শ্রম খাতের জন্য একটি অভিন্ন মজুরি কাঠামো প্রণয়নের সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনাসভায় এই সুপারিশ করা হয়।
‘শ্রমিকের জীবনমান, কর্মপরিবেশ ও অধিকারসংক্রান্ত সংস্কার উদ্যোগ : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য প্রস্তাবনা’ বিষয়ক এই সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ।
সংস্থার পূর্ববর্তী কাজের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার এবং শ্রম সংস্কার কমিশনের জন্য প্রস্তুত করা সুপারিশে এ ধরনের বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয় সভায়।
এর অন্যতম প্রস্তাব হচ্ছে অভিন্ন একটি শ্রম আইন প্রণয়ন।
বক্তারা বলেন, বর্তমান শ্রম আইনে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) অন্তর্ভুক্ত নয়। ইপিজেড আইন নামে সেখানে ভিন্ন আইন রয়েছে, যেখানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা অবারিত করতে শ্রমিক সংগঠনের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সই-স্বাক্ষর থাকার শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়।
ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নিবন্ধনের জন্য বর্তমানে কারখানার শ্রমিকের সংখ্যা বিবেচনায় ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর থাকার শর্ত রয়েছে।
আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি দেশের ৮৫ শতাংশ বা প্রায় ছয় কোটি শ্রমিকের কোনো আইনি সুরক্ষা ও মজুরির মানদণ্ড না থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
সৈয়দ সুলতান বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে ৮৫ শতাংশ শ্রমিক রয়েছেন ইনফরমাল।
৮৫ শতাংশ মানে হচ্ছে প্রায় ছয় কোটি শ্রমিক। তাঁদের আইনের সুরক্ষা, মজুরির মানদণ্ড ও সামাজিক স্বীকৃতিও নেই। গৃহশ্রমিক থেকে শুরু করে সচিবালয় শ্রমিকদের বিবেচনা করেন, তাহলে দেখবেন বৈষম্য কতটা বেড়েছে। নির্মাণকাজে সরাসরি শ্রমিক দেখবেন না। যত শ্রমিক সব নিয়োগ দেন ঠিকাদার, যাঁদের সরাসরি দেখতে পাবেন না। তাহলে তাঁদের অধিকার নিয়ে কিভাবে কাজ করবেন? আমাদের সংস্কার করতে হবে, সে কারণে সবাইকে নিয়ে সুপারিশ তৈরি করতে চাই।’
শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য শ্রমিক নেতা তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে শ্রমশক্তির গুরুত্ব ও মর্যাদা সামনে রেখে কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের কাজকে সাধারণত ছোট কাজ মনে করেন। সমাজের মধ্যে ঘরে-বাইরে আমরা দেখি শ্রমিকদের ‘তুই’ সম্বোধন করতে। এটা অপমানকর।’ আইন-আদালতের ভাষা বাংলা না হওয়ায় শ্রমিকদের তা বোধগম্য হয় না বলেও জানান তিনি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারে হাত দিয়েছে। শ্রম সংস্কারে গঠিত কমিশনে সৈয়দ সুলতানের নেতৃত্বে রয়েছেন ১০ জন। এই কমিশনের আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার কথা।
সুপারিশ দেওয়ার পরও শ্রম সংস্কার কমিশনকে সক্রিয় থাকার অনুরোধ জানান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। যাতে তারা সুপারিশ বাস্তবায়নে নজরদারি রাখতে পারে, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কারণ কমিশনের সুপারিশগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেক গ্রুপের চাপ রয়েছে, যারা কমিশনের রিপোর্ট এড়িয়ে যেতে চাইবে কিংবা কম গুরুত্ব দেবে।
অন্তর্বর্তী রিফর্ম সেল গঠনের আহবান জানিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকার যদি আগামী এক বছর শ্রমকল্যাণ বছর হিসেবে ঘোষণা করে এবং সেই আলোকে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম বিন্যস্ত করে, তাহলে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন সহজতর হবে। সেই আলোকে আমাদের সাজেশন থাকবে শ্রমিকসংক্রান্ত যতগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে, সেখানে অন্তর্বর্তী রিফর্ম সেল গঠন করা যায় কি না? সেই রিফর্ম সেল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মনিটরিংয়ের কাজগুলো করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মনে করি না যে আমাদের উদ্যোক্তারা সব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনই প্রস্তুত রয়েছেন। ফরমাল সেক্টরগুলোতে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা হয়তো প্রস্তুত থাকতে পারেন, কিন্তু ইনফরমাল সেক্টরে যাঁরা আছেন, তাঁরা প্রস্তুত নন।’