ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং

আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে রোজা

মাহবুবুর রহমান
মাহবুবুর রহমান
শেয়ার
আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে রোজা
ছবি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি

ইসলামে রোজা (সিয়াম) শুধু একটি ধর্মীয় অনুশীলন নয়, এটি মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদ্যা অনুযায়ী, ইসলামী রোজার সঙ্গে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ( Intermittent Fasting-IF) বেশ কিছু মিল আছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং জনপ্রিয় হচ্ছে, বিশেষ করে ওজন কমানো, বিপাকক্রিয়া উন্নয়ন, হৃদরোগ প্রতিরোধ এবং দীর্ঘায়ু বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতার জন্য। ইসলামী রোজাও একইভাবে স্বাস্থ্যগত ও আত্মিক উন্নয়নে সহায়ক বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

এই প্রবন্ধে আমরা ইসলামের রোজা এবং আধুনিক ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মধ্যে সাদৃশ্য, পার্থক্য এবং এ দুটির স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করব।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং (IF) কী?

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং হলো নির্দিষ্ট সময় খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার একটি পদ্ধতি, যা দেহের বিপাকক্রিয়া উন্নত করে, ওজন কমাতে সহায়তা করে এবং কোষীয় পুনর্গঠন (cell regeneration) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এটি কয়েকটি জনপ্রিয় পদ্ধতিতে করা হয়১. ১৬/৮ পদ্ধতিদিনে ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা এবং আট ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ। ২. ২০/৪ পদ্ধতি২০ ঘণ্টা উপবাস এবং চার ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ।

৩. ৫:২ পদ্ধতিসপ্তাহে পাঁচ দিন স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণ এবং দুই দিন ৫০০-৬০০ ক্যালরি গ্রহণ করা। ৪. ওএমএড (OMAD - One Meal A Day)দিনে মাত্র একবার খাবার গ্রহণ।

ইসলামে রোজার সংজ্ঞা ও নিয়ম : ইসলামে রোজা পালনের মূলনীতি হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের খাদ্য-পানীয় এবং যৌনাচার থেকে বিরত থাকা। কোরআনে বলা হয়েছে : হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : রোজা রাখো, সুস্থ থাকবে।

(ইবনে মাজাহ)

এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায়, রোজা শুধু আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য নয়, এটি শারীরিক সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী রোজা ও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মিল : ইসলামের রোজা ও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের মধ্যে বেশ কিছু মিল

আছে : ১. উভয় পদ্ধতিতেই নির্দিষ্ট সময় উপবাস থাকতে

হয়রোজায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস থাকতে হয়, যা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ১৬/৮ বা ২০/৪ পদ্ধতির সঙ্গে মিলে যায়। ২. দেহের বিপাকক্রিয়া উন্নত হয়। রোজা ও  IF উভয়ই ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে শরীরকে ফ্যাট বার্নিং মোডে প্রবেশ করতে সহায়তা করে।

৩. মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায়উভয় পদ্ধতিই ধৈর্যশীলতা ও আত্মসংযম শেখায়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। ৪. হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে, রোজা ও  IF হরমোন নিঃসরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা দীর্ঘায়ু ও স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। ৫. শরীর ডিটক্স করে, রোজা ও  IF অটোফেজি (Autophagy) প্রক্রিয়া সক্রিয় করে, যা কোষের ময়লা দূর করে এবং নতুন কোষ তৈরিতে সাহায্য করে।

 

রোজা ও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

ওজন কমানো ও বিপাকক্রিয়া উন্নয়ন : উভয় পদ্ধতিই শরীরের ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে ফ্যাট বার্নিং প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।

কোষ পুনর্জীবন ও ডিটক্সিফিকেশন : ২০১৬ সালে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহসুমি দেখান যে রোজা বা উপবাস কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে (Autophagy)  সক্রিয় করে, যা শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন দূর করে।

হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ : রোজা ও IF  উভয়ই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি : উপবাস ব্রেন-ডেরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (BDNF)  বাড়িয়ে মস্তিষ্কের নিউরন সংযোগ শক্তিশালী করে, যা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়।

দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি ও বার্ধক্য প্রতিরোধ : IF ও রোজা শরীরের কোষ পুনর্গঠন করে, যা বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ধীর করে এবং আয়ু বাড়াতে সহায়তা করে।

মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ : রোজার সময় কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমে, যা স্ট্রেস ও উদ্বেগ কমায় এবং মানসিক প্রশান্তি প্রদান করে।

ডিহাইড্রেশন এড়ানোর উপায় : প্রয়োজনীয় টিপস 

রমজান মাসে রোজা পালন মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন (Dehydration)  হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিশেষত গরমের সময়। ডিহাইড্রেশন হলে মাথা ব্যথা, ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, মনোযোগের অভাব এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে। তাই রোজা রাখার সময় শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা অত্যন্ত জরুরি।

 

ডিহাইড্রেশন কী এবং কেন এটি হয়?

ডিহাইড্রেশন তখনই ঘটে যখন শরীর প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি হারায় এবং যথেষ্ট পরিমাণ পানি না পাওয়া যায়। রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ পানি না খাওয়ার কারণে শরীর পানির ঘাটতির শিকার হতে পারে।

ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ : তীব্র তৃষ্ণা লাগা, মাথা ব্যথা ও মাথা ঘোরা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া, মুখ ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, গরম আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে ডিহাইড্রেশনের সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়। তবে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে রোজার সময়ও শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা সম্ভব।

 

ডিহাইড্রেশন এড়ানোর জন্য কার্যকর টিপস

১. সাহরিতে প্রচুর পানি পান করুন : সাহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একসঙ্গে অনেক পানি পান না করে ধীরে ধীরে দুই-তিন গ্লাস পানি পান করুন, যাতে শরীর ভালোভাবে এটি শোষণ করতে পারে। পানির পাশাপাশি যা খাবেন : ডাবের পানিএটি প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ, যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে। শসা, তরমুজ, কমলা, লাউ ইত্যাদি পানিযুক্ত ফল ও সবজি খান। দই ও লাবান পান করুন, যা হাইড্রেশন বজায় রাখতে সহায়ক।

যা এড়িয়ে চলবেন : অতিরিক্ত চা বা কফিএগুলো মূত্রবর্ধক  (Diuretic)  হিসেবে কাজ করে এবং শরীর থেকে বেশি পানি বের করে দেয়। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার যেমনভাজাপোড়া, চিপস বা প্রক্রিয়াজাত খাবার।

ইফতারে দ্রুত পানি পান করবেন না, বরং ধীরে ধীরে পান করুন : অনেক সময় রোজা ভাঙার পরপরই বেশি পানি পান করলে পেট ভারী হয়ে যায় এবং হজমের সমস্যা দেখা দেয়। তাই ধীরে ধীরে পানি পান করুন এবং ইফতার শুরু করুন খেজুর ও হালকা পানীয় দিয়ে।

ইফতারে কী ধরনের পানীয় গ্রহণ করা উচিত : সাধারণ পানি (কোনো সংযোজন ছাড়া), ডাবের পানি, লেবুপানি, তাজা ফলের রস (চিনি ছাড়া), স্যুপ বা ঝোলযুক্ত খাবার।

যা এড়িয়ে চলবেন : অতিরিক্ত মিষ্টি শরবত, কোল্ড ড্রিংক বা সফট ড্রিংক, অতিরিক্ত আইসক্রিম ও মিষ্টান্ন।

পানিযুক্ত খাবার ও ফলমূল বেশি খান : সাহরি ও ইফতারে এমন খাবার বেছে নিন, যা শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক। যেসব ফলে পানির পরিমাণ বেশি সেগুলো রোজাদারদের জন্য উপকারী, কারণ এগুলো দীর্ঘ সময় শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত লবণ ও মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন : লবণ শরীরের পানিশূন্যতা বাড়িয়ে দেয় এবং তৃষ্ণা বাড়ায়। তাই সাহরি ও ইফতারে অতিরিক্ত লবণ ও ঝালযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। যে ধরনের খাবার পরিহার করবেনঅতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার (আচার, চিপস, প্রক্রিয়াজাত খাবার), গাঢ় মসলাযুক্ত ও ঝাল খাবার।

উপসংহার : আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে রোজা ও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং উভয়ই স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাই রোজা কেবল আত্মিক উন্নতির মাধ্যম নয়, এটি সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

    লেখক : প্রভাষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট

পাবলিক স্কুল ও কলেজ

 

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

কোরআন থেকে শিক্ষা

    পর্ব, ৭৩২
শেয়ার
কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ :  ‘সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ আদায় ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেদিনকে, যেদিন অনেক অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। যাতে তারা যে কাজ করে তজ্জন্য আল্লাহ তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন।’

(সুরা : নুর, আয়াত : ৩৭-৩৮)

আয়াতদ্বয়ে মুমিন ব্যক্তি ও সৎ ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. নামাজ থেকে বিরত রাখে এমন বিষয়গুলোর মধ্যে ব্যবসাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে আল্লাহ ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছেন। কেননা ব্যবসা ইবাদতবিমুখতার বড় কারণ।

২. ফিকহের সব ইমাম এই বিষয়ে একমত যে নারীদের জন্য মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ আদায় করা উত্তম। হাদিস থেকে এমনটিই বোঝা যায়।

৩. পুরুষের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেননা মসজিদই মুসলমানের ধর্মীয়, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র।

৪. আশ্রয়হীন পথিকের জন্য মসজিদে ঘুমানো জায়েজ। শর্ত হলো মসজিদের সব শিষ্টাচার রক্ষা করা।

৫. আয়াত দ্বারা দ্বিনদার ব্যবসায়ীর মর্যাদা প্রমাণিত হয়। কেননা আল্লাহ তাদের জন্য পুরস্কার ও অনুগ্রহ ঘোষণা করেছেন।

(তাফসিরে মুনির : ৯/৫৮৭)

মন্তব্য
পর্ব : ২৫

তারাবিতে কোরআনের বার্তা

শেয়ার
তারাবিতে কোরআনের বার্তা

সুরা আশ-শুরা

ওহি সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে সুরাটি শুরু হয়েছে। এরপর ফেরেশতাদের কর্মযজ্ঞ নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। পরে মুসলমানদের মধ্যকার বিরোধ নিরসনে কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সুরায় রাসুল (সা.)-এর রিসালত ও মুমিনদের সম্পর্কেও কিছু আলোচনা আনা হয়েছে।

এ কথার মাধ্যমে সুরাটি সমাপ্ত হয়েছে যে আসমান ও জমিনের রাজত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. জাতি-বৈচিত্র্য আল্লাহর ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ।

(আয়াত : ৮)

২. বিদ্বেষবশত বিবাদ কোরো না। (আয়াত : ১৪)

৩. কিয়ামত আসন্ন, তা বেশি দূরে নয়।

(আয়াত : ১৭)

৪. জান্নাতিদের সব প্রত্যাশা পূরণ করা হবে।

(আয়াত : ২২)

৫. আত্মীয়দের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করো।

(আয়াত : ২৩)

৬. সম্পদের অবাধ প্রাচুর্য বিপর্যয় ডেকে আনে।

(আয়াত : ২৭)

৭. অশ্লীলতা পরিহারকারীদের জন্য জান্নাত।

(আয়াত : ৩৭)

৮. মীমাংসাকারীদের জন্য পুরস্কার। (আয়াত : ৪০)

৯. অত্যাচারের প্রতিবিধান করো। (আয়াত : ৪১)

১০. বিপদেও অকৃতজ্ঞ হয়ো না। (আয়াত : ৪৮)

১১. ছেলেমেয়ে উভয়ই আল্লাহর দান। (আয়াত : ৪৯-৫০)

সুরা জুখরুফ

আলোচ্য সুরায় কুরাইশ ও আরববাসীদের জাহেলি আকিদা-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সমালোচনা করা হয়েছে।

কোরআনের কসমের মাধ্যমে সুরাটি শুরু হয়েছে। এতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে এই শিরকের সপক্ষে তোমাদের কাছে কোনো যুক্তি-প্রমাণ আছে? তারা বলে, আমাদের বাপ-দাদার সময় থেকে এ কাজ এভাবেই হয়ে আসছে। অথচ ইবরাহিম (আ.) পূর্বপুরুষদের এমন অন্ধ অনুসরণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর আরবরা তো তাঁরই বংশধর।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুকরণ কোরো না। (আয়াত : ২২)

২. জীবিকার তারতম্য আল্লাহই করেন। (আয়াত : ৩২)

৩. কোরআন মুসলিম উম্মাহর জন্য সম্মানের বিষয়। (আয়াত : ৪৪)

৪. নবীদের নিয়ে উপহাস কাফিরদের অভ্যাস।

(আয়াত : ৪৭)

৫. ভালো কাজ থেকে বিমুখ হয়ো না। (আয়াত : ৬২)

৬. তোমরা পরস্পরের সঙ্গে মতবিরোধ কোরো না।

(আয়াত : ৬৫)

৭. জান্নাতে মনের সব ইচ্ছা পূর্ণ হবে। (আয়াত : ৭১)

৮. অবাধ্য পাপীদের উপেক্ষা করো। (আয়াত : ৮৯)

সুরা দুখান

আলোচ্য সুরা শুরু হয়েছে কোরআন নাজিলের ইতিহাস বর্ণনার মাধ্যমে। কোরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসের কদরের রাতে। এরপর অবিশ্বাসীদের ইহকালীন ও পরকালীন শাস্তি বর্ণনা করা হয়েছে। সুরার শেষের দিকে নেককার ও বদকারদের পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। (আয়াত : ৮)

২. সংশয়গ্রস্ত লোকেরাই দ্বিন নিয়ে বিদ্রুপ করে।

(আয়াত : ৯)

৩. আল্লাহ পাপীদের কঠোরভাবে পাকড়াও করেন।

(আয়াত : ১৬)

সুরা জাসিয়া

এই সুরায় তাওহিদ ও আখিরাত সম্পর্কে মক্কার কাফিরদের সন্দেহ, সংশয় ও আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে যে পৃথিবীর সব কিছু আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। এই পৃথিবীতে মানুষ যত জিনিসের সাহায্য গ্রহণ করছে এবং বিশ্বে যে অসংখ্য বস্তু ও শক্তি মানুষের সেবা করছে তা আল্লাহই নিজের পক্ষ থেকে দান করেছেন। এরপর মক্কার কাফিরদের হঠকারিতা, অহংকার, ঠাট্টা-বিদ্রুপ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. মিথ্যাবাদীদের জন্য দুর্ভোগ। (আয়াত : ৭)

২. পাপের পথ থেকে সরে এসো। (আয়াত : ৮)

৩. সমুদ্রে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো।

(আয়াত : ১২)

৪. অবিশ্বাসীদেরও ক্ষমা করো। (আয়াত : ১৪)

৫. মূর্খদের অনুসরণ কোরো না। (আয়াত : ১৮)

৬. কোরআন মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ।

(আয়াত : ২০)

৭. পার্থিব জীবনকেই শেষ মনে কোরো না। (আয়াত : ২৪)

৮. গৌরব-গরিমা কেবল আল্লাহর। (আয়াত : ৩৭)

সুরা আহকাফ

কোরআনের প্রশংসার মাধ্যমে আলোচ্য সুরা শুরু হয়েছে। কাফিরদের কাছে দুনিয়াটা একটি উদ্দেশ্যহীন খেলার বস্তু। তারা এখানে নিজেদের দায়িত্বহীন সৃষ্টি মনে করে। এ কথার মাধ্যমে সুরা শেষ হয়েছে যে কিয়ামত অনিবার্য সত্য।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. মা-বাবার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতা। (আয়াত : ১৫)

২. মানুষ ইহকালে ও পরকালে তাদের কাজ অনুযায়ী সম্মান লাভ করবে। (আয়াত : ১৯)

৩. দুনিয়ার জীবন এক দিনের চেয়েও ক্ষুদ্র। (আয়াত : ৩৫)

সুরা মুহাম্মাদ

এই সুরায় যুদ্ধ, বন্দি, গনিমত এবং বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। উভয় দলের পরিণতিও বর্ণনা করা হয়েছে। পাশাপাশি মুরতাদ ও মুনাফিকের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। সুরাটি কোনো ভূমিকা ছাড়াই এ কথার মাধ্যমে শুরু হয়েছে যে যারা কাফির এবং যারা মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেয়, তারা আল্লাহর শত্রু। সুরাটি শেষ হয়েছে যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে। এখানে ঈমানদারদের ভীরুতা ও হীনম্মন্যতা দূর করতে বলা হয়েছে।

আদেশ-নিষেধ-হিদায়াত

১. অবিশ্বাসীদের ভালো কাজও নিষ্ফল হয়ে যায়। (আয়াত : ৮)

২. কিয়ামতের আলামত প্রকাশ পেয়েছে এবং পাচ্ছে। (আয়াত : ১৮)

৩. মানুষ ক্ষমতা পেলে আত্মীয়তা ছিন্ন করে।

(আয়াত : ২২-২৩)

৪. কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণা জরুরি। (আয়াত : ২৪)

৫. দ্বিনবিমুখ মানুষের আনুগত্য কোরো না। (আয়াত : ২৬)

৬. পাপীদের শাস্তি মৃত্যুর সময় থেকে শুরু। (আয়াত : ২৭)

৭. বাকভঙ্গিতে অন্তরের ভাব প্রকাশ পায়। (আয়াত : ৩০)

৮. সত্য জেনেও বিমুখ হয়ো না। (আয়াত : ৩২)

৯. নিজের কাজকে অর্থহীন কোরো না। (আয়াত : ৩৩)

১০. অবিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না। (আয়াত : ৩৪)

১১. নিজের ও আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করো না। (আয়াত : ৩৮)

 

গ্রন্থনা : মুফতি আতাউর রহমান

 

মন্তব্য

প্রশ্ন-উত্তর

    সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা
শেয়ার
প্রশ্ন-উত্তর

নাবালক শিশুকে জাকাত দেওয়া

প্রশ্ন : কেউ যদি জাকাত দেওয়ার সময় এমন কিছু শিশুকে জাকাত দেয়, যারা এখনো সাবালক হয়নি। তাহলে কি তার জাকাত আদায় হবে? আমাদের দেশে দেখা যায়, জাকাতের জন্য অনেকেই সঙ্গে তাদের নাবালকদের নিয়ে আসে। মানুষজনও সেই নাবালকদের জাকাত দেয়।

মোখলেসুর রহমান, ময়মনসিংহ

 

উত্তর : জাকাত আদায় হওয়ার জন্য জাকাতের টাকা যাকে দেওয়া হবে সে সাবালক হওয়া শর্ত নয়, বরং স্বেচ্ছায় খরচ করার বুঝ রাখে—এমন হলেই তাকে জাকাত আদায় করা যাবে।

উল্লেখ্য যে নাবালক ছেলের বাবা ধনী হলে ছেলেকে জাকাত দিলে জাকাত আদায় হবে না। তাই নাবালককে জাকাত দেওয়ার সময় এ বিষয়টি খেয়াল করতে হবে।

(রাদ্দুল মুহতার : ২/৩৪৯, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল

মিল্লাত : ৫/৩৭৬)

 

 

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

যেসব আমলে সদকার সওয়াব মেলে

মাইমুনা আক্তার
মাইমুনা আক্তার
শেয়ার
যেসব আমলে সদকার সওয়াব মেলে

মহান আল্লাহকে খুশি করার অন্যতম মাধ্যম সদকা। সাধারণত আমরা সদকা বলতে বুঝি, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সওয়াবের আশায় কাউকে অর্থ-সম্পদ, খাবার কিংবা পোশাক ইত্যাদি দান করা। সদকাকে এই সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হলে মনে হবে সদকার সম্পর্ক শুধু অর্থ-সম্পদের সঙ্গে। যার কাছে অর্থ-সম্পদ আছে, সেই শুধু সদকা করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।

যার কাছে নেই, তার সদকার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের কোনো ব্যবস্থা নেই; কিন্তু বিষয়টি আসলে এ রকম নয়। রাসুল (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, যারা অসচ্ছল, যাদের কাছে সদকাযোগ্য অর্থ-কড়ি নেই, তাদের জন্যও সদকা করার রাস্তা খোলা আছে। সদকা মূলত দুই প্রকার১. অর্থ-সম্পদের মাধ্যমে সদকা। ২. আমলের মাধ্যমে সদকা।
নিম্নে কোরআন-হাদিসের আলোকে আমলের মাধ্যমে সদকার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

আমলের মাধ্যমে সদকা

তাসবিহ, জিকির ইত্যাদি : আবু জার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.)-এর কিছুসংখ্যক সাহাবি তাঁর কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, ধন-সম্পদের মালিকরা তো সব সওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে নামাজ আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে।

কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের এমন কিছু দান করেননি, যা সদকা করে তোমরা সওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) একটি সদকা, প্রত্যেক তাকবির (আল্লাহু আকবার) একটি সদকা, প্রত্যেক তাহমিদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সদকা, প্রত্যেক লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা একটি সদকা। (মুসলিম, হাদিস : ২২১৯)

সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে

নিষেধ : মানুষকে সৎ কাজের আহ্বান করা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য উৎসাহী করাও সদকা সমতুল্য। রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক ভালো কাজের আদেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেওয়া একটি সদকা।

(মুসলিম, হাদিস : ২২১৯)

নম্র ব্যবহারও ভালো কাজ : মহান আল্লাহ প্রতিটি পুণ্যের কাজকেই সদকা হিসেবে গণ্য করেন।

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রতিটি পুণ্যই

দান-খয়রাতস্বরূপ। তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার হাসিমুখে সাক্ষাৎ এবং তোমার বালতি থেকে তোমার ভাইয়ের পাত্রে একটু পানি ঢেলে দেওয়াও সৎ কাজের অন্তর্ভুক্ত।

(আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩০৪)

উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা বোঝা যায়, সদকা শুধু ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আমল নয়, অসচ্ছল দরিদ্র ব্যক্তিরাও কিছু কিছু কাজের মাধ্যমে সদকার সওয়াব পেতে পারে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

 

 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ