খুনের দায়ে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন জাপানি এক ব্যক্তি। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে আটক ছিলেন। জাপানি ওই ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১.৪ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে বলে মঙ্গলবার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ইওয়াও হাকামাদা নামের ওই ব্যক্তি চার দশকেরও বেশি সময় মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে আটক ছিলেন।
আটক থাকার প্রতিদিনের জন্য ২১ কোটি ৭৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ ইয়েন (৮৩ মিলিয়ন ডলার) প্রদান করা হয়েছে তাকে। জাপানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া একটি রেকর্ড।
পেশায় ইওয়াও হাকামাদা একজন বক্সার ছিলেন। তার বয়স এখন ৮৯ বছর।
১৯৬৬ সালে ঘটা খুনের অভিযোগ থেকে গত বছর তিনি অব্যাহতি পেয়েছিলেন। তার বোন এবং অন্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি খুনের দায় থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন।
জাপানের বিচারব্যবস্থা এই মামলাটি ফের তদন্ত শুরু করেছিল, যে ব্যবস্থায় পুনর্বিচার করা অত্যন্ত কঠিন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রায়ই ফাঁসি কার্যকর কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের আসন্ন মৃত্যুর কথা জানানো হয়। জাপানের যুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাসে হাকামাদা ছিলেন পঞ্চম মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি, যার পুনর্বিচার করা হয়েছে।
২০১৪ সালে পুনর্বিচারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার জেরে পুনর্বিচার শুরু হতে হতে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। হাকামাদার মামলাটি জাপানের বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গত সেপ্টেম্বরে জাপানের দক্ষিণ উপকূলের একটি শহর শিজুওকাতে আদালতের সামনে শত শত লোক ভিড় করেছিল যখন বিচারক হাকামাদাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা থেকে খালাস দেন। হাকামাদা অবশ্য শুনানির জন্য আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। তার মানসিক অবস্থার অবনতির কারণে তাকে পূর্ববর্তী সব শুনানি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হাকামাদা তার ৯১ বছর বয়সী বোন হিডেকোর তত্ত্বাবধানে থাকতেন।
আদালতের একজন মুখপাত্র এএফপিকে জানিয়েছেন, শিজুওকা জেলা আদালত সোমবার এক সিদ্ধান্তে বলেছেন, ‘দাবিদারকে ১.৪৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করা হবে।’ সেপ্টেম্বরে একই আদালত রায় দেয়, হাকামাদা পুনর্বিচারে দোষী নন এবং পুলিশ প্রমাণ নষ্ট করেছে। আদালত সেই সময় বলেছিলেন, হাকামাদাকে অমানবিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং তার কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়, পরে তিনি তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
হাকামাদার আইনি দল বলেছে, ১৯৬৬ সালে গ্রেপ্তার এবং ২০১৪ সালে মুক্তি, এর মধ্যে তিনি যে কষ্ট ভোগ করেছিলেন তার তুলনায় এই ক্ষতিপূরণের অর্থ কম। আইনজীবী হিদেয়ো ওগাওয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি মনে করি ... এই বিষয়টি তার সব কষ্টের জন্য কিছুটা ক্ষতিপূরণ।’
তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু গত ৪৭ বা ৪৮ বছরের কষ্ট ও যন্ত্রণার আলোকে এবং তার বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি মনে করি, রাষ্ট্র এমন ভুল করেছে, যা ২০০ মিলিয়ন ইয়েন দিয়েও প্রায়শ্চিত্ত করা যাবে না।’ কয়েক দশক ধরে আটক থাকা এবং মৃত্যুদণ্ডের ভয়ের কারণে হাকামাদার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও একটি বড় প্রভাব ফেলেছে।
হাকামাদাকে তার বয়স, লোকটির স্ত্রী এবং তাদের দুই কিশোর সন্তানকে হত্যা এবং ডাকাতির জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। চারজনকেই ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন কিন্তু পুলিশ বলেছিল, হাকামাদা অবশেষে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। বিচারের সময়, হাকামাদা নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং বলেছেন, তার স্বীকারোক্তি জোর করে আদায় করা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের এক বছরেরও বেশি সময় পরে তদন্তকারীরা বলেন, তারা রক্তমাখা পোশাক পেয়েছেন। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, যা আদালত পরে বলেছিলেন, তদন্তকারীরাই তা পুঁতে রেখেছিলেন। হাকামাদা এখন তার বোনের সঙ্গে থাকেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া জাপানই একমাত্র প্রধান শিল্পোন্নত গণতন্ত্র, যেখানে মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে, এমন একটি নীতি যার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে।
সূত্র : এএফপি