধি করত, তাহলে সে কখনো দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে পারত না। এ অভ্যাস মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। হাদিস শরিফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি আকর্ষণীয় জোড়া কাপড় পরিধানকরত চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে পথ চলছিল; হঠাৎ আল্লাহ তাকে মাটির নিচে ধসিয়ে দেন। কিয়ামত অবধি সে এভাবে ধসে যেতে থাকবে। (বুখারি, হাদিস : ৫৭৮৯)
নাউজুবিল্লাহ। আমাদের সবার মধ্যেই কমবেশি এই অভ্যাসগুলো আছে। তাই আমাদের সবারই উচিত, কোরআন-হাদিসের এই বাণীগুলো সামনে এলে কল্পনার ঘৃণা আয়নায় অন্যের ছবি না এঁকে বিবেকের আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করানো। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তাওবা করা এবং এ ধরনের দাম্ভিকতা ত্যাগ করা। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।
সম্পর্কিত খবর

মনীষীদের কথা

পৃথিবীতে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য হলো অন্তরালের জীবন পরিশুদ্ধ করা এবং অন্তরের ব্যাধি দূর করা।
আবদুল্লাহ ইবনে নূর (রহ.)
।
প্রশ্ন-উত্তর
- সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

বদলি হজ করলে কি নিজের ফরজ হজ আদায় হয়?
প্রশ্ন : নিজের ওপর হজ ফরজ থাকলে বদলি হজ আদায় হবে কি?
মুনির, গুলশান, ঢাকা
উত্তর : যাঁর ওপর হজ ফরজ—এমন ব্যক্তি নিজের হজ আদায় না করে অন্যের বদলি হজ করলে তা আদায় হলেও মাকরুহে তাহরিমি বলে বিবেচিত হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৪/২৫, আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫১২)
।
কোরআন থেকে শিক্ষা
পর্ব : ৭৪০

আয়াতের অর্থ : ‘অন্ধের জন্য দোষ নেই, খঞ্জের জন্য দোষ নেই, রোগীর জন্য দোষ নেই এবং তোমাদের নিজেদের জন্যও দোষ নেই আহার করা তোমাদের ঘরে অথবা তোমাদের পিতাদের ঘরে, মায়েদের ঘরে, ভাইদের ঘরে, বোনদের ঘরে, পিতৃব্যদের ঘরে, ফুফুদের ঘরে, মাতুলদের ঘরে, খালাদের ঘরে অথবা সেইসব ঘরে যার চাবির মালিক তোমরা অথবা তোমাদের বন্ধুদের ঘরে। তোমরা একত্রে আহার করো অথবা পৃথকভাবে আহার করো তাতে তোমাদের জন্য কোনো অপরাধ নেই।...’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৬১)
আয়াতে খাবার গ্রহণে মালিকের অনুমতি নেওয়ার বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও বিধান
১. কোনো সমাজে যদি আত্মীয়-স্বজনের অনুমতি ছাড়া খাবার খাওয়ার প্রচলন থাকে, তাহলে তাদের জন্য খাবার খাওয়ার আগে অনুমতি নিতে হবে না।
২. বর্তমান সমাজে আত্মীয়-স্বজনের অনুমতি ছাড়া খাবার গ্রহণের প্রচলন নেই। তাই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও খাবার খাওয়ার আগে অনুমতি নিতে হবে।
৩. কোনো ব্যক্তি যদি তার মালিকানাধীন খাবার, গাছের ফল বা ক্ষেতের শস্য মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, তাহলে তা খাওয়ার জন্য অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন নেই।
৪. কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে সবাইকে লক্ষ্য করে সালাম দেওয়া আদব ও মুস্তাহাব।
৫. মুসলমান নিজ ঘরে প্রবেশের সময়ও সালাম দেবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। (মাআরেফুল কুরআন : ৬/৪৪২)

মুসলমানের জীবনযাপনে শালীনতা
আলেমা হাবিবা আক্তার

আরবিতে ‘হায়া’ অর্থ লজ্জা বা সংকোচ বোধ করা, ইতস্তত বোধ করা ইত্যাদি। সহজভাবে বলা যায়, লজ্জা হচ্ছে এক ধরনের মানবীয় অনুভূতি, যা মানুষকে মন্দ কাজে বাধা দেয় এবং জনসমক্ষে সম্মানহানির ভয় সৃষ্টি করে। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘হায়া’ অর্থ শরম, বৃষ্টি, তরতাজা ইত্যাদি, যা ‘হায়াত’ শব্দমূল থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ হলো ‘জীবন’।
ইসলামে লজ্জা ও শালীনতার গুরুত্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে লজ্জা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যেমন—
১. লজ্জা ঈমানের অংশ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।’
(মুসলিম, হাদিস : ৫১)
২. আল্লাহর গুণ : লজ্জা মহান আল্লাহর গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীল, লজ্জাশীল।
৩. নবী-রাসুলদের গুণ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুসা (আ.) ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল একজন ব্যক্তি। অধিক লজ্জার কারণে তাঁর শরীরের সামান্য ত্বকও দেখা যায়নি। (বুখারি, হাদিস : ৩৪০৪)
৪. লজ্জা কল্যাণের বাহক : মহানবী (সা.) বলেছেন, লজ্জা-শালীনতার পুরোটাই কল্যাণ। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৭৯৬)
৫. লজ্জা জান্নাত লাভের মাধ্যম : লজ্জা ঈমানের অঙ্গ, আর ঈমানদারদের স্থান জান্নাত।
৬. লজ্জা ইসলামের চরিত্র : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিটি ধর্মের একটা চরিত্র আছে, আর ইসলামের মূল চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৮১)
জীবনযাপনে লজ্জার প্রয়োগ
১. স্বভাবজাত লজ্জা রক্ষা : আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে লজ্জা ও শালীনতার বোধ রেখেছেন। মুমিনের উচিত তা রক্ষা করা। এ জন্য নবীজি (সা.) কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না, তিনি খোলা স্থানে গোসল করতেন না। পাপ কাজে সংকোচ বোধ করা স্বভাবজাত লজ্জার একটি দিক। তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
২. একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে শালীনতা : একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও মুমিন লজ্জা ও শালীনতা রক্ষা করবে। যেমন—আয়েশা (রা.) বলেছেন, আমি ও রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখিনি।
৩. কথা ও কাজে শালীনতা রক্ষা করা : মুমিন তার কথা ও কাজে লজ্জা ও শালীনতা রক্ষা করে চলবে। কেননা লজ্জা ও শালীনতা না থাকলে ব্যক্তি যেকোনো অন্যায় কাজও করে ফেলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তুমি নির্লজ্জ হয়ে পড়বে, তখন যা ইচ্ছা তা-ই করো।
(বুখারি, হাদিস : ৬১২০)
৪. পোশাক-আশাকে শালীনতা রক্ষা করা : নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক পরা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ পোশাককে লজ্জা নিবারণের মাধ্যম বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বনি আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদের পোশাক দিয়েছি। আর তাকওয়ার পোশাক, এটাই সর্বোত্কৃষ্ট।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৬)
৫. সমাজ থেকে অশ্লীলতা দূর করা : সামাজিক জীবন থেকে অশ্লীলতা দূর করা না গেলে শালীন জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)
আল্লাহ সবাইকে সুমতি দান করুন। আমিন।