ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মধ্যবর্তী মেঘনা নদীর পুরনো রেল সেতুর উচ্চ ক্ষমতার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের প্রায় ৯ হাজার ২০০ মিটার পাওয়ার কেবলের হদিস মিলছে না। এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবান কেবল লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রতি মিটার কেবলের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১২ হাজার টাকা হিসাবে হদিস না মেলা কেবলের দাম দাঁড়ায় ১১ কোটি চার লাখ টাকা।
পিডিবি সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে ১৩ হাজার ২০০ মিটার কেবল অফিসে জমা দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে জমা করা হয় প্রায় চার হাজার মিটার।
জমা দেওয়া কেবলের মধ্যে ৬৭০ মিটার দাপ্তরিক কাজে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। বাকি প্রায় ৯ হাজার ২০০ মিটার কেবলের হদিস নেই। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের কোটি কোটি টাকার কেবল লোপাটের এই ঘটনার বিষয়ে পিডিবির কিশোরগঞ্জ জেলার সব ইউনিট এবং ময়মনসিংহের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানতেন।
তবে এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও পিডিবি কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই।
একই সেতুতে বারবার কেবল বদল : সূত্র জানায়, ২০২১ সালে পিডিবির (বিক্রয় ও বিতরণ) ভৈরব অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ রেলওয়ে সেতুতে ৩০০ আরএম ক্ষমতাসম্পন্ন পাওয়ার কেবল বসানোর উদ্যোগ নেন। এর আগে একই সার্কিটে ছিল ১৮৫ আরএম পাওয়ার কেবল। কর্তৃপক্ষ ৩০০ আরএম কেবল ‘জরাজীর্ণ’ ও ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেখিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুটি ৪০০ আরএম এবং একটি ৫০০ আরএমের কেবল সার্কিট স্থাপন করে।
বছর পার না হতে নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ আগে বসানো ৩০০ আরএম ক্ষমতার তামার পাওয়ার কেবল কার্যত ‘জরাজীর্ণ’ বা ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেখিয়ে প্রতিবেদন দেন। কোটি কোটি টাকার কেবল লোপাটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্যেই দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের চক্রটি নতুন প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম ও পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, উচ্চ পর্যায়ের সুষ্ঠু তদন্তে এসব দুর্নীতির প্রমাণ বেরিয়ে আসবে।
কাগজে আছে গুদামে নেই : সূত্র মতে, ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল পিডিবি কর্তৃপক্ষ নতুন কেবল স্থাপনের টেন্ডার (নং : ৪৫৪) আহ্বান করে। এক কোটি ২৩ লাখ ৪৯ হাজার ১৫৫ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শাপলা এন্টারপ্রাইজের নামে।
এর মালিক টাঙ্গাইলের ধরেরবাড়ীর মো. নূরুল ইসলাম। তাঁর লাইসেন্সে কাজটি সম্পাদন করেন টাঙ্গাইলের মো. ইপিয়ার হোসেন।
পিডিবি গাজীপুরের টঙ্গী ও চট্টগ্রামের হালিশহরে কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার থেকে ১৩ হাজার ২০০ মিটার ৩৩ কেভি সিঙ্গল কোর পাওয়ার কেবল সরবরাহ করে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা। কার্য সম্পাদনের প্রত্যয়নপত্রে জানা যায়, কাজটি শেষ হয় ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভৈরবের মেঘনা নদীর পারে সাত-আটটি খালি ড্রাম বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে আছে। এসব ড্রামে ৪০০ ও ৫০০ আরএম কেবল প্যাঁচানো ছিল। নতুন কেবল স্থাপনের পর এ রোলগুলোতে পেঁচিয়েই পুরনো কেবল স্টোরে জমা দেওয়ার কথা। বেশির ভাগ পুরনো কেবল স্টোরে (গুদাম) জমা না দেওয়ায় খালি ড্রামগুলো এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।
স্টোরকিপারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : কেবলের কাজ চলাকালে ভৈরব পিডিবির সাবেক সহকারী প্রকৌশলী ও স্টোর অফিসার ছিলেন ইমরান হোসেন তালুকদার। তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে কেবল স্টোরে জমা হওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র না দেখে বলা যাবে না।’
ভৈরব পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের তৎকালীন স্টোরকিপার (বর্তমানে বাজিতপুরে কর্মরত) মো. এরশাদ মিয়ার কাছে পুরনো কেবল জমা দেওয়ার তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছু পাওয়ার কেবল স্টোরে জমা হয়েছে।’
মো. এরশাদ মিয়া বলেন, ‘এটা বড় কাজ। এতে সহকারী প্রকৌশলী আর নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত লাগে। স্টোরকিপারের কোনো ক্ষমতাই নেই।’ মালপত্র গ্রহণ ও পরিদর্শন ফরমে স্বাক্ষর থাকার প্রসঙ্গে তিনি জানান, নির্বাহী প্রকৌশলীর নির্দেশে তিনি ওই ফরমে স্বাক্ষর করেছেন।
দায়িত্বরত কর্মকর্তারা যা বললেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে কর্মরত পিডিবি ভৈরবের সে সময়ের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ বলেন, ‘যে পরিমাণ পুরনো পাওয়ার কেবলই স্টোরে জমা দেখানো হোক না কেন, জমার কাগজ না পেলে তো ঠিকাদার বিল পেত না!’
বিপুল পরিমাণ পাওয়ার কেবল লোপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, পুরনো পাওয়ার কেবল জমার বিল সংরক্ষিত আছে।
শাপলা এন্টারপ্রাইজের কার্য সম্পাদনকারী ঠিকাদার মো. ইপিয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। পরে পাওয়ার কেবল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘জমার কাগজপত্র না দেখে অনুমান করে কিছু বলা ঠিক হবে না।’
সেতুর কেবল স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর ভৈরবে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকারী (বর্তমানে নেত্রকোনায় কর্মরত) মোহা. সালাহউদ্দীন জানান, পুরনো ১৩ হাজার ২০০ মিটার কেবলের মধ্যে চট্টগ্রাম অফিস নিয়েছে ৬৭০ মিটার। আরো প্রায় চার হাজার মিটার কেবল ভৈরব অফিসের স্টোরে জমা আছে। বাদবাকি কেবল স্টোরে নেই। তিনি জানান, ৬৭০ মিটারের কাগজপত্র অফিসে সংরক্ষিত আছে। চার হাজার মিটারের জমার কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।
পিডিবির বিশ্বস্ত একটি সূত্রের ভাষ্য, ময়মনসিংহ অঞ্চল ২-এর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বর্তমানে মৌলভীবাজারে কর্মরত) মো. হাবিবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই পুকুরচুরির ঘটনাটি সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন।