নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত দেশের শিল্প খাত। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রয়েছে ডলার সংকট।
নানামুখী সংকটে নিমজ্জিত দেশের শিল্প খাত। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ক্রমেই প্রবল হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রয়েছে ডলার সংকট।
গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঈদে বেতন-বোনাস, ছুটি ও বিভিন্ন দাবিতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে রীতিমতো উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে। বরং প্রতিদিনই আন্দোলন, বিক্ষোভ, কর্মবিরতিতে সোচ্চার আছেন কর্মীরা। সরকারের ত্রিপক্ষীয় কমিটির (মালিক-শ্রমিক এবং সরকারের) বৈঠকে সমন্বিত উদ্যোগের ফলে মজুরি ও বোনাস নিয়ে সংকট কিছুটা প্রশমন হলেও এখনো কয়েকটি কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে। এ নিয়ে গত শনিবার কয়েকটি কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষও ছিল।
গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, শনিবার ছিল তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ঈদ বোনাস ও মজুরি প্রদানের শেষ দিন। কিন্তু শনিবার বন্ধের দিন হওয়ায় কিছু সমস্যা হয়েছে। তাঁদের ধারণা, এরই মধ্যে ৬০ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের মজুরি হয়েছে ৮০ শতাংশ আর মার্চের বেতন খুব একটা পাননি শ্রমিকরা। বিজিএমইএর সাবেক জ্যেষ্ঠ সভাপতি আবদুল্লাহ হিল রাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০ রোজার মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও বোনাস ৮০ শতাংশের বেশি কারখানার মালিকরা পরিশোধ করেছেন। বাকিগুলো নিয়েও সংকটের আশঙ্কা করছেন না তিনি।
আমরা চাই না সারা বছর কাজ করার পর ঈদের আগে শ্রমিকরা বেতন-বোনাসের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসুন। এর আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশিত।
সম্পর্কিত খবর
গরমের দিন এসে গেছে। তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। সরকার সেই চাহিদা পূরণ করবে কিভাবে, যদি প্রতিনিয়ত এমন ভয়ংকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটতেই থাকে।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় উন্নতমানের কয়লা। এর স্থলে মাটি মেশানো কয়লা দেওয়া হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে।
মেঘনা গ্রুপের এ ধরনের কর্মকাণ্ড নতুন নয়। অতীতেও তাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অনেক অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, গত ২০ বছরে গ্রুপটির কর্ণধার অন্তত এক লাখ কোটি টাকা পাচার করেছেন, যার মধ্যে অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকাই আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। আর হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ তো রয়েছেই। টাকা পাচারের বিষয়টি উচ্চতর তদন্তের জন্য একটি অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। একটি গোয়েন্দা সংস্থা, দুদক ও এনবিআরের তৈরি নথিপত্র থেকেও এসব তথ্য জানা গেছে।
বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় সম্পদ। মাটি মেশানো ভেজাল কয়লা ব্যবহার করে এর ক্ষতি করা কোনোমতেই কাম্য নয়। কয়লা সরবরাহে জালিয়াতির যে অভিযোগ উঠেছে, তার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। জনগণের অর্থে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্থায়িত্বের প্রয়োজনে ভেজাল কয়লার ব্যবহার বন্ধ রাখা জরুরি। আর এর নেপথ্যে যারা জড়িত, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছিল। অনেকে ঠিকমতো কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে পারেনি। প্রায় স্থবির অর্থনীতিতে অনেকটাই গতি এনে দিয়েছে ঈদের কেনাকাটা।
ঈদ যত নিকটবর্তী হচ্ছে, মার্কেটগুলোতে মানুষের ভিড় তত বাড়ছে।
বর্তমানে দোকান, শপিং মল ছাড়াও ঈদের কেনাকাটা হচ্ছে ই-কমার্সে। সেখানেও গতি এখন পর্যন্ত অনেকটাই কম বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ও ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণ মানুষের হাতে টাকা কম। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পোশাকে খরচ কমে গেছে। অনেকের চাকরি চলে যাওয়ায় তাঁদের পরিবার সংকটে আছে। এর প্রভাব পড়ছে ঈদের কোনাকাটায়। অনলাইনে এবার বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে কম।
রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, ধানমণ্ডি এলাকাসহ বেশ কয়েকটি শপিং মল ঘুরে দেখা গেছে, ব্র্যান্ডের দোকানে ক্রেতার ভিড় বেশি ছিল। সাধারণত অভিজাত শপিং মল ও ব্র্যান্ডের দোকানগুলো থেকে পণ্য কেনে বিত্তশালীরা। বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে ছিল ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। ইয়োলো, জেন্টেল পার্ক, আড়ংসহ ব্র্যান্ডের দোকানগুলোর প্রতিটির কাউন্টারে বিল দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। এদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ফুটপাত বা ছোটখাটো মার্কেটগুলোতেও ক্রেতাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়েছে। অনেকে ক্রেতা টানতে মূল্যছাড় দিচ্ছে। কোথাও কোথাও তা দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত।
আমরা আশা করি, ঈদ ঘিরে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে গতি এসেছে, তা স্থায়ী হবে। ঈদের ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও গতি আসবে। এ জন্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ সরকারকে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে।
অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। এর মধ্যেও বেশির ভাগ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু কিছু কারখানা এখনো বেতন-ভাতা পরিশোধ না করায় শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সড়ক অবরোধ করা হচ্ছে।
প্রতিবছরই ঈদের আগে আগে কমবেশি এ ধরনের দৃশ্য আমাদের দেখতে হয়। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এবারও ১০ শতাংশ কারখানায় এ ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা যায়, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করায় ১২টি কারখানার মালিকের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ২৭ মার্চের মধ্যে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন মাসের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস না দিয়ে একটি কারখানার গেটে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে গেছে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার সকালে কারখানায় তালা দেখে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাসের দাবিতে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে ওই মহাসড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয় এবং যাত্রীরা বিপাকে পড়ে। সাভারে ঈদের ছুটি বৃদ্ধি, বন্ধ কারখানা খুলে দিয়ে শ্রমিকদের ওভারটাইম পরিশোধ এবং দাবি আদায়ে আন্দোলনের ঘটনায় আটক ছয় শ্রমিকের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
অতীতে এমনও ঘটেছে, বেতন-বোনাস না পেয়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঈদের দিন সড়কের ওপর ঈদের নামাজ পড়ে সেখানেই অবস্থান করেছেন। এমন দুঃখজনক ঘটনা যেন আর না ঘটে সে জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব কারখানায় নির্ধারিত সময়ে বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হবে না, সেসব কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতেই হবে।
চীন এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি। প্রযুক্তি, সহজলভ্য পণ্য ও সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার অদম্য এক শক্তি নিয়ে সারা বিশ্বে বাণিজ্যের এক অপ্রতিরোধ্য পসরা সাজিয়ে বসেছে দেশটি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সবটুকু সুফল তারা ঘরে তুলতে মরিয়া।
চীন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্যিক সহযোগী।
চীন-বাংলাদেশের অসম বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে কালের কণ্ঠ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
অর্থনীতিবিদরা আরো বলছেন, চীনের আমদানি বাজেটের ১ শতাংশও যদি বাংলাদেশ থেকে যায়, তাহলেও বাংলাদেশ বছরে ২৫ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে পারবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে প্রয়োজন রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ও রপ্তানির সক্ষমতা বৃদ্ধি। তা ছাড়া চীনা বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২০ সালে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় চীন। ২০২২ সালে এসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যকে দেওয়া হয় এই সুবিধা। ২০২৩ সালে যুক্ত হয় আরো ৩৮৩টি পণ্য। ২০২৩ সালের আগস্টে নতুন করে ১ শতাংশ আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শতভাগ পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয় চীনা সরকার।
শতভাগ শুল্কছাড় পেয়েও বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি বাড়াতে পারছে না কেন—এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ড. ইউনূসের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে চীনের সঙ্গে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বান্ধব সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। চীনের বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি হারে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিতে হবে, যাতে তাঁদের বিনিয়োগ করা কারখানায় উৎপাদিত পণ্য চীনে সহজে রপ্তানি করা যায়। পাশাপাশি দেশেও বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ড. ইউনূসের এই সফরের মাধ্যমে এ সুফল যেন নেওয়া যায় নীতিনির্ধারকদের সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।