যে উপজেলার ধান সেখানেই ছাঁটাই করার নিয়ম। কোনো কারণে সম্ভব না হলে কাছের উপজেলার চালকলে ছাঁটাই করতে হয়। তা-ও সম্ভব না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে যেকোনো মিলে ছাঁটাই করা যাবে। এই বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজে লাভবান হতে টাঙ্গাইলের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) মোহাম্মদ তানভীর হোসেন পুরো জেলার ধান নিজ পছন্দের মিলে ছাঁটাই করিয়েছেন।
মিলার ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রাপ্যের অতিরিক্ত ধান ছাঁটাই, পরিবহন ও চালের পুষ্টি মিশ্রণের বিল দেওয়া হয়েছে। গত চার বছরে (২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত) এসব খাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১১ কোটি ৩০ লাখ ২২ হাজার টাকা। নিয়মিত অডিটে ধরা না পড়লেও এমন দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য খাদ্য অধিদপ্তরের বিশেষ অডিটে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া তানভীরের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ডিলার ও পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগ, ওএমএসের চাল-আটা বিক্রি, সরকারি গুদামে চাল ক্রয়ে ঘুষ নেওয়া, শ্রমিক হ্যান্ডলিংয়ের ঠিকাদার নিয়োগ, ধানকে ফলিত চালে রূপান্তর ও সরকারি গাড়ির অপব্যবহারসহ ১০ ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পড়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে।
এতে হুন্ডির মাধ্যমে ডলার পাচার, রাজধানীতে বিলাসবহুল ১০টি ফ্ল্যাট, তিনটি দামি গাড়ি, গাজীপুরে স্ত্রীর নামে বাগানবাড়ি ও দুটি ব্যাংকে নামে-বেনামে পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। উল্লিখিত বিষয়ে তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এই কর্মকর্তাকে গত ২০ জানুয়ারি টাঙ্গাইল থেকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে বরগুনায়। সুনামগঞ্জের ডিসি ফুড মইনুল ইসলাম ভূঁইয়াকে টাঙ্গাইলে, লক্ষ্মীপুরের ডিসি ফুড হুমায়ুন কবীরকে সুনামগঞ্জ, মনিকগঞ্জের কাজী সাইফুদ্দিনকে খুলনায় এবং খুলনার তাজুল ইসলামকে গোপালগঞ্জের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে খাদ্যসচিব মো. মাসুদুল হাসান নিজ দপ্তরে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে নানা অভিযোগ এসেছে। এ ছাড়া বিশেষ অডিটে সাড়ে ১১ কোটি টাকার আপত্তি পাওয়া গেছে। এগুলো খতিয়ে দেখা হবে। এরই মধ্যে তাঁকেসহ পাঁচ ডিসি ফুডকে বদলি করা হয়েছে।’
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১৩ জানুয়ারি খাদ্য উপদেষ্টার দপ্তরে তানভীরের বিরুদ্ধে সাত পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ জমা দেন ভূঁইয়া অটোরাইস মিলের মালিক হামিদুল হক ভূঁইয়া, অভ্যন্তরীণ সড়ক পরিবহন ঠিকাদার কাজী শামসুল হক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. ইমরান।
এতে বলা হয়, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের আস্থাভাজন কর্মকর্তা তানভীর হোসেন ২০২২ সালের ৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে যোগ দেন। যোগ দিয়েই খাদ্য বিভাগের ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান, স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্যের বোনজামাই, চাল ব্যবসায়ী ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের টিআই শ্যামল সরকার, সুজন কর্মকার ও প্রধান সহকারী আবদুল বারেকসহ কয়েকজন অসাধু কর্মচারীর সমন্বয়ে গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের দোসর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও তৎকালীন খাদ্যসচিব ইসমাইল হোসেনের আশীর্বাদ থাকায় তানভীরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন খাদ্য ভবনের দু-একজন পরিচালকও। ফলে দুর্নীতিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তানভীর। তিনি ওএমএসের এবং টিসিবির ডিলার নিয়োগ, চাল ও আটা বিতরণে অর্থ আদায় ছাড়াও পরিবহন ঠিকাদার ও শ্রমিক হ্যান্ডলিং ঠিকাদার নিয়োগেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁর সহযোগী টিআই শ্যামল সরকার, সুজন কর্মকার ও প্রধান সহকারী আবদুল বারেকেরও কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পর তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ অডিট টিম গঠন করে তদন্তে পাঠায় অধিদপ্তর।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের উপপরিচালক কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের নেতৃত্বে গঠিত অডিট দলের সদস্য ছিলেন অডিটর তাইফুর রহমান ও তানজিমুল আহসান। এই দলটি গত ৮ ডিসেম্বর থেকে দুই সপ্তাহ সরেজমিন তদন্ত করে ২৬ ডিসেম্বর অধিদপ্তরে প্রতিবেদনটি জমা দেয়। প্রতিবেদনে মোট ১০টি বিষয়ে মোট ১১ কোটি ৩০ লাখ ২২ হাজার ১৮২ টাকার আপত্তি জানায় দলটি। পরে সেটি আরো অধিকতর যাচাই-বাছাই করে তা ১০ কোটি ৫৯ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫৩ টাকায় দাঁড়ায়। এতে বলা হয়, প্রাপ্যের অতিরিক্ত ধান ছাঁটাই পরিবহন বিল প্রদান করা এবং পুষ্টি মিশ্রণের জন্য গুদাম থেকে চাল ও কার্নেল উত্তোলনের আগে কিছু কিছু ডিলারের কাছে পুস্টিমিশ্রিত চাল দেওয়ায় সরকারের এই বিপুল অঙ্কের টাকা ক্ষতি হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তি বা মিলারের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, যে উপজেলার ধান সেই উপজেলার মিলে ছাঁটাই করার বিধান। কিন্তু টাঙ্গাইলের ডিসি ফুড তানভীর নিয়মনীতি উপেক্ষা করে নিজে লাভবান হতে জেলার সব ধান নিজের পছন্দের দু-একটি মিলে ছাঁটাই করিয়েছেন। এতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার মিলারদের বঞ্চিত করে তাঁদের নামে বরাদ্দ না দিয়ে ছাঁটাইকারী মিলারকে অন্যায়ভাবে বেশি বরাদ্দ দিয়েছেন। প্রাপ্যের চেয়ে বেশি বিল প্রদান করেছেন। এমনকি কোনো বিল দুবারও দিয়েছেন, যা পুরোটাই জালিয়াতি। এর আগে ২০২০ সালে তানভীর কিশোরগঞ্জের ডিসি ফুডের দায়িত্ব থাকাকালে ভৈরব এলএসডিতে বিপুলসংখ্যক খাদ্যশস্যের ঘাটতি পাওয়া যায়। তৎকালীন খাদ্য অধিদপ্তরের ডিজি সেই খাদ্যগুদাম সিলগালা করে দেন। পরে তানভীরের নেতৃত্বে সিলগালা ভেঙে ঘাটতি পূরণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে মামলা হলে ওই ঘটনায় তানভীরকে ঝালকাঠিতে বদলি করা হয়। পরে খাদ্যসচিব ইসমাইল হোসেনকে ‘ম্যানেজ’ করে টাঙ্গাইলে বদলি হন। তারও আগে কক্সবাজারের ডিসি ফুড থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে ফাইল আটকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের দপ্তর পর্যন্ত গড়ায়। পরে জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে প্রত্যাহার করে খাদ্য অধিদপ্তর।
যা বললেন তানভীর ও সহযোগীরা : অডিট আপত্তি ও অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মোহাম্মদ তানভীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এগুলো সবই মিথ্যা। তাঁর সেগুনবাগিচায় একটি মাত্র ফ্ল্যাট রয়েছে, যা তাঁর বাবা তাঁকে গিফট করেছেন। তাঁর কোনো গাড়ি নেই। একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে লেগেছে। তারাই বিশেষ অডিট টিম পাঠিয়েছে। অডিট টিম নিয়ম মেনে আপত্তি দেয়নি। আমি এর পাল্টা জবাব দিয়েছি। এসব আপত্তি টিকবে না।’
নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের টিআই শ্যামল সরকার, সুজন কর্মকার ও প্রধান সহকারী আবদুল বারেক। তাঁরা প্রায় অভিন্ন ভাষায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে কোনো নিয়ম-নীতির বরখেলাপ হয়নি। নিয়ম মেনেই সব করা হয়েছে। বরং বিশেষ অডিট টিমই নিয়মের বাইরে আপত্তি দিয়েছে।’